“সাগরমাথাঃতব চরণে নত মাথা”-পার্থ ঘোষ।

IMG_20180517_115633স্যার জর্জ ম্যালোরিকে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল,তিনি বার বার পাহাড়ে যান কেন? জর্জ ম্যালোরি উত্তরে বলেন ‘ বিকজ ইটস্ দেয়ার ‘(কেননা ওটা যে ওখানেই)।তাই পাহাড়ে চড়াটা শুধুই অ্যাডভেঞ্চার নয়,জীবনের সঙ্গে আত্তীকৃত একটি শিক্ষণীয় বিষয়ও বটে। পাহাড়েই থাকে চড়াই-উতরাই। পরিস্থিতি অনুযায়ী উঠতে হয়।জীবনে ওঠার শিক্ষা তো পাহাড়ের কাছ থেকেই পাই। সমতলে চলার আর নিচে নামার সব পথ সব সময়েই কুসুমাস্তীর্ণই হয়  – তাই না ! সময়ের কাটাছেঁড়ার ফাঁক গলে, ‘পাহাড় প্রমাণ’ দায়িত্ব পালনের পরে,’পাহাড় প্রমাণ’এর তাগিদ থেকে নিজেকে ছুঁতে চেয়ে বেড়িয়ে পড়ার নেশাটা কবে থেকে যে মজ্জায় মিশে গেছে,সেটা আর মনে পড়ে না।তবে নামের মধ্যেই লক্ষ্যভেদের ‘পুরাণ’ গাথাটা সুপ্ত বলে, একটা হার না মানা জেদ বোধহয় মগজের কোনো গভীরতম প্রকোষ্ঠতে ঘাপটি মেরে  থাকে। খানিকটা সেই নেশাতেই বারে বারে সই পাতাই নানান পর্বতারোহী দলের সদস্যদের সঙ্গে।

এবারে আমাদের গন্তব্য ছিল প্রতিবেশী দেশ নেপালের অন্তর্গত হিমালয়স্থিত কয়েকটি শৃঙ্গ।সঙ্গী বলতে মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের (কথাটা জব্বলপুর নয়।’জবলপুর’ শব্দটা জুবল মুণির নাম থেকে এসেছে কথাটা) মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন। দলের দলপতি ছিলেন সঞ্জয় যাদবের মত অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। এছাড়া বেঙ্গালুরু থেকে স্বাতী,পুনে থেকে সীমার মত মহিলা অভিযাত্রীরাও অদম্য উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এসেছিলেন সুদূর দুবাই থেকে শচীন খেরের মত পর্বতারোহী। দলে ছিলেন অমিয় বড়ুয়া, নিখিল শর্মা,হিমাংশু শ্রীবাস্তবের মত তুখোড় পর্বতারোহীরা।বাঙালী বলতে  আমি আর পল্টু দা ওরফে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পর্বতারোহী করুনাপ্রসাদ মিত্র।যাত্রা শুরু হয়েছিল জবলপুর থেকেই। সর্বমোট ২২ জনের দলটা  প্রথমে পৌঁছোই নেপালের লুকলায়। নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে লুকলা যেতে টুইন অটার জাতীয় ছোট প্লেনই ভরসা।বিমান থেকে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ে পাহাড়ের গায়ে সবুজ গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে বাড়িঘর,শস্যক্ষেত আর ফিতের মত চকচকে জলের ধারা এবং ঝকঝকে অসংখ্য পাহাড়চূড়া।এই পর্যন্ত আসা গিয়েছিল সেই মাউন্টেন ফ্লাইটে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি,পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক এয়ারপোর্ট এটি। ‘লুকলা'(৯,২০০ ফুট)একটি ছোট নেপালী জনপদ।দুটি পাহাড়ের বুকে বাইপাস সার্জারির মত ছোট্ট চেরা জায়গায় একফালি রানওয়ে। সেদিন সামান্য হিসেবের ভুলচুকেই অতলস্পর্শী খাদে তলিয়ে যেতে বসেছিল অভিযাত্রীদের নিয়ে আসা ছোট প্লেনটি। এই লুকলা থেকে তিনটে পয়েন্ট ছুঁয়ে আবার লুকলায় ফিরে আসা পর্যন্ত সময় ধরা ছিল ১২দিন। ক্যাম্পের সময় নির্বাচন করা হয়েছিল  ২০১৮ র ১৫ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল।

IMG-20180517-WA0075

বলা চলে পাহাড়ের টানে “উন্মাদ সম্মিলন”।হিমালয় নিয়ে বাঙালীদের আদিখ্যেতা সর্বজনবিদিত হলেও নেপাল হয়ে এভারেস্টের পদতলে পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি কিন্তু সকলে নিতে পারেনা। সেদিক থেকে এ এক অনন্য নজির বৈকি! একই প্রস্তরীভূত স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তখন বাইশটি তরুণ একই শপথ নিয়ে এগিয়ে চলি। মুখে মনে একটাই শপথ বাক্য….. ‘Once you have lived with mountains,there is no escape.You belong to them.'(Ruskin  Bond) মাথার উপর দিয়ে ট্যারাবেঁকা,ঋজু,গোল, নানা ছাঁদের দৃশ্যমান আকাশ লিপিতে সেই বার্তাই তখন ফুটে উঠছে। এটাই তো হিমালয় ! অনন্ত ঐশ্বর্যময় হিমবন্তকে হৃদয়ে ধারণ করার এটাই একমাত্র ছাড়পত্র। মানুষ নানা কারণে পাহাড়ে যায়।কেউ যায় স্বাস্থ্যউদ্ধারে,কেউ অবসর বিনোদন করতে,কেউবা বীরত্ব দেখাতে,কেউ কেউ আবার জয় করতে,কেউ কেউ খ্যাতির উন্মাদনায়।আমি গিয়েছিলাম প্রণতি জানাতে।পরাজিত হতে।কখনো কখনো পরাজয়, জয়ের চেয়েও মহার্ঘ্য হয়।পরাজয়ের মায়া বড় অদ্ভূত।পরাজিতের প্রণামে, বিজয়ীর ক্ষমাসুন্দর চোখ ভিজে ওঠে। কঠিন পাষাণও আর্দ্র হয় অন্তর থেকে। হিমালয়ের একটা নিজস্ব রসায়ন আছে। সে রসে জারিত না হলে ট্যুরিস্ট থেকে অভিযাত্রীতে রূপান্তরিত হওয়া যায় না। বিত্তের অহংকার,বিদ্যার দম্ভ,পদমর্যাদার শ্লাঘা – এসব জাগতিক বস্তুকে জীর্ণ বস্ত্রের মত জড়দেহী সংসারের ঘাটে ছেড়ে আসতে হয়। না হলে সারাজীবন ট্রেসপাসার হয়েই থাকতে হয়। তাপস হওয়া আর হয়ে ওঠে না। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলতেন,”পাথরকেই যদি পুজো করতে চাও,তবে হিমালয়কে করো,শালগ্রাম শিলাকে নয়।” অভিজ্ঞ পর্বতযাত্রীরা বলে থাকেন,পাহাড়ের একটা নিজস্ব গ্রহণ-বর্জন আছে। সে যাকে কাছে টানার তাকে টানে। কখনো চিরকালের মত টেনে নেয়।আর যাকে ফেলার তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। তা নাহলে কি আমাদের দলটির  সকল সদস্যদের এ যাত্রায় বেঁচে ফেরার কথা !

বন্ধুরা মিলে এগোনো শুরু হল লুকলা থেকে। প্রথমে ফাকডিং(Phakding,৮৭০০ফুট)। সেখান থেকে নামচে বাজার(১১,৩০০ফুট)।

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

PARTHO GHOSH

PARTHO GHOSH

 

 

 

 

 

অনুলিখন-অনির্বাণ ভট্টাচার্য।

*** পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য আগামী রবিবার  একবিংশ ম্যাগাজিনে চোখ রাখুন।

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *