ছোট্ট ছুটির সন্ধানে-ঘুরে আসুন “গড়পঞ্চকোট”–লিখেছেন, শাশ্বত চ্যাটার্জি

unnamedunnamed (7)unnamed (5)

ছোট্ট ছুটিতে ঘুরে আসতেই পারেন গড়পঞ্চকোট। সঙ্গে ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন পুরুলিয়ার আরও চার-পাঁচটি দ্রষ্টব্য। চারদিনের অবকাশ যাপনের একটা ট্যুরপ্ল্যান সাজিয়ে দেওয়া হল। তার আগে জানিয়ে রাখি, খুব গরম পড়ার আগেই কিন্তু প্ল্যান করে ফেলুন। আর গরমে কাবু হওয়ার ভয় না থাকলে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে দেখে নিতে পারেন পুরুলিয়ার শুষ্ক-রুক্ষ লাল কাঁকুরে মাটির সঙ্গে লড়াই করা জঙ্গলমহলের মানুষের লড়াই।
রুটপ্ল্যান সাজান এইভাবে। চারদিনের সফরে প্রথম দুটো দিন থাকুন গড়পঞ্চকোটে। পুরুলিয়ার সবচেয়ে সবুজ আর সুন্দর জায়গাটিতে গেলে একনিমেষেই দূর শহুরে ক্লান্তি। তৃতীয়দিন ভোরবেলা চলুন পুরুলিয়া শহরে। সেখানে পৌঁছে দেখে নিন অযোধ্যা পাহাড় আর আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলি। পরের দিন অর্থাৎ চতুর্থদিন বিকেল তিনটেয় ডাউন রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া।
unnamed (4) যাত্রা শুরুর দিন  হাওড়া থেকে ভোরের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ধরুন। নামুন বরাকর স্টেশনে। গড়পঞ্চকোটে থাকার একমাত্র জায়গা পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের রিসর্ট। সেখানে আগে থেকে বলে রাখলে গাড়ি হাজির থাকবে বরাকর স্টেশনে। বলা না থাকলেও কুছ পরোয়া নেই। স্টেশনের বাইরে প্রাইভেট গাড়ির সঙ্গে দরদস্তুর করে চেপে পড়ুন। কমবেশি শতিনেক টাকায় রফা। এরপর দামোদরের উপর দিশেরগড় ঘাট, ছিন্নমস্তার মন্দির ছুঁয়ে একটু এগোলেই দূরে চোখে পড়বে পঞ্চকোট পাহাড়। চাকার নিচে রাস্তা যত পিছলে যাবে, ততই প্রকৃতির কোলে পৌঁছে যাওয়া। একসময়ে পঞ্চকোট পাহাড়ের একেবারে কোলে সবুজে সবুজে ছাওয়া বনবাংলোয় আপনার সাদর অভ্যর্থনা। বনবাংলোর বুকিং কিন্তু আগে থেকে করে যাওয়ারই নিয়ম। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, সল্টলেকের বনদফতরের অফিস থেকেই বুকিং করতে পারেন। সুবিধে আছে অনলাইন বুকিংয়েরও। বাংলোয় পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় একটু অলস গড়াগড়ি। বিকেল হতে না হতেই বাংলোর বিশাল চত্বরে গাছে গাছে অসংখ্য চেনা-অচেনা পাখিদের কলতানে মুখর। সামনেই বিশাল পঞ্চকোট পাহাড়। ধ্যানমগ্ন।
unnamed (1)
পায়ে পায়ে ঘুরে নিন বাংলোর আশপাশ। অন্ধকার ঘন হতে না হতেই মাথার উপর কোটি কোটি নক্ষত্রের মিহিন আলো যেন এসে পড়ে বনবাংলোর মাটিতে। সে আলোয় নতুন করে চিনে নিন প্রকৃতিকে। হয়তো আপনার সঙ্গীকেও। এইসময় কথা বলতে নেই। একাত্ম হতে হয় এই পরিবেশের সঙ্গে। রাতের খাবারের ডাকে চমক ভাঙে। অদ্ভুত ভালোলাগা সঙ্গে নিয়েই সুস্বাদু ঘরোয়া খাবারের স্বাদ উপভোগ করুন। পরের দিন বাংলোয় বলে রাখা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন সকাল সকাল। হীরক রাজার দেশের শ্যুটিংয়ের জন্যে বিখ্যাত জয়চণ্ডী পাহাড় চলুন। পারলে প্রায় তিনশো সিঁড়ি ভেঙে উঠুন পাহাড়ের মাথায়। মা চণ্ডীর মন্দিরে পুজো দিতে পারেন। উপর থেকে আশপাশের প্যানোরামিক ভিউ মনোমুগ্ধকর। দেখে নিন পুরনো নজর মিনারও। এরপর চলুন বড়ন্তি বা মুরাডি লেকের দিকে। রাস্তাঘাট একটু খারাপ, তবুও গন্তব্যে পৌঁছে পাঁচটি টিলা দিয়ে ঘেরা সুবিশাল জলরাশি দেখে সব পথশ্রম দূর হতে বাধ্য। এখানেও রাজ্য সরকারের ইকো ট্যুরিজমের তরফে থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে, এখনও তার কাজ সম্পূর্ন হয়নি। ঠান্ডা জলে পা ভিজিয়ে এবার চলুন পঞ্চকোট গড়ে। রাজার আমলের সেই গড়ে এখন শুধুই ধ্বংসাবশেষ। তবে, ভাঙা প্রাসাদ, মন্দির, নজরমিনারের আনাচে কানাচে এখনও লুকিয়ে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস। বর্গী হানায় মাটিতে মিশে যাওয়া ইতিহাস সবিস্তারে বুঝিয়ে দেওয়ার ভার সঙ্গী গাইড স্বপন মুখোপাধ্যায়। যাঁকে বনবাংলো থেকেই সঙ্গে নেওয়া জরুরি। এবার ফিরে চলার পালা।
unnamed (6)
রাতে একটু তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে ঘুম। পরের দিন ভোর ভোর রওনা হওয়া পুরুলিয়া শহরের দিকে। গাড়ির জন্যে বাংলোর অফিসে অমিত গোপের সঙ্গে কথা বলে রাখুন। অসাধারণ ভাল রাস্তা। দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া পুরুলিয়া শহরে। থাকার জন্যে বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশে বহু বেসরকারি হোটেল আছে। আছে রিসর্টও। বাজেট বুঝে চেক-ইন। তবে, সময় নষ্ট না করে তখনই বেরিয়ে পড়তে হবে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। একের পর এক পাকদণ্ডী পেরিয়ে হিলটপে পৌঁছতে পৌঁছতে মনে হতেই পারে উত্তরবঙ্গে এসে পড়েছেন। জঙ্গল-পাহাড়ে ঘেরা ছমছমে অযোধ্যায় সেও এক দারুণ অভিজ্ঞতা।  প্রাণভরে দেখুন পাহাড়ের উপরে উচ্ছ্বল ঝোরা, পান্না রঙের লেক, আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম, ছৌ নাচের মুখোশের জন্যে বিখ্যাত চড়িদা গ্রাম, পাখি পাহাড়। পরের দিন অর্থাৎ চতুর্থদিন সকালে পুরুলিয়ার কাছেই ভাঙা দেউল ঘুরে নিন। এরপর মধ্যাহ্নভোজন সেরে সটান পুরুলিয়া স্টেশন। বাড়ি ফেরার সময় অনেকটা পথ আপনার সঙ্গে ছুটবে পুরুলিয়া আর তার লাল-রুখু প্রকৃতি।
photo

11024708_627998750678730_2850820272106472460_n

শাশ্বত চ্যাটার্জি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *