ইস্ট ইন্ডিয়া ট্র‍্যাভেলার্স ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় “পলাশ উৎসব” ২০১৮, প্রতিবেদন-অনির্বাণ ভট্টাচার্য।

12472571_1319798244704186_8556263892631017796_nপাহাড় তো ডাকে দশটা পাঁচটা অফিস করা হরিপদ কর্মকারকেও।পাহাড়তো ডাকে  ছাঁট লোহার ব্যবসায়ী প্রভুদান আগরওয়ালকেও।পাহাড়তো কাছে টানতে চায় সদ্য অষ্টমঙ্গলায় ঘুরে আসা জুনিপার আর তমোঘ্নকেও।মহীয়ান,স্থবির,অশরীরী আলিঙ্গনের ইশারা এড়ানো কি এতই সোজা! আমাদেরকেও টেনেছিল।সেটাও ছিল একটা বসন্ত কাল।সেটাও ছিল এক ফাগ উৎসবের মরশুম।

কারোর কারোর কাছে পাহাড়ের আকর্ষন শুরু হয় দেওঘরের পরেশনাথ পাহাড় দেখার পর,কারোর কারোর শিমুলতলার লাট্টু পাহাড়েই চড়াই-উতরাই এর লেত্তি নিয়ন্ত্রন হারায়।কারোর কাছে পাহাড়ের আকর্ষণ শুরু হয় শক্ত করে বাবার হাত ধরে টাইগার হিল দেখার মধ্যে দিয়ে কিম্বা পরিবারের বয়স্কদের সঙ্গে টলমলে পায়ে পায়ে ওঠা কেদার বদ্রীর স্মৃতি দিয়ে।কাউকে কাউকে পাহাড় বিস্মিত করে চলে আজীবন।এই সব স্মৃতিই যখন বারুদ হয়ে ওঠে তখন দরকার হয় কেবল অগ্নিসংযোগের।ফাল্গুন যখন সব দিয়ে থুয়ে উদার,তখনই আগুন জ্বলে উঠেছিল শিমুল,পলাশের মাথায় মাথায়।সে আগুন নেভায় সাধ্যি কার!ঘরে যে থাকবো সে মনের জোরই বা কই!’মনপাহাড়িয়া’বাঁশির সুরের ডাকে সাড়া দিয়ে ওৎ পেতে থাকা আশেপাশেরর সব বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে তিরতিরে ভালোলাগা নিয়ে এক বিরল সজীবতার নিদর্শন দেখতে মধ্য ফাল্গুনে হাজির হয়েছিলাম পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের ‘ভালোপাহাড়’এ।

ঘাটশিলায় নেমে ৩৩ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ভরদুপুরে যখন ভালোপাহাড়ের পথ ধরে এগোচ্ছি,তখন আকাশে কোদালে কোপানো মেঘেদের মউজের মত পাহাড়।হাজার হাজার টিলা।পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রাস্তা।দীর্ঘশ্বাসের মত পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা গাছগুলো থেকে খোসাশুদ্ধ দ্ধু কাঁচা হলুদ রঙের পাতা খসে খসে পড়ছে টুপটাপ।কুড়িয়ে নেওয়া যেতেই পারে দু এক আঁজলা সোনালী।ছোট ছোট ঢেউ এর চূড়ায় রোদ ঝিলমিল করছে।রোদের কোলে জমা রয়েছে অজানা কথকতা।বাতাসের ফেনা কাটতে কাটতে এগিয়ে গেলে কানে আসবে সেই সব ফিসফিসানি।

প্রায় সাড়ে ছ কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস ভূতাত্ত্বিক যুগে এক বিদার(Fissure) অগ্নুৎপাত(Eruption)এর মধ্যে দিয়ে জন্ম নেয় দাক্ষিণাত্য মালভূমিটি।এই লাভাগঠিত দাক্ষিনাত্য মালভূমিটি বিভিন্ন নদী ও তাদের উপনদী দ্বারা কালক্রমে ব্যবচ্ছিন্ন হয়ে ছোটনাগপুর মালভূমিটি গঠন করে।পুরুলিয়া সেই মালভূমিটিরই অংশ বিশেষ।মূলত ব্যাসাল্ট আর রূপান্তরিত শিলার মাঝে মাঝে হঠাৎ করে দু একটি ইন্টারট্র‍্যাপিয়ন বেড চোখে পড়ে যেতে পারে।

প্রশাসনিক ভাবে এক অদ্ভুত ত্রিকোন অবস্থানের ভেতর  দিয়ে এঁকে বেঁকে পথ গিয়েছে বান্দোয়ানের দিকে।যাব পশ্চিমবাংলার একটি জেলায়,প্রবেশ করলাম ঝাড়খন্ড(অতীতের বিহার)দিয়ে।একটু ভুলচুক হলেই ঢুকে পড়বো উড়িষ্যায়।কাজেই এমন প্রশাসনিক অবস্থান যে জায়গার,তার স্থান মাহাত্ম থাকবে না,তা কি হয়!

‘খ ন্ ড’ কথাটির অর্থ বাংলা অভিধানে আছে ‘বৈদ্যনাথধাম’।হিন্দি অভিধানে ‘ঝাড়খণ্ড’ কথাটি আছে। ‘বৈদ্যনাথধাম থেকে পুরীধাম পর্যন্ত যে অঞ্চল গঙ্গার দক্ষিণ দিকের মালভূমি এবং দামোদর  নদের উপত্যকার নিবিড় বনজঙ্গল এবং পাহাড়ে ঘেরা বন্ধুর অঞ্চল’ই হল ঝাড়খণ্ড। ‘ঝাড়’ এর অর্থ বনজঙ্গল। আর ‘খণ্ড’ অর্থ প্রান্ত বা এলাকা।এই দুই অর্থের মিশেলে তৈরি হয় ঝাড়খণ্ড শব্দটি।অঞ্চলটিকে বৃহত্তর ঝাড়খণ্ডের অংশ বললেও খুব একটা ভুল বলা হবে না।

12931058_1319716131379064_1053378837944936723_n

মোগল রাজত্বে এই অঞ্চলটিকে বলা হত ‘কুকারা’।১৭৬৫ তে বৃটিশরা দখল করার পরে নাম হয় ঝাড়খণ্ড।অনেক আগে থেকেই জায়গাটি ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের দেশ বলে পরিচিত ছিল।ঝাড়খণ্ড নামের উৎপত্তি তাই চারশো বছরেরও আগে বলে অনুমান করা হয়।আইন ই আকবরি তে উল্লেখ আছে এই অঞ্চলের।সেখানে লেখা আছে সেনাপতি মানসিংহ শোন,গঙ্গা,যমুনা নদী এবং তাদের বেশ কিছু উপনদীর তীর ঘুরে দেখেন।তখন সেসব জায়গায় ছিল বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল।সেখানকার আদিবাসীদের কথাও আছে।আছে সাঁওতাল,কোল,ভীল,মুণ্ডা,হো দের কথাও।যাদের জীবনের মূলমন্ত্রই হল কায়িক শ্রম,গোষ্ঠিবদ্ধতা ও সমতা।

১৭৬৯ এ বৃটিশরা এই অঞ্চলে প্রবেশ করে।অন্যায় ভাবে বেগার খাটানো,কুলিকামিন হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে কাজে লাগানো,মেয়েদের সম্ভ্রমহানি, জঙ্গল কাটার প্রতিবাদে প্রথম প্রতিবাদে গর্জে ওঠে তিলকা(তিল্কা)মাঝি।নির্মম ভাবে প্রতিবাদীর কণ্ঠ রোধ করা হয়,তিলকাকে ফাঁসি দিয়ে।ভাগলপুরে ফাঁসি হয় তিলকার।তিলকার অসমাপ্ত স্বপ্ন নিয়ে শোষিত আদিবাসীরা ১৭৯৮ এ ঘটায় ‘চোয়াড় বিদ্রোহ ‘।যথাপূর্ব ভাবে সে বিদ্রোহও দমন করে ইংরেজরা।এরপরে ১৮১৮ – ১৮৩১ এর মধ্যে সংঘটিত হয় ‘ভীল বিদ্রোহ’।ভীল বিদ্রোহের রেশ মেলাতে না মেলাতেই ঘটে ‘কোল বিদ্রোহ’।তারপরে ১৮৫৫ – ১৮৫৬ তে হয় ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’।সেটা অবশ্য বাগে আনতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।দুই সহোদর ভাই সিধু এবং কানুর আত্মত্যাগ ছাড়াও ৫৮ জনের ফাঁসি হয় এই বিদ্রোহের অপরাধে।প্রসঙ্গত বলি,এই বিদ্রোহে এক দুঃসাহসী মহিলার নামও জানা যায়।তার নাম ছিল ফুলি।

ছোটনাগপুর অঞ্চলের ‘খুদকুটটি’ প্রথার প্রচলন অনেকদিন ধরেই।যার অর্থ হল সংঘবদ্ধ ভাবে চাষবাস করা।এদেশের লোকে ‘সভখোজ’, ‘কলখোজ'(সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশে প্রচলিত কৃষি পদ্ধতি)পদ্ধতির নাম না শুনলেও যৌথ পদ্ধতিতে চাষবাস প্রথায় অভ্যস্থ ছিল।ইংরেজরা আঠারো শতকের শেষে এই কৃষিব্যবস্থা ভাঙতে গেলে আদিবাসীদের জাত্যভিমানে আঘাত লাগে।এরই প্রতিবাদে বীরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে শুরু হয় ‘মুণ্ডা উল্উলান্'(উল্উলান্ একটি মুণ্ডা শব্দ।যার অর্থ বিদ্রোহ।)১৮৯৫ – ১৯০০, এই সময়কাল উত্তাল হয়ে ওঠে জঙ্গলাকীর্ণ এই অঞ্চল।তাদের ‘দিকু'(শত্রু)হল মহাজন।অন্তহীন বঞ্চনার প্রতিবাদে সরল সাদা চোখ রাঙা হতে শুরু করে।শোনা যায় বীরসাকে বিষপ্রয়োগ করে মারা হয়েছিল,জেল এর মধ্যেই।কিন্তু ইংরেজরা বলে জেলের মধ্যেই নাকি কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বীরসা।বীরসার সঙ্গে গুলি করে মারা হয় গয়ারাম মুণ্ডা(বীরসার প্রধান সেনাপতি),ঋষা মুণ্ডা,থাটি মুণ্ডা প্রমুখকে।এছাড়াও অন্যান্য

বিদ্রোহীদের ফাঁসি,হত্যার মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের লকলকানি শিখা স্তিমিত হয়ে এলেও,বঞ্চনা,শোষণ, নিপীড়ন,জবরদখলের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের রাগ আর অভিমান জ্বলতেই থাকে ধিকিধিকি করে।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই একসময়ে মাওবাদী কার্যকলাপের জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে এই অঞ্চল।পরিচিত হয় ‘রেড করিডর’নামে।এক রাজ্যে অপরাধ করে চটকরে অন্য রাজ্যে গা ঢাকা দেওয়ার এমন চমৎকার জায়গা সত্যিই বিরল।এই কিছুদিন আগেও একসঙ্গে অনেক গুলো যাত্রীবাহী বাস একসঙ্গে ঝাড়খণ্ড,উড়িষ্যা বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে রওয়ানা দিত।সঙ্গে পাইলট কারে থাকত তিন রাজ্যের পুলিশ।যে কোনো মুহুর্তেই ছূটে আসার সম্ভাবনা থাকত ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির,যে কোনো মুহুর্তে সম্ভাবনা থাকত লুকোনো ল্যান্ডমাইন এর আঘাতে উড়ে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়ার।সেই সব দিনের সাক্ষী এখানকার পাহাড়,টিলা,ঝর্ণা,শাল-মহুয়া-কুসুম গাছ,অসংখ্য পলাশ আর শিমুল ফুল।সাক্ষী সেখানকার স্থানীয় মানুষেরাও।তাই তো বান্দোয়ানে গেলে দুয়ারসিনি জলধারার কাছে বেড়ানোর সময় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় অর্ধনির্মিত পোড়া সরকারি গেস্ট হাউসটার দিকে।যেটা মাওবাদীরা একসময়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।চোখে পড়ে কংক্রিটের দেওয়ালে বড় বড় ফাটল।

আবার সেখানেই পাথরের গায়ের ফাটলে পলাশের শেকড়ের মরিয়া প্রচেষ্টা।ইংরাজি ‘ওয়াই’ বর্ণের মত দু হাত আকাশের দিকে তুলে সে,কাকে যে কি বলে চলেছে,তা শুধু সেইই জানে।কিন্তু পাথর নিংড়ে রস পাক বা না পাক,ফুল ফোটানোতে এতটুকু ক্লান্তি নেই।ফুলের রঙেও এতটুকু লাবণ্য কমায়নি।আর আমরা তো বরাবরই “রঙের গোলাম”।এই রঙীন জঙ্গলই সেখানকার মানুষ আর প্রকৃতির কাছে ইজ্জত।জীবন যন্ত্রনার উপশম।

গেরুয়া আলখাল্লা পরা রাস্তা।আলো পড়ে আসছে।মৌন প্রান্তরের বুকে ছড়ানো অসংখ্য ‘টাঁড়'(বিহার মধ্যভারতে এটি একটি পরিচিত শব্দ। যার অর্থ নিষ্ফলা,রুক্ষ প্রান্তর।আবার স্থানীয়রা বলে টাঁড় মানে উঁচু জমি যা বন্যায় ডোবে না)।শরীরে চেপে বসা রোদ,ভেজা মেঘের তুলো ঘষে ঘষে তুলে ফেলার ডাক নিয়ে আসে টাঁড়ের পিছন থেকে আসা এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস।গাড়ির কাচ নামিয়ে দিতেই নাকে ঝাপটা মারে হরিৎ শালের কিশলয়ের ঘ্রাণ,টোপাটোপা পাকা মহুয়া ফলের ঘ্রাণ।মাঝে মাঝে পার হয়ে যাচ্ছি বসতি।চোখে পড়ছে কাকেদের গাছের ডাল পাল্টানো, পাঁজর জাগা গেরস্থের গরুর পাল,পাংশু মোরগের ব্যস্ততা,দলবদ্ধ ছাগলদের থেকে ছিটকে আসা দু একটি কচি ছাগলছানার সিদ্ধান্তহীনতা।চোখে পড়ে একলা তাল,কাঁটা খেজুরের গাছগুলো।চোখে পড়ে টাঁড়ের জমিতে মাটির ক্ষয় রুখতে,রাস্তার দুধারে ইউক্যালিপটাস,অ্যাকাশিয়া,শাল গাছের বনসৃজন।পড়ন্ত বেলার রংচটা আকাশের তাঁবুর নিচে যে দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটে চলেছে,সে যেন সত্যিই এক গভীর ‘ব্যালাড’।মধ্যাহ্নের স্তব্ধতায় পাতাকুড়ানিদের পদক্ষেপে বেজে ওঠে সহস্র সেতার।সৌন্দর্য মোহে আচ্ছন্ন আমার অহঙ্কারী শিরদাঁড়া আপনা আপনিই নুয়ে আসে।বাতাবী লেবু ফুলের গন্ধ,মাধবীলতার গন্ধ,বুনো জুঁই এর গন্ধ,কাঠ চাঁপার গন্ধ দেবভূমির মত পরিবেশ রচনা করে দিয়েছে আমার যাওয়ার সারা পথটি জুড়েই।গন্ধ চেনায় এত সুখ!এখানেই তো মনের সঙ্গে অনন্তের যোগ ঘটে।আকীর্ণ দেবতা,চারধারে দেবদূতের ছড়াছড়ি।আচ্ছন্ন ভূবন,সমস্ত দেবভূমি।আকাশে দু হাত তুলে ধরা গাছগুলোতে পুষ্প পত্রের বালাই নেই,অথচ তারই মাঝে দুর্মর সাহসে দু একটি পাতা কোনোরকমে ঝুলে রয়েছে।গাছে গাছে ঝুলে রয়েছে মৌচাক।গাড়ির ভেতরে ঢুকে আসে মৌমাছি সহ এক আধটা কালো বোলতা।কানে কানে বলে গেল মাস্টারমশাই আমিও এরকমই একটা নিরুপদ্রব পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি।কে জানে হয়তো এই পূর্ণিমাতেই ভানুমতী বা দোবরু পান্নার দেখা পেয়ে যাব!

12931041_1319715784712432_2252126860820451268_n

পৌঁছে গেলাম ভালোপাহাড়। ভালোপাহাড় কি,কেন,কিভাবে,কতটা এসব বলার জায়গা এটা নয়।আর তাছাড়া ভালো পাহাড় নিয়ে কমল দা (শ্রী কমল চক্রবর্তী)কে ছাড়া কিছু বলা অনধিকার চর্চা হয়ে যাবে।সেটা শোভন নয়।সেসব কথা পরে বলা যাবেখন,অন্য কোনো খানে,অন্য কোনো পরিবেশন পরিস্থিতিতে।এককথায় এটুকুই বলা যায় একটা অতিমানবিক ভাবনার বিস্ময়কর বাস্তবিক উপস্থাপন।আমি অভিভূত। আনত সশ্রদ্ধ প্রণাম।

ইস্ট ইন্ডিয়া ট্র‍্যাভেলার্স ক্লাবের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরে আসছি।পুরুলিয়ার নানা জায়গায় তাঁবু ফেলে থাকছি।খাওয়া দাওয়া,মঞ্চ বেঁধে গান,কবিতা,মূকাভিনয়,বাজনা নাচের আসর, সেটাও নতুন কিছু নয়।নতুনত্ব হল অনুষ্ঠানের ভাবনার নিত্যনতুনত্বে।বিশেষত্ব হল পরিবেশনা আর প্রকাশ আঙ্গিকের অভিনবত্বে।প্রতিবারই পুনঃনির্মানের এই গুরুদায়িত্বটা পালন করে বিপ্লব(সর)শিল্পী(সর)।সঙ্গতে থাকে জ্যোতির্ময়,আশিস,পদ্মিনী,সুস্মিতা, অনির্বাণের মত আদ্যন্ত সংস্কৃতি মনস্ক কিছু মানুষ।অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সহযোগী কুচোকাচা থেকে প্রবীন মানুষগুলিও।যেখানে দেবাশিস(মল্লিক চৌধুরী) ,উদয়(বন্দ্যোপাধ্যায়) ,সন্দীপ(দে),অতনু(পাল),বাবু(তৃণাঞ্জন ভট্টাচার্য),কমল(নস্কর),শুভ্রা(নস্কর) প্রমুখের মত শিল্পীরা আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী,তাই বাকি কথা না বললেও চলে।এঁদের সহজাত প্রতিভা খালি মনে করিয়ে দেয় ‘বয়স কেবল একটা সংখ্যা মাত্র’।খুব সাবলীলভাবেই দেহের বয়সকে ধরে রাখা যায়,শুধু আপন সৃজনশীলতার মন জমিনে তপস্যা বীজ বপন করে চললে।আর অতি অবশ্যই যার কথা না বললেই নয়,তিনি হলেন অরুণ দা।কবি শ্রী অরুণ চক্রবর্তী। প্রতিবছর বসন্ত কালে যাঁর এক বছর করে বয়স কমে যায়।

পড়ন্ত বিকেলে শুরু হল ছৌ নাচ।প্রয়াত গম্ভীর সিং মুড়ার সুযোগ্য পুত্র কার্তিক সিং মুড়ার পরিচালনায় চলল মনোজ্ঞ ছৌ নাচ।সন্ধ্যে বেলা আগে থেকে তৈরি করা মঞ্চে শুরু হল নাচ,গান,কবিতা,শ্রুতিনাটক,মূকাভিনয় ইত্যাদি।চারপাশে তাঁবু খাটানো,মেঝেতে খড় বিছোনো,তার উপরে চাদর পাতা।সেদিন তো দোল(০১/০৩/২০১৮)।কাজেই কিছু পরেই পূর্ণিমার চাঁদ উঠলো।শাল পলাশের বনের মাথায় চাঁদ এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।যেন সমস্ত ভালোপাহাড় গলে গলে পড়ছে।টুপ টাপ করে সাদা মুক্তো রঙের আলোর ফোঁটা।কয়েকটা গায়ে,কয়েকটা তাঁবুর দড়িতে,কয়েকটা পেতে রাখা খাটিয়ার উপরে পড়ে ভালোপাহাড়ের মাটিতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে।

চারিদিকে জ্যোৎস্না আলোকিত নানা রঙে,নানা ঢংয়ে ডুংরি।চাঁদ নিংড়ে নেওয়া আলো।সখ্য না হয়ে পারে জঙ্গলের সঙ্গে?মৌন নিশীথে ভালোপাহাড়ের উন্মুক্ত প্রান্তরে বসে দেখছি অপার্থিব নৈসর্গ।আলোর খুশিতেই ঝলমলে কিশলয়।কবিতার মতই স্নিগ্ধ পটভূমি।নিবিড় মনে বাঁশি বাজাচ্ছিল সন্দীপ(দে)।বেদনার মত সুর ভেসে বেড়াচ্ছে বুরু থেকে বুরুতে,ডুংরি থেকে ডুংরিতে।মনের তন্ত্রীগুলো স্বাভাবিক ভাবেই এলোমেলো।হৃদয়যন্ত্রের তন্ত্রীও মাঝে মাঝে লয়হীন হয়ে থাকতে পছন্দ করে।কি গহন গভীর রহস্য যে মাখানো অঙ্গে অঙ্গে,সে বুঝতে শিল্পীর চৈতন্য লাগে।বহুমাত্রিক জ্যোৎস্নায় চরাচর অবর্ণনীয় লাগে।বারে বারে বলে পরাজিত হতে শেখো,পরাজিতের মায়া বড় অদ্ভুত।আকাশ ঝুঁকে এসেছে।তার আহ্বানে ক্লান্তি নেই,আয়োজনের অন্ত নেই।ঠাণ্ডা,ছমছমে,ঝাঁঝালো আকন্ঠ কাঁচামিঠে জ্যোৎস্নার গন্ধ অনেকটা কাঁচা শালপাতার মত লাগে।শুধুই সুবাস।জানিনা নিজেকে কেমনধারা লাগছিল।সব আলোয় সকলকে তো আর একই রকম উজ্জ্বল দেখায় না! চাঁদের আলোই তখন আমার ভিক্ষাভূষণ।

এখানে চাঁদই অলক্ষ্যে এসে পর্যটকের থুতনি ধরে চুমু খায়।অন্ধকারে মুঠি খোলে বন্ধ জোনাকির ঝাঁক। তারই ফোঁকর দিয়ে আকাশ দেখা যায়।আনন্দের ভিয়েন বসেছে।ডুবে যেতে যেতে শ্বাস নিতেও ভুল হয়ে যায়।মনে পড়ে,ডুব সাঁতার দিতে দিতে নিশ্বাস নিতে নেই।দেখি,জ্যোৎস্নার রূপালী আঁশ জমেছে গাছের পাতায়,ঘাসে,মাটিতে।অন্ধকার বয়ে চলে স্রোতের মত।মসৃণ অরণ্য অগম্য রমণীর মত সারি সারি দাঁড়িয়ে।এই বিজন রূপলীলা প্রত্যক্ষ করতেই তো আসা।আরণ্যকের উৎসভূমি,ঋষিপ্রতিম রচয়িতার স্নেহের অরণ্য ভূমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবার জন্য ,অনাগত দিনের মানুষের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকুক।এবার,ছবি দেখি……

আসল কথাটাই তো বলা হয়নি,ছবিগুলো কিছু আমার নিজের তোলা ,কিন্তু আরও অনেক ছবি তুলে দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন অমিয়(নস্কর) দা,বাবু(তৃণাঞ্জন ভট্টাচার্য),আশিস(ঘোষ)দা।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *