মাল্টি টাস্ক করবে কখন?

Screen-shot-2014-07-05-at-8.20.32-AMমাঝে মাঝেই বন্ধু বান্ধবের বাড়ি আমন্ত্রনে যেতে হয়। বন্ধু ও তার স্ত্রী সঙ্গে গল্প গুজবের ফাঁকে ফাঁকে তাদের ছেলে মেয়েরা কখনও কখনও আমাদের আড্ডায় ঢুকে পড়ে তবে গল্প করার জন্য নয়, নেহাতই বাবা মায়ের সঙ্গে দরকারি কথা সারতে। প্রশ্ন করলে কথা বলে নাহলে ছোট্ট একটা হাই-কাকু বলে চলে যায়। দারুন ব্যাস্ত এরা। সকলেরই হাতে মোবাইল, ট্যাব… মোবাইল এ কথা বলছে, ট্যাবে মেসেজ করছে।এক সঙ্গে আজকালকার ছেলে মেয়েরা অনেক কাজ করে, মানে ওই মালটি টাস্ক। আমরা করতাম না পারতাম না বলে হয়তো।শিক্ষক ও বাড়ি থেকেও বকাবকি করত।বলা হত কোণটাই ভালো করে হয় না।বাড়ি এসে ভাইপোর ঘরে উঁকি মেরে দেখি সেও একই করছে—সামনে ল্যাপটপ খোলা, কানে মোবাইল, পড়ার বই দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম বই কোথায়? ঘোলাতে চোখে তাকাল,খুজতে খুজতে উত্তর দিল এখানেই তো ছিল। বুজলাম ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেটএর ভীরে হারিয়ে গেছে।নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিয়ে ভাবলাম এটা নিয়ে জানতে হবে যে মালটি টাস্ক এই প্রজেন্মের ক্ষতি করছে কি না।

এই যে আজকালকার ছেলে মেয়েরা কানে আইপড-এ গান শুনছে,কম্পিউটারে ফেসবুক পেজ-এ চ্যাট করছে, মোবাইলে কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে এর মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে পড়ার বই। এতো গুলো জিনিস একসঙ্গে করছে , কোনটাই কি ঠিক মতো হচ্ছে ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন একসঙ্গে হরেক ধরনের কাজ করলে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ে। মালটি টাস্ক খুব নগণ্য সংখক মানুষরাই করতে পারে, তারা মালটি টাস্ক করলেও নিজের পড়ার কাজটি করতে সক্ষম হয়। বেশিরভাগরা পারে না জোর করে করতে গিয়ে তারা মানসিক ভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।গবেষকরা আরও  বলছেন কেউ যদি এক কাজের থেকে অন্য কাজে ঘন ঘন যাতায়াত করে সেটার ফল হয়, গভীর ভাবে ভাবনা চিন্তা ও মূল্যায়ন করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেক সময়েই অপ্রয়োজনীয়  এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ফারাক করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

কয়েকজন কলেজ পড়ুয়াকে এ ব্যাপারে গবেষণা চালানো হয়েছিল। তাদেরকে মালটি টাস্ক করতে দেওয়া হয়। শেষে দেখা যায় পরের কাজটা করতে গিয়ে আগের কাজের খেই হারিয়ে ফেলেছে। নতুন করে আবার কাজটা করতে গিয়ে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে,তেমনেই তাদের কাজে মন দিতেও অসুবিধে হচ্ছে।

ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেট-এর প্রতি আসক্তি শুধু যুবক যুবতীদেরই নেই বয়স্কদেরও আছে। অভিভাবকদের গ্যাজেট নিয়েই এদের হাতেখড়ি হয়।অভিভাবকরা নিজেরাই এতো মত্ত তো ছেলে মেয়েদের ওপর নজর রাখবে কি করে। বাড়িতে কমপুটার আছে সঙ্গে নেট সংযোগ অভিভাবকদের বেশি নজরদারি ওটাতেই থাকে কিন্তু ট্যাব, মোবাইল এতেও তো নেট সংযোগ আছে সেখানে ছেলে মেয়েরা কোন সাইট দেখছে কে কার খোঁজ রাখে। অভিভাবকরাও শুরু থেকে বলে দেন না কোন সাইট দেখা উচিৎ কোণটা নয়। আজকের দিনে জগতজুড়ে কারোর অস্বীকার করার অবস্তা নেই যে ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেট আমাদের জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে।অজানাকে জানতে একটা ক্লিক ব্যস সব চোখের সামনে।কিন্তু শুধু মাত্র সকাল থেকে গভীর রাত অবধি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য গ্যাজেটের ব্যবহার এটাই ভাবাচ্ছে। শুধু স্কুল কলেজ নয় বাড়িতেও এদের সময় কাটে ফেসবুক নতুবা হোয়াটসঅ্যাপে। সমস্যা এতো গভীরে চলে যাচ্ছে ক্রমশ মুখোমুখি কথা বলার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলবে। বিষয়টা গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

বিজ্ঞান মানুষকে প্রযুক্তি দিয়েছে। এটার ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন বিশেষ করে যুবক যুবতীদের ক্ষেত্রে শুধু অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে, বোঝাতে হবে ফেসবুক বা হোয়াটঅ্যাপ-এ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলছে চলুক সাথে সাথে সামাজিক অনুষ্ঠানেও যোগদিতে হবে, মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। মালটি টাস্ক করবে কখন? যখন বিশেষ কিছু কাজ করছ না,তখন মালটি টাস্ক করতে অসুবিধে নেই। একটু পরিকল্পনা করে সময় সুযোগ অনুযায়ী মালটি টাস্ক করতে হয়। অভিভাবকরা ছেলে মেয়েদের বোঝান। গবেষকরা বলছেন ওদের সঠিক পথ দেখান হয় না বলে ছেলে মেয়েরা ভুল করে। নীচে গবেষকদের কিছু পরামর্শ দেওয়া হল অনুসরণ করলেই কাজে দেবে।

১) টেকনোলজি, গ্যাজেট, ইন্টারনেট, এই সব গুলোর ব্যবহারে ভালো মন্দ দুটোই কাজ করা যায়। ধরে নেওয়া যাক কেউ ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে ৫টা উইন্ডো খোলা রেখেছে একটায় আইআইটি মুম্বাই, একটায় ‘নাসা’র লেটেস্ট প্রোজেক্ট, একটায় ফেসবুক, ইউটিউব ও ফ্লিপকার্ট। এবার আপনাকে এই ৫টির মধ্যে গুরুত্তের অগ্রাধিকার দিতে হবে, কোণটা এই মুহূর্তে বেশি জরুরি কোণটা কম। যেটা জরুরি খোলা রাখুন বাকি গুলো বন্ধ করে দিন।

২) চলাফেরা বা কারোর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় বা পরিবারের সঙ্গে ডিনার করার সময় বা বন্ধুদের সঙ্গে ক্যান্টিনে আড্ডা দেওয়ার সময় ফেসবুক বা হোয়াট অ্যাপে মগ্ন বিশেষ করে বান্ধবীর সঙ্গে থাকাকালে এই আচরণ কখনই করা উচিৎ নয়। কেউ হয়তো বলবে আমি তো মালটি টাস্ক করতে পারি তাই আমার অসুবিধে হচ্ছে না কিন্তু উল্টো দিকে ভাবলে এটাও তো হতে পারে কারোর এই আচরণ অন্যের মন খারাপ বা সন্মানহানি করতে পারে অতএব বিরত থাকা উচিৎ।

৩)কতগুলো জিনিস করার সময় গ্যাজেটকে নো এন্ট্রি করতে হবে। কলেজের প্রোজেক্ট বা টার্ম পেপার তৈরির সময়, মোটর সাইকেল চালানোর সময়, রাতে শোবার সময় নির্দিষ্ট করা এবং কোনও ভাবেই গ্যাজেটের মজা নিতে গিয়ে ঘুমের মাটি না করা।

৪) আমি দারুন ইংরেজি লিখতে জানি, ‘ফেসবুক’ ‘টুইটার’ ফাটিয়ে দিচ্ছি এটাই সব না। টেকনোলজি এটিকেট বলে একটা ব্যাপার আছে এটা মাথায় রাখতে হবে। যে ভাষায় বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি নিশ্চয় সেই ভাষায় নিশ্চয় বাবা মার সঙ্গে বলি না। কে কি লিখছে, কি ভাবে লিখছে ভালো করে লক্ষ্য রাখতে হবে।দুমদাম কমেন্ট বা লাইক থেকে বিরত থাকা জরুরি।

৫) এবার নিশ্চয় শেষ করবো, শুধু অনলাইন না অফলাইনও হতে শিখতে হবে। ইন্টারনেটের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে সেই দুনিয়ায় মজার কমতি নেই আর আমাদের আগের প্রজন্ম ইন্টারনেট ছাড়াই বড় হলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *