‘মাই নেম ইজ গহর জান‘’

gauharjan‘বাড়ি বাড়ি বাঈ বাঈ ভেড়ুয়া নাচায় বাঈ

মনোগত রাগ সুর ধোরে.

মৃদু তান ছেড়ে গান, বিবিজান নেচে যান,

বাবুদের লবেজান কোরে’।

ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের কলকাতার বাবু বিলাস এক চর্চিত অধ্যায়।ঐ সময়ে বাবু বিলাসের মুল উপকরন ছিল বাঈ বিলাস। বাবুরা শুধু উপলক্ষ্যের অপেক্ষায় মুখিয়ে থাকতেন। দোল, দুর্গোৎসব,বিয়ে, মুখেভাত সবেতেই অভিজাত বাবুদের প্রাসাদে মুজরো বসে যেত। বাঈ-নাচ দেওয়া প্রায় রীতি হয়ে দাড়িয়েছিল। নাহলে বাবুদের মান থাকতো না।

১৮৫৬ সালে লখনউ আওধের মসনদ হারিয়ে কলা-রসিক নবাব ওয়াজেদ আলী শা আশ্রয় নিলেন কলকাতার গার্ডেনরিচ এলাকার গঙ্গার ধারে।হাতির পিঠে হাওদায় বসে আছেন ক্লান্ত নবাব।মাথাটা বুক ছুঁয়ে ঝুঁকে আছে।নবাবের পেছনে চলেছে লোক লস্করের মিছিল। ভাগ্যহত নবাবকে সব ছেড়ে আসতে হয়েছিল,যা পারেন নি সেটা হোল তাঁর হারেমের তিনশত বেগম,নর্তকী ও বাঁদীদের।নবাবের শোক পর্ব তো আর বেশিদিন চলতে পারে না, তাই অল্প কিছু দিন অতিক্রান্ত হতেই নাচ,গান,রং তামাসায় মেতে উঠেছিল মেটিয়াবুরুজ।

ফুর্তির ভরা জোয়ারে ভাটার টান পড়লো ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে নবাবের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে।বাধ্য হয়ে বাস্তুহারা বাঈ-নর্তকীরা তখন শিল্প সংস্কৃতির প্রান কেন্দ্র কলকাতাকেই তাদের রুটি রুজির স্থায়ী আস্তানা বানিয়ে ফেলল।কলকাতার বাবুদের প্রাসাদগুলো তখন বাঈ নর্তকীদের হিরের গয়নার দ্যুতিকে ছাপিয়ে কণ্ঠস্বর ও নাচের জাদুতে আচ্ছন্ন থাকতো |

কলকাতায় চিৎপুরে নগদ ৪০ হাজার টাকায় বিশাল বাড়ি কিনেছেন মালকা জান। ঐ নতুন কুঠীতে ঢল নামলো নব্য বাবুদের।বেনারস থেকে মালকা জান মেটিয়াবুরুজ এসেছিলেন মসনদচ্যুত নবাবের ঘায়েল হৃদয়ে প্রলেপ লাগাতে। আর ফিরে যাওয়া হয়নি।মালকা জানের আসল নাম এডেলাইন ভিক্টোরিয়া হেসিংখ।।জাতে আর্মেনিয়ান। উইলিয়াম ইওয়ার্ডের সঙ্গে বিয়ে হয় ভিক্টোরিয়ার।কিন্তু এই বিয়ে টেকেনি। এদের সন্তান ঈলীন এঞ্জেলিনা ইওয়ার্ড। স্বামী পরিত্যক্তা ভিক্টোরিয়া প্রেমিক খুরসিদকে সাদি করে মা মেয়ে দুজনেই ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। নাম হয় মালকা জান।আর মেয়ে ঈলীন এঞ্জেলিনা গহর জান নামে ভারত প্রসিদ্ধ হন।

ভারতের প্রথম মহিলা সুপারস্টার গায়িকা গহর জান |১৯০২ সালে প্রথম ভারতীয় শিল্পী যাঁর গান গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ড করেছিল। যতদিন বেঁচে ছিলেন সুপারস্টারের কেতায় জীবন কাটিয়েছেন। গহর জানের আড়ম্বর জীবন যাপনের কাহিনী লোকের মুখে মুখে ফিরত।শোনা যায়‚ পোষা বিড়ালের বিয়েতে খরচ করেছিলেন ১২০০ টাকা | সেই বেড়াল যখন মা হল‚ গহর জান ২০০০ টাকা খরছা করেছিলেন | ৪ ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ার জন্য ভাইসরয়কে ১০০০ টাকা করে প্রতিদিন জরিমানা দিতেন |তখনকার দিনের কোটিপতি ছিলেন তিনি | নিয়মিত বাজী ধরতেন রেসের মাঠে | একবার অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সময় খেয়ালে  ভাড়া করে ছিলেন আস্ত ট্রেন | তাতে বাজনদার ছাড়া গহরের নিজস্ব রাঁধুনি‚ রাঁধুনির সহকারী‚ হাকিম‚ ধোপা‚ নাপিত এবং খাস চাকর |  এমনই ছিল তার ঠাটবাট।

শ্রীজান বাঈ, ওস্তাদ কালে খাঁ,কত্থক সম্রাট বিন্দাদীন মহারাজের কাছে কত্থক নাচ,চরনদাসের কাছে কীর্তন, শিবপ্রসাদ মিশ্র, ভাইয়া সাহেব গণপত রাও, মৌজুদ্দিন খাঁ, পেয়ারা সাহেব, রামপুরের নাজির খান ও সারেঙ্গী বাদক বেচু মিশ্র প্রমুখ ওস্তাদদের কাছে তালিম নিয়ে পরিনত হয়ে উঠেছেন। মা মালকা জানেরও পড়ন্ত বেলা। ১৮৯৬ সালে গহর জান স্বাধীনভাবে ভারতের বিভিন্ন শহরে মুজরো করা শুরু করলেন।

গহর জান ছিলেন জাত শিল্পী। আর সব বাঈজিরা যখন বাবুদের রাতের মজলিশ রঙ্গিন করতে ব্যস্ত থাকতো,তখন গহর জানের স্থান অন্য স্তরে। অনেকটা রোলস রয়েস গাড়ির মতো। শুধু টাকা থাকলেই কেনা যায় না,সামাজিক পদ মর্যাদাটাও বিবেচ্য। মেহফিল পিছু নজরানা নিতেন ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা | রেকর্ডিং পিছু নিতেন ৩ হাজার টাকা | গহর ছিলেন সেযুগের মডেল। ব্যবসায়ীরা দেশলাই বাক্সে‚ পিকচার পোস্টকার্ডে গহরের ছবি ছাপাতো। এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিনত হয়েছিলেন গহর জান।

১৯০২ থেকে ১৯২০ অবধি ১০ ভাষায় অজস্র গান রেকর্ড হয়েছে | বাংলা‚ হিন্দি‚ গুজরাতি‚ তামিল‚ মরাঠি‚ আরবি‚ পার্সি‚ ফরাসি‚ ইংরেজি। তখন কলের গান মানেই গহর জান | প্রতি রেকর্ডের শেষে তিনি বলতেন‚ ‘ মাই নেম ইজ গহর জান‘|

১৯১১ সালে দিল্লিতে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ এসেছিলেন। তার সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান গাইবার ডাক পান গহর জান | রাজা পঞ্চম জর্জ গহরের সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে এক হাজার গিনি নজরানা দিয়েছিলেন।

গহর জানের শেষ জীবনটা বড় দুঃখের। পয়সার অভাবে প্রায় পথের ভিখিরি হয়ে গিয়েছিলেন। গহরের জীবনে বহু সম্ভ্রান্ত মানুষের আগমন হয়েছিল।কিন্ত বিয়ে করেছিলেন বয়সে ছোট সৈয়দ আব্বাসকে |আব্বাস গহরের তবলচি ছিল | যেদিন বুঝতে পারলেন স্বামীর জন্য সর্বস্বান্ত হতে বসেছেন ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে | গহরের বেশিরভাগ টাকাই আত্মসাৎ করে ফেলে আব্বাস | বিয়ে ভাঙল |কিন্তু গহরকে মামলা মোকদ্দমার নাগপাসে জড়িয়ে দিল আব্বাস | দীর্ঘদিন মামলা চলার পর গহর জিতলেন। কিন্তু নামী উকিলদের পিছনে টাকা ঢেলে ফতুর হয়ে গেছেন গহর।

নিঃস্ব গহরের পাশে দাঁড়ালেন মহীশূরের রাজ পরিবার | রাজা চতুর্থ কৃষ্ণ ওয়াদিয়ার আমন্ত্রণে রাজসভায় গায়িকা ও নর্তকী হয়ে মহীশূর গেলেন | নামেই পদ,আসলে শেষজীবনের প্রাপ্য কিঞ্চিৎ সম্মান | অন্যের বদান্যতায় বেঁচে থাকাটাকে মেনে নিতে পারছিলেন না গহর জান। ১৯৩০ সালে ১৭ই জানুয়ারি  নিঃসঙ্গ‚ কপর্দকহীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *