১৬ই জুন ১৯২০, “সুরের আকাশে তুমি জেগো ধ্রুবতারা”

imageফিল্মিস্তান স্টুডিয়োর শশধর মুখোপাধ্যায় আনন্দমঠ সিনেমার সুর করার জন্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে কলকাতা থেকে বোম্বাই নিয়ে আসেন। সিনেমায় লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে বন্দেমাতরম গান গাইয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।নিজে গীতা দত্তের সঙ্গে দুয়েট গেয়েছিলেন ‘জয় জগদীশ হরে’। সিনেমাটির গান যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু ছবি সুপার ফ্লপ। মনের দুঃখে হেমন্ত কুমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, আর নয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে কলকাতায় ফিরে যাবেন।বোম্বাই ভিটি ষ্টেশন থেকে লুকিয়ে হেমন্ত পত্নী শশধর বাবুকে ফোন করে দেন। তড়িঘড়ি শশধর বাবু ষ্টেশনে পৌঁছে হেমন্তকে আটকান।অনুরোধ করেন, ‘‘আমি তোমাকে এখানে এনেছি, তুমি চলে গেলে, তুমি তো হারবে না, আমি হেরে যাব। একটা হিট ছবি দিয়ে তুমি যেখানে খুশি চলে যাও। আমি বাধা দেব না।’’

ভাগ্যিস সেদিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ফিরে আসার ভাবনায় ছেদ টানেন, নাহলে সঙ্গীত প্রেমিরা ‘নাগিনে’র অমর সঙ্গিতের রস থেকে বঞ্চিত হতেন।নাগিন ছবির গানের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কুড়ি বছর বাদে ভেঙেছিল ‘ববি’।

অথচ এই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই এক সময় রেকর্ড কোম্পানির দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। জলসায় গাইতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অন্য শিল্পীর গান শুনেছেন।দাদা আমায় কখন গাইতে দেবেন? ‘‘দূর মশাই, আপনার গান কে শুনবে? দেখছেন না, পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন! ওঁর গান শুনে বাড়ি চলে যান।’’

প্রথম রেকর্ড বেরনোর পর সেটাকে কাগজে মুড়ে হাতে নিয়ে চেনাজানা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। শচীনকর্তার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শুনতেন কোনও বাড়িতে পঙ্কজ মল্লিকের গান বাজছে, স্তব্ধ হয়ে ভেবতেন, ‘‘আমার গান কি কোনও দিন এমন ঘরে ঘরে বাজবে?’’

তখনও যুবকটি জানতোনা, ঘরে-ঘরে কেন, তাঁর শ্রোতার দলে এক দিন নাম লেখাবেন উস্তাদ আমির খান, মেহদি হাসান! দিল্লির এক জলসায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনে মুগ্ধ উস্তাদজি বলেছিলেন, ‘‘তোমার গান শুনছিলাম এতক্ষণ। গজল সম্রাট মেহদি হাসান বলতেন, ‘‘দেখা হলে লতাজির কণ্ঠে একটা চুমু দিতে চাই।’’ আর পুরুষ-কণ্ঠ হলে ‘‘হেমন্তকুমারের। এই উপমহাদেশের সেরা কণ্ঠস্বর হেমন্তকুমারের।’’

সঙ্গীত জগতে স্থান পাওয়ার জন্য লড়াইয়ের দিনগুলিতে হতাশ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একসময় সব ছেড়েছুড়ে সাহিত্যিক হতে ছেয়েছিলেন।কয়েকটি লেখা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও সাহিত্যিক হওয়া হয়ে ওঠেনি। ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিকে পাশ করার পর বাবার ইচ্ছেয় যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হতে হয়েছিল।এক্ষেত্রেও ইঞ্জিনিয়ারিং গিরি করা হয় নি- হলেন গায়ক। বিধাতার এই ইচ্ছে ছিল।

বন্ধু অভিনেতা অসিতবরণকে ধরে রেডিয়োয় অডিশনের ব্যবস্থা করে ফেললেন। অভিনেতা অসিতবরণ তখন রেডিয়োয় তবলা বাজান। অডিশনে পাশ করার তিন মাস বাদে প্রোগ্রামের চিঠি এল। গান শুনে পাহাড়ী সান্যাল বললেন,‘‘বাহ্, চর্চা করলে ভাল গাইয়ে হবে।’’ পঙ্কজ মল্লিক এক দিন আকাশবাণীতে অনুজ হেমন্তকে দেখে বললেন, ‘‘তুমি তো দেখছি আমাদের ভাত মারবে!’’

এর পর সময় যত এগিয়েছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের জীবনে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকল। বেশ কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড বেরল। রেডিয়ো থেকেও ঘন ঘন ডাক। ‘মহালয়া’। আইপিটিএ। সলিল চৌধুরী। প্রথম প্লে-ব্যাক।কিন্তু অর্থের সুদিন আসেনি। অর্থের কারণে বহু দিন পর্যন্ত গানের টিউশানি করেছেন। বাঁধা রোজগারের জন্য গ্রামাফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে গানের ক্লাস নিতেন। বলতেন, ‘‘টিউশনি না করলে খাব কী?’’

১৯২০ সালে ১৬ই জুন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জন্ম। ৪৫ সালে বিয়ে করলেন বেলা মুখোপাধ্যায়কে। ছেলে জয়ন্ত আর মেয়ে রানুকে নিয়ে কলকাতার ইন্দ্র রায় রোডের ভাড়া বাড়িতে ভরা সংসার। মেয়ে রানুর ওপর অনেক ভরসা ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। সে ইচ্ছে পুরন হয় নি বলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মনে দুঃখ ছিল। শ্রাবন্তী মজুমদারের সঙ্গে ডুয়েট ‘আয় খুকু আয়’ গানটা রাণুরই গাওয়ার কথা ছিল। ভি বালসারা রাণুর কথা ভেবেই গানটা কম্পোজ করেছিলেন। ‘মাসুম’ ছবির ‘নানী তেরি’ গানটির শেষ অন্তরাটা রাণুর গাওয়ার কথা ছিল কিন্তু রানুকে না পেয়ে ফিমেল ভয়েস-এর জন্য কবিতা কৃষ্ণমূর্তিকে নেওয়া হয়।

১৯৬০-৬১ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম হিন্দি ছবির প্রযোজনা ‘বিশ সাল বাদ’।ছবিটি তৈরি হয়েছিল ডালডা’র সবচেয়ে বড় বড় ডাব্বায় জমানো ১লাখ ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে! ঐ সময় টাকাটা নেহাত কম নয়।গলায় বিশেষ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও লতা মঙ্গেশকর বিনা পারিশ্রমিকে গান গেয়েছিলেন। লতাকে টাকার খাম দিতে গেলে,ফুঁসে উঠে খাম সরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- ‘‘দাদা, আপ মুঝে প্যয়সা দে রহেঁ হ্যায়?’’ এতটাই শ্রদ্ধা করতেন লতা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে।

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সাল, শরতের সকাল সওয়া এগারোটায় হেমন্ত নেই।

সুত্রঃ আনন্দবাজার।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *