“সিনেমার বাইরে তিন-চার রকমের জহর ছিলেন”

imageযে কোনও অবস্থাতেই জহর রায়ের ঠোঁটে কথার পিঠে কথা জুগিয়ে যেত, তা পরিচিত মাত্রেই জানতেন। মঞ্চে দু’মিনিটের সংলাপকে তিনি হরদম বিশ মিনিটে টেনে নিয়ে যেতেন আর দর্শক হেসে গড়িয়ে পড়ত। সিনেমাতেও মাঝে-মধ্যেই বাঁধা সংলাপ ছাড়িয়ে নিজের কথা গুঁজে দিতেন। সত্যজিৎ রায় নিজেও সে পরিচয় পেয়েছিলেন বেশ কয়েকবার।

‘পরশপাথর’ ছবির শুটিং চলছে। তার ফাঁকে আড্ডায় এক দিন কথা উঠল বয়স নিয়ে। সত্যজিত রায়ের জন্ম ১৯২১ সালে, জহরের ১৯১৯। তা শুনেই সত্যজিৎ বলে উঠলেন, ‘সে কী জহরবাবু, আপনি তো দেখছি আমার চেয়ে দু’বছরের বড়। তা হলে আমাকে মানিকদা বলে ডাকেন কেন?’ জহরের তাৎক্ষণিক জবাব, ‘আমি আপনার চেয়ে এজ-এ বড়, কিন্তু আপনি যে ইমেজে বড়!’ মুহূর্তের স্তব্ধতা আর তার পরই ব্যারিটোনে অট্টহাস্য।

‘পরশপাথর’ যখন হচ্ছে, তত দিনে বাংলা ছবিতে অন্তত দশ বছর হয়ে গিয়েছে জহরের। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ হয়ে গিয়েছে। পাশেই দাপটে অভিনয় করছেন তুলসী চক্রবর্তী, তুলসী লাহিড়ী, অজিত গঙ্গোপাধ্যায়, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, নবদ্বীপ হালদারেরা। তবু তার মধ্যেই নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন জহর। এবং তাঁর দোসর ভানু।

বাবা সতু রায় ছিলেন নির্বাক যুগের নামকরা অভিনেতা। কিন্তু তাতে জহরের বিশেষ সুবিধে হয়নি। জহরের জন্ম বরিশালে। বাবা পরে চলে আসেন কলকাতায়। শেষে চাকরি সূত্রে স্ত্রী আশালতাকে নিয়ে পটনায় গিয়ে থিতু হন। সেখানেই জহরের অনেকখানি বেড়ে ওঠা। প্রথম অ্যামেচার থিয়েটারে অভিনয়ও।

তত দিনে তিনি গুরু মেনেছেন এক সাহেবকে। বয়সে বছর কুড়ির বড়। নাম চার্লস চ্যাপলিন। জহরের স্কুলবেলা ফুরনোর আগেই হয়ে গিয়েছে ‘দ্য কিড’, ‘দ্য গোল্ড রাশ’, ‘দ্য সার্কাস’, ‘সিটি লাইটস’। ‘মডার্ন টাইমস’, ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ আসছে— তখন তিনি সদ্যতরুণ। ‘পাগলের মতো চ্যাপলিনের ছবি দেখতাম। এক-একটা ছবি আট বার দশ বার করে। তাঁর অভিনয়ের প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি মুভমেন্ট গুলে গুলে খেতাম’, বলেছেন জহর।

তখন দেশভাগ হব-হব করছে। কলকাতা অশান্ত। অর্ধেন্দু ‘পূর্বরাগ’ করার তোড়জোড় করছেন। জহর হাজির। অর্ধেন্দু দেখে নিতে চাইলেন, ছেলেটা কতটা কী পারে। চ্যাপলিন হয়ে উঠে জহর শুরু করে দিলেন ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’। মিলে গেল রোল। তবে ‘পূ্র্বরাগ’ নয়, সম্ভবত সুশীল মজুমদারের ‘সাহারা’ ছবিতে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান জহর। এর পর বিমল রায়ের ‘অঞ্জনগড়’।

ঘটনাচক্রে, ওই সময়েই ‘জাগরণ’ ছবিতে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছেন বিক্রমপুরের এক বাঙাল, এর পর প্রায় সারা জীবন যিনি জহরের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে জুড়ে যাবেন— ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু পরদায় নয়, পরদার বাইরেও ভারী ভাব দু’জনে। এ ওর ‘ভেনো’ আর ‘জহুরে’। দর্শক ওঁদের দেখলেই হেসে কুটোপাটি। তাই পরিচালকেরা ওঁদের গুঁজে দেন যেখানে-সেখানে দু’চার সিনে।

ভানু পরে আক্ষেপ করেছেন, ‘আমাকে এবং জহরকে বেশির ভাগ পরিচালক ‘কমিক রিলিফ’ হিসেবে ব্যবহার করেছে।’ খানিক নামডাক হওয়ার পরে ভানু ছোটখাটো রোল নেওয়া ছেড়ে দেন। কিন্তু জহরের বাছবিচার ছিল না জীবনের শেষ পর্যন্ত। ভানু যেখানে আড়াইশো টাকা নিচ্ছেন রোজ, জহর নিচ্ছেন মোটে সত্তর। তা নিয়ে ভানুর কাছে বকুনিও খাচ্ছেন।

ভানুর মতে, ‘ওর যেটা সব চাইতে বড় গুণ ছিল সেটা প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব! …আর একটা গুণ হচ্ছে ফিজিক্যাল ফিটনেস। নাকের ওপর একটা ঘুষি মারলে… জহর সমস্ত শরীরটা ঠেলে দিয়ে এমনভাবে পড়ে যেত যে সেটা কিছুতেই অভিনয় বলে মনে হত না।’ চ্যাপলিন-শিষ্য জহরের প্রধান অস্ত্র ছিল শরীরী অভিনয়। কিঞ্চিৎ অতি অভিনয়ের অভিযোগও উঠেছে এক-এক সময়ে। তবে তার কতটা দর্শক বা পরিচালকের চাহিদা, আর কতটা তাঁর নিজের মুদ্রাদোষে, বলা শক্ত।

বরং এই রাশি-রাশি হাসির বাইরে এমন কিছু চরিত্র জহর পেয়েছেন এবং করেছেন, যা তাঁকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছে। কে ভুলবে ‘বাঘিনী’ ছবির শুরুতেই সেই চোলাই ঠেকের মালিককে? যে কিনা পুলিশের তাড়া খেয়ে পালায়, মা মরা মেয়ের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে, তার পর পায়ে পেরেক বিঁধে সেপটিক হয়ে মরে। উৎপল দত্তের আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক ছবি ‘ঘুম ভাঙার গান’-এ যে কী অন্য পরতের অভিনয় তাঁর!

তরুণ মজুমদারের মতে, “ওঁর গায়ে কমেডিয়ানের তকমা জুড়ে দেওয়া অনুচিত।’’ ‘পলাতক’, ‘একটুকু বাসা’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘ঠগিনী’ ছবিতে জহরকে নিয়েছিলেন তিনি। ‘পলাতক’-এ জহরের অভিনয় নিয়ে আজও তিনি উচ্ছ্বসিত।

সুশীল মুখোপাধ্যায়ও লিখেছেন, ১৯৬১ সালে তাঁর ‘অনর্থ’ নাটকে খলনায়কের চরিত্রে কী অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন জহর! গোড়ায় তিনি স্টেজে ঢুকলেই দর্শক হাসতে শুরু করত। কিন্তু পরে তারা বুঝে যায়, এ অন্য জহর। তৃতীয় দৃশ্যে যখন ভিলেনি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়, তার সমতুল্য অভিনয় সে সময়ের মঞ্চে হয়নি, দাবি সুশীলের।

আসলে সিনেমার বাইরেও তিন-চার রকমের জহর ছিলেন। নাটকের জহর, কৌতুকের জহর, পড়ুয়া জহর আর ২১/১ রাধানাথ মল্লিক লেনের জহর। টালিগঞ্জে সকলেই জানত, কারও সঙ্গে ঝঞ্ঝাটে জহর নেই। কিন্তু সেই জহরই রুখে দাঁড়ালেন যখন রঙমহল থিয়েটার বন্ধ হতে বসেছে। শিল্পীদের নিয়ে দিনের পর দিন বসে থাকলেন রাস্তায়। পরে সকলকে নিয়ে রঙমহল কার্যত তিনিই চালিয়েছেন। তাঁরই পরিচালনায় নীহাররঞ্জন গুপ্তের লেখা ‘উল্কা’ বহু রাত অভিনীত হয়। করেছেন ‘সুবর্ণগোলক’। ‘আমি মন্ত্রী হলাম’ নাটকে তাঁর অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, এক কথায় বলেছেন ‘অবিস্মরণীয়’। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও মঞ্চে উঠেছেন।

কলেজ স্কোয়ারের কাছে ৭১/১ পটুয়াটোলা লেনে ‘অমিয় নিবাস’, তারই তিনতলায় দু’টি ঘর ছিল জহরের আস্তানা। আলমারি ঘেরা মেঝেয় বিছানা পাতা, তাতে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বই পড়তেন জহর। তাঁকে এই নেশাটা ধরিয়েছিলেন নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরি। বারোটা আলমারি ঠাসা বই। মারি সিটনের ‘আইজেনস্টাইন’, হ্যারল্ড ডাউন্সের ‘থিয়েটার অ্যান্ড স্টেজ’, জর্জ হেনরি লিউসের ‘অন অ্যাক্টরস অ্যান্ড দ্য আর্ট অফ অ্যাক্টিং’। শেক্সপিয়রের বিভিন্ন সংস্করণ, চ্যাপলিন, স্তানিস্লাভস্কির ‘মাই লাইফ ইন আর্ট’। নিউ ইংলিশ ড্রামাটিস্ট সিরিজ। এরল্ড ফ্লিনের ‘মাই উইকেড উইকেড ওয়েজ’। জন অসবর্নের ‘ইনঅ্যাডমিসিবল এভিডেন্স’। হোমার, ভার্জিল, পাস্কাল, চসার, দান্তে, প্লুটার্ক। ডারউইনের ‘দ্য ভয়েজ অব দ্য বিউগল’। সমারসেট মমের ‘গ্রেটেস্ট শর্ট স্টোরিজ’। হিচকক সম্পাদিত ‘সিক্সটিন স্কেলিটন ফ্রম মাই ক্লোজেট।’ একটি আলমারিতে শুধু মাইথলজি— রোমান, চাইনিজ, আফ্রিকান। আর প্রচুর বাংলা বই।

এক সময়ে মেগাফোন কোম্পানিই মূলত জহরের নকশা রেকর্ড করত। পরে জার্মানি থেকে আসে পলিডোর কোম্পানি। তাদের চেষ্টায় ১৯৭২-এ বেরোয় ‘ফাংশন থেকে শ্মশান’। পরের বছর তাদেরই রেকর্ডে ‘সধবার একাদশী’, সঙ্গে কেতকী দত্ত। আক্ষেপ ঝরে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘ভানুদার তবু অনেক রেকর্ড আছে, জহরদার প্রায় কিছুই নেই। স্কিটগুলো যা করতেন, অসাধারণ! যারা না দেখেছে, বোঝাতে পারব না।’’

শীতের দুপুরে বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে বছর ছিয়াশির কমলা বলেন, জহরের সব বই দান করে দিয়েছি শুধু রবীন্দ্র রচনাবলিটা শুধু নিজের কাছে রেখে দিয়েছি। ‘নিজের বাসায় ফিরে জহর কিন্তু একেবারে অন্য লোক’। তিন মেয়ে সর্বাণী, ইন্দ্রাণী, কল্যাণী আর ছেলে সব্যসাচী। ছেলে যখন ছোট, রাতে বাড়ি ফিরে ওড়িয়া গান গেয়ে তাকে ঘুম পাড়াতেন। ছেলে সব্যসাচী বলে, ‘বাবা কিন্তু এমনিতে বেশ গম্ভীর। নিজে খেতে খুব ভালবাসতেন। আমাদেরও রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন।

শরীর কিন্তু দ্রুত ভাঙছিল। ১৯৭৪-এ শুটিং হল ‘যুক্তি তক্কো’র। কাছাকাছি সময়েই উত্তম অভিনীত ‘ব্রজবুলি’। এক সময়কার গোলগাল লোকটা তখন প্রায় কঙ্কাল। ‘দেহপট সনে নট সকলই হারায়।’ সিনেমায় কেউ আর কাজ দিতে চায় না, এড়িয়ে যায়। রঙমহলই সম্বল।

১৯৭৭ সালের পয়লা অগস্ট সকালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটা ফোন পান জহরের পাড়া থেকে, ‘মেডিক্যাল কলেজে জহরদা মারা গেছেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটু খবর দিতে পারেন?’ একটু ইতস্তত করে সৌমিত্র ফোন করেন ভানুকে। দু’জনেই চলে আসেন মেডিক্যালে। সৌমিত্রের কথায়, ‘তখন আমরা শুধু দু’জন। আর কেউ নেই। পাড়ার লোকজন গেছে জিনিসপত্র কিনতে। আমরা উপরে গিয়ে দেখলাম, জহরদাকে সবুজ রঙের একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।’

ভানু পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। কোনও রকমে বললেন, ‘জহরের কি দেশের কাছে এইটুকুই পাওনা ছিল সৌমিত্র? অন্য দেশ হলে স্যার উপাধি পেত।’  একটা কাঁটা এখনও বিঁধে আছে স্ত্রী কমলার মনে। যাঁদের খুব ঘনিষ্ঠ বলে জানতেন, যাঁদের সঙ্গে দিনরাত ওঠা-বসা ছিল জহরের, ক’দিন পর থেকে তাঁরা কেউই আর খবর নেননি এক দিনও।

হলদে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো কয়েকটা সাদা-কালো ছবি। একটা যুবা বয়সের পোর্ট্রেট, আর একটা অমিয় নিবাসের ঘরে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে রাজার মেজাজে জহর। তার ঠিক নীচটিতে বসে কমলা হাসেন, ‘হয়তো লোকে ভয় পেত, যদি টাকা-ফাকা চেয়ে বসি! তখনও তো ছেলেটা দাঁড়ায়নি। মেয়েগুলোর বিয়ে হয়নি। উনি কিন্তু সব বন্দোবস্ত করে রেখে গিয়েছিলেন। কারও কাছে হাত পাততে হয়নি।’’

আলো সরে গিয়েছে অনেক বছর হল। চিলতে গলিতে সবুজ দরজার মাথায় খালি রয়ে গিয়েছে আবছা নেমপ্লেট— জহর রায়

কৃতজ্ঞতা– আনন্দবাজার আর্কাইভ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *