“নীতা চলে গেলেন”–লিখেছেন, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

PPI_TH..Templat+20BG_PAGE2GHATAK.jp৩৪ বছর অনুওম থাকার পর স্তব্ধ হয়ে গেল বেণু। বাংলা ছায়াছবির অন্যতম তারকা ঢেকে গেল মেঘে।
চলে গেলন সুপ্রিয়া দেবী। বর্মায় জন্ম এবং শৈশব জীবন যাপন। আইনজীবি পিতার অত্যন্ত শৃঙ্খলার মধ্যে ভাই বোনদের বড় হয়ে ওঠা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সপরিবারে তারা কলকাতায় চলে আসেন। স্বাধীনচেতা কৃষ্ণা বাবার শাসনে হাঁপিয়ে উঠেছিল।
কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার অসহায়তা তাকে অস্থির করে তোলে। লড়াকু কৃষ্ণা খুঁজতে থাকে উপায়। লড়াই তার আজন্মের সাথী। জন্মেই তাই অষ্টম কন্যা ও একাদশ সন্তানকে তার জননী পদাঘাত করে দুরে সরিয়ে দিয়েছিল। জননীর বুকের বদলে তার ঠাঁই হতে চলেছিল মৃত্যু কোলে শয্যার পাশে রাখা আগুনের মালসায়। অল্পের জন্যের  বেঁচে যায়। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। বড়ো পাঁচ বোনের বিয়ের পর সর্বশান্ত পিতা, তার রোজগারের টাকায় তার উপরের দুই দিদিরও বিয়ে দেন। শুধু পণের টাকায় আটকে যায় কৃষ্ণার বিয়ে। কন্যাদায় গ্রস্থ পিতামাতার দুশ্চিন্তা দুর করতে আত্মসম্মানী বেণু তাই সহসাই একদিন পুর্বপরিচিত বিশ্বনাথ চৌধুরীকে রেজিস্ট্রী করে বাড়ি ফেরেন। রাশভারী পিতার সম্মুখে গ্রীবা উঁচু করে বলেন আমি বিবাহিত।

“দাদা আমি বাঁচতে চাই।” এই সংলাপ উঠে এসেছিল তার অন্তর স্থল থেকে তাই বুঝি বেণুর মুখের নীতার সংলাপটি আজও কালজয়ী হয়ে থেকে গেল। স্বামীর সংসার নিয়ে বাঁচা হল না। শারীরিক মানসিক অশান্তি অবশেষে ডিভোর্স।আবার লড়াই, একলা  পথ চলা।এর মাঝে উওম মানুষের প্রেমে এবং সব ভাসিয়ে উওমাকাশে মেঘের কোলে তারকারুপে অবস্থান।

মেঘে ঢাকা তারার নীতাতে যারা আপ্লুত তারা বনপলাশের পদাবলীর পদ্ম সুভাস কি ভুলতে পারবেন! এক গ্রাম্য মহিলার প্রেমের  আত্মত্যাগ চলনে বলনের লাস্য অন্তিমে পিতার হত্যার প্রচেষ্টাকেও ক্ষমা করা, কারণ প্রেম। এক্ষেতেও তার জীবনের চিত্রটি অনেকাংশে ফুটে ওঠে তাই পদ্মও হয়ে ওঠা বাস্তব।
উওম কুমারকে ভালোবাসেনা এমন রমণীর বাংলায় আজও মেলা ভার।তা সে যে সময়েরই হোক না বা বয়সের, কেনো বিংশ- একবিংশ সব কালেই প্রিতিটি নারীর হার্টথ্রব উওম কুমার। আবার উওম কুমারের প্রেমিকা মানেই যেন ঈর্ষার পাত্রী সেই রমণীটি। এখানেই সুপ্রিয়াদেবীর প্রেম জিতে যায় জিতিয়ে দেয় তাকে সমালোচকরাই।

চিরকাল তিনি উওম কুমারের ছায়ায় আবৃত থেকে গেলেন অথচ আপ কি পরছাইয়াতে ধর্মেন্দ্রর বিপরীতে তার অভিনয় দেশ জুড়ে প্রশংসিত হয়। ঠিক এই সময় উওম কুমারের সাথে তার মনোমালিন্য শুরু হয়।সন্দেহ বশত ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে অশান্তিও হয়। কিন্তু উওম কি পারে তার বেণুকে ছেড়ে থাকতে। তাই মুধরমিলন ও তোপ চাঁচি গমন।
প্রায় ৩৮ বছর ধরে শুধুই উওম স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন। রন্ধন পটিয়সী বেণুদির রান্নার খ্যাতি ছিল ইন্ডাস্ট্রি  জুড়ে। সকলকে স্নেহময়ী বেণুদি যত্ন করে খাওয়াতেন। আপন করে নিতেন তার পরবর্তী দুই প্রজন্মকে আপন মমতায়। তাইতো তিনি সকলের আদরের বেণুদি থেকে গেলেন।

প্রেম প্রতিদ্বন্দী নারী রুপে আমরা লাল পাথরে অন্য সুপ্রিয়াদেবীকে দেখতে পাই তবে বাস্তবে তার প্রতি মিথ্যা সমালোচনাকে হেলায় তুচ্ছ করতেন। ভুলতেই পারবোনা বাঘবন্দীর খেলায় দাপুটে প্রতিভাবান উওম অভিনয়ের পাশে সংযত ব্যক্তিত্ববান সুপ্রিয়ার অভিনয়। লড়াই তার আভুষণ তাই সন্ন্যাসীরাজা বা মন নিয়েতে যতই অবসাদ গ্রস্থ চরিত্রকে তিন বাস্তবায়িত করুন না কেন আজন্ম মাথা উঁচু করে মেরুদন্ড সোজা রেখে চলেছেন। প্রিয় উওম কুমারের মৃত্যুর সময়  বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি কতটা সংযমী। প্রাণের মানুষটিকে হৃদয় ছিন্ন করে চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন, টালিগঞ্জের সকলের ভীড়ে  কাছে গিয়ে মরদেহর বুকের উপর আছড়ে পরতে পারেনি অলক্ষ্যের নির্মিত নিয়মে। তবু উওম তার প্রাণ থেকে গেছেন।

ভালোবাসার মানুষকে আপন করে নেওয়ার পথে সমাজ, সংসারের কোনো বাধাই মানেননি মহানায়ক। লোকনিন্দা, অপবাদ সবকিছু মাথা পেতে নিয়েও জীবনের সতেরটি বছর একসঙ্গেই বসবাস করে গেছেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। আইনত বিয়ে করতে পারেননি কিন্তু বিবাহিত দম্পতির মতোই পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন তারা।

তিনি রোম্যান্টিক নায়িকার দিন পেরোনোর সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তী সম্পর্কে।তাই তো নব্বইএর দশকের সিরিয়াল জননী দুপুর ঘনাতেই সকলকে টিভির সামনে ৩০ মিনিট বাকরুদ্ধ করে বসিয়ে রাখত। শান্তিনিকেতন সিরিয়ালে সমসাময়িক আরও দুই অভিনেত্রী সাবিত্রী দেবী ও মাধবী দেবীর সাথে শেষ জীবনের প্রকৃত ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম চিনিয়ে দিয়েছিলেন।

বয়স জনিত অস্থি সন্ধীর বেদনা ত্বকের বলিরেখা কোন কিছুই তার লাবণ্যকে ম্লান করতে পারেনি।
তাই শেষ বয়েসে তাঁর অভিনীত নেমসেক বুঝিয়ে দেয় জাত অভিনেতা ও সৈনিকের তরোয়াল এর  বয়স হয় না আসলে সময়ের সাথে তারা আরও ধারালো হয়ে ওঠে।
বঙ্গভুষণ ও পদ্মশ্রী সম্মানে ভুষিত বেণুদি চলে যাননি, রয়ে গেছেন আমাদের হৃদয়ে। এই বুঝি ভীড়ের মধ্য থেকে কেউ স্পিকার হাতে জীঞ্জাসা করবেন বেণুদি আপনার খ্যাতির সিক্রেটা কি বেণুদি একগাল হেসে বলবেন ভালোবাসা।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *