উৎপল দত্ত, যিনি নিজেকে প্রপোগান্ডিস্ট বলতে পছন্দ করতেন। সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল।

Screen-Shot-2016-08-22-at-12.01.01-AM-750x400একটি টিনের তরোয়ালে যিনি প্রতিবাদের ধরণ বদল দিয়েছিলেন।  বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তার নাট্য প্রদর্শনী। বের করে দেওয়া হয়েছিল গিরীশ মঞ্চ থেকে। বাগবাজাররের রাজপথে দাঁড়িয়ে শেষ করেছিলেন তার টিনের তরোয়াল নাটকের প্রদর্শনী।

অভিনেতা, নাট্যকার ও শিল্পী উৎপল দত্ত। যিনি নিজেকে একজন প্রপোগান্ডিস্ট বলতেই পছন্দ করতেন। নাট্যকার  উৎপল রঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ অবিভক্ত বাংলার বরিশালের কীর্তনখোলায়। পড়াশোনা করেছেন শিলং এডমন্ডস স্কুলে, পরে কলকাতার সেন্ট লরেন্স এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৪৮ সালে ইংরেজি অনার্স নিয়ে স্নাতক করেন তিনি। ছোটথেকে নাট্যপ্রেমি বাবা- মায়ের সঙ্গে থিয়েটার দেখতে দেখতে থিয়েটার প্রেম।১৩ বছর বয়সের স্মৃতি কথায় বলতেন-সেই সব মহৎ কারবার দেখে মনে হতো যে আমার পক্ষে অভিনেতা ছাড়া আর কিছুই হওয়ার নেই।

নিকোলাই গোগলের ‘ডায়মন্ড কাট্স্ ডায়মন্ড’ এবং মলিয়েরের ‘দ্য রোগারিজ অব স্ক্যাপাঁ’ দিয়েই তাঁর কলেজজীবনের অভিনয় শুরু।গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল- ‘দ্য অ্যামেচার শেকসপিয়ারিয়ান্স’। তাঁদের প্রথম উপস্থাপনা ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ এবং ম্যাকবেথ নাটকের নির্বাচিত অংশ। উৎপল দত্ত কেবল একজন অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখকই ছিলেন না, রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে তিনি ছিলেন বামপন্থী ও মার্কসবাদী। আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকার হিসেবে তাঁর স্থান সুনির্দিষ্ট। ১৯৫৯ সালে লিটল থিয়েটার  কর্তৃক মিনার্ভা থিয়েটার অধিগ্রহণ ও নিয়মিত নাট্যাভিনয়ের কর্মসূচি গ্রহণ এবং তাঁরই লেখা ও পরিচালনায় ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘কল্লোল’ প্রভৃতি নাটকে রাজনৈতিক বোধ, আঙ্গিক প্রয়োগ- নাটক ও নাট্যাভিনয়ের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে।অমন সেন্স অফ টাইমিং নিয়ে জিনিয়াসরাই জন্মায়।কৌতুক চলচ্চিত্র গুড্ডি, গোলমাল ও শৌখিন-এ অভিনয় করেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় হীরক রাজার দেশে, জয় বাবা ফেলুনাথ এবং আগন্তুক সিনেমায় তাঁর অনন্য অভিনয়-প্রতিভা দেখেছেন বাংলার দর্শক। তাঁর বিখ্যাত নাটকের মধ্যে রয়েছে টিনের তলোয়ার, মানুষের অধিকার, মেঘ, রাইফেল, সীমান্ত, ঘুম নেই, মে দিবস, দ্বীপ, রাতের অতিথি, মধুচক্র, কল্লোল, সমাজতান্ত্রিক চাল, সমাধান ইত্যাদি।

উৎপলের রাজনৈতিক নাটকগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় শ্রেণিচেতনা, ইতিহাস চেতনা ও মধ্যবিত্ত চেতনা। ‘টিনের তলোয়ার’, ‘রাতের অতিথি’, ‘ছায়ানট’, ‘সূর্যশিকার’, ‘মানুষের অধিকার’ প্রভৃতি নাটকে যেমন পাওয়া যায় শ্রেণিসচেতনতা, তেমনি ‘টোটা, ‘লাল দুর্গ’, ‘তিতুমীর’, ‘কল্লোল’, ‘দিল্লি চলো’, ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ প্রভৃতি নাটকের ইতিহাস চেতনা, ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারি ফৌজ’ প্রভৃতি নাটকের মধ্যবিত্ত চেতনা তাঁর নাটককে দেয় ভিন্নমাত্রা। নাটক, যাত্রাসহ বহু বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক খ্যাতির অধিকারী হন উৎপল দত্ত।

নাট্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন দীনবন্ধু পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। তবে পদ্মভূষণ উপাধি ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তবে পুরস্কারের মূল্যায়ন শিল্পীর জন্মগত সত্ত্বাকে বিচার করতে যাওয়া করতলে পারদ ধরার অনুরূপ। আমরা চিনতে পারিনা অন্যায় অবিচারের অভিনেতাকে আগন্তুক সিনেমায় অভিনয় করতে দেখে। মেলাতে পারিনা অনুসন্ধানের অভিনেতার সাথে ম্যাকবেথের উৎপল দত্ত কে। জাত অভিনেতার এখানেই মুন্সিয়ানা সব চরিত্রে তিনি বাস্তব।

যুগে  যুগে  স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বাঁধ ভাঙলে আসে তার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের প্লাবন। সত্তরের দশকের তুমুল রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝখানে উৎপল দত্তকে যখন কার্যত লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হচ্ছে ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ বা বাসে বোমা মারার প্রতিবাদে করেছিলেন ‘পেট্রল বোমা’। উৎপল দত্ত আজ থাকলে কী করতেন?

উৎপল দত্ত সম্পর্কে কতগুলি পরস্পরবিরোধী গল্প শোনা যায়। তিনি সক্রিয় ভাবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে চটজলদি নাটক লিখে ফেলতে পারতেন বা প্রযোজনাও করে ফেলতেন, আবার  মিছিলে হাঁটার জন্য তিনি কুঁজোর মধ্যে পাঞ্জাবি-পাজামা ভরে রাখতেন!

তিনি  অরাজক সমাজের অস্থির জলে ভেসে থাকা কমল প্রতিবাদ যার সুবাস কলম যার আভা। যখন পুলিশ নাট্যদলের অভিনেতা বা পরিচালককে খুঁজছে, তখন তিনি সহ-অভিনেতাদের এসে বলতেন, ‘কমরেডস, পুলিশ আসছে, পালান!’ এগুলো মিথ  কিন্তু,নিশ্চিত  কমরেড উৎপল দত্ত রাতারাতি ‘নিশিরাতে পুলিশের লাঠি’ নামে কোনও নাটকও করে ফেলতে পারতেন। ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট কলকাতায় প্রয়াত হন এ মহান শিল্পী।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *