‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাবো,আসবো না ফিরে কোনোদিন’– আজ কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন।

hemantaফিচার ডেস্কঃ  হাতা গোটানো সাদা বাংলা শার্ট। সাদা ধুতি। কালো ফ্রেমের চশমা। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান। ফিল্মের প্লে ব্যাক থেকে ফাংশনের ম্যারাপ।সর্বত্র যাতায়াতে অভ্যস্থ দরাজ গলা।১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথিতযশা এই শিল্পীর জীবনাবসানের মাষ ছয়ের আগে একটি অনুষ্ঠানে এসে গেয়েছিলেন ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে, আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে’।সত্যি তাই,শিল্পীর গান এবং সঙ্গীত পরিচালনা চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে রয়ে গেছে শ্রোতাদের হৃদয়ে।

বারাণসীতে ১৯২০ সালের ১৬ জুন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন।বাড়ির ইচ্ছেতে যাদবপুর বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য কিন্তু বিধি যার সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার তিনি কি করে ইঞ্জিনিয়ার হবেন?ভাগ্যিস হননি নাহলে কি হারাতাম ভাবলেও বুক ধড়ফড় করে। ১৯৩৩ সালে শৈলেশ দত্তগুপ্তের সহযোগিতায় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র জন্য প্রথম গান ‘আমার গানেতে এল নবরূপী চিরন্তন’ রেকর্ড করেন।কিন্তু গানটি সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি।কিন্তু উনি হাল ছাড়েননি ঐ বছরই তিনি নরেশ ভট্টাচার্যের কথা এবং শৈলেশ দত্তগুপ্তের সুরে গ্রামোফোন কোম্পানী কলম্বিয়ার জন্য ‘জানিতে যদিগো তুমি’ এবং ‘বলো গো তুমি মোরে’ গান দুটি রেকর্ড করেন।এরপর থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই তিনি ‘গ্রামোফোন কোম্পানী অফ ইন্ডিয়া’র জন্য গান রেকর্ড করেছেন।হেমন্ত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন ওস্তাদ ফয়েজ খানের কাছে।১৯৪০ সালে কমল দাসগুপ্তের সুরে প্রথম হিন্দি গানের রেকর্ড বের করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

১৯৪১ সালে এই শিল্পী তাঁর প্লে-ব্যাক সংগীত জীবন শুরু করেন ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবির মাধ্যমে। এরপর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।একটার পর একটা কালজয়ী বাংলা গান উপহার দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে ‘ইরাদা’ ছবিতে প্লে-ব্যাক করে হিন্দি গানের শ্রোতাদের কাছে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন।একই বছরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রথম নিজের কম্পোজিশনে দুটো গান করেন।গান দুটির গীতিকার ছিলেন অমিয় বাগচী।তবে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে হেমন্ত আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৪৭ সালে ‘অভিযাত্রী’ সিনেমায়।প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন ১৯৪৪ সালে ‘প্রিয় বান্ধবী’ সিনেমাতে।কলম্বিয়ার লেবেলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অসংখ্য রেকর্ড বের করেছিলেন।

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই হেমন্ত একজন সম্ভাবনাময় শিল্পী এবং কম্পোজার হিসেবে সবার নজর কাড়েন। সেসময় তিনিই ছিলেন একমাত্র পুরুষ কণ্ঠশিল্পী যিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কাজ করেছিলেন।১৯৫৪ সালে হিন্দি সিনেমা ‘নাগিন’ এর সঙ্গীত পরিচালনা করে বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।এই ছবির গান সেসময় দুই বছর ধরে টপচার্টের শীর্ষে অবস্থান করেছিল এবং এই সিনেমার জন্যই হেমন্ত ১৯৫৫ সালে ‘ফিল্মফেয়ার বেস্ট মিউজিক ডিরেক্টর’ এর পুরস্কার লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলা সিনেমা ‘শাপমোচন’ এর সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এই ছবিতে তিনি উত্তম কুমারের জন্য চারটি গান করেছিলেন। তারপর থেকেই উত্তম কুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।৪০ থেকে ৫০ দশকে প্রখ্যাত সুরকার সলীল চৌধুরীর কম্পোজিশনে কিছু কালজয়ী গান গেয়েছিলেন।

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে হেমন্ত বহু বাংলা এবং হিন্দি ছবির গান গেয়েছেন। এছাড়াও তিনি প্রচুর রবীন্দ্র সঙ্গীতের রেকর্ড বের করেন। শিল্প সমালোচক ও শ্রোতাদের অনেকেরই মতে, তাঁর বাংলা সিনেমার গানগুলো সে সময়ে যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তা এখনো পর্যন্ত বহাল রয়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায় মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবির মধ্যে রয়েছে ‘হারানো সুর, দ্বীপ জ্বেলে যাই, নীল আকাশের নীচে, স্বরলিপি, শেষ পর্যন্ত, কুহক, দুই ভাই এবং সপ্তপদী’। এছাড়াও হিন্দি ছবির মধ্যে রয়েছে ‘নাগিন, জাগ্রিতি এবং এক হি রাস্তা’।সত্তরের দশকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ‘রাগ অনুরাগ, ফুলেশ্বরী এবং দাদার কীর্তি’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।সবকটি সিনেমার গান ও সঙ্গীত পরিচালনা দারুনভাবে হিট করে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছিলেন,সিনেমাটির নাম ‘অনিন্দিতা’ এই ছবিটির প্রযোজকও তিনি ছিলেন।যদিও ‘অনিন্দিতা’ ছবিটি বক্স অফিসে সেরকম সাড়া জাগাতে পারেনি।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সবসময় বিভিন্ন সমাজকল্যান মূলক কাজে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মা গো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে’ গানটি সেসময় দারুণভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো মুক্তি যোদ্ধাদের।১৯৮০ সালে গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের পর তাঁর কণ্ঠ এবং শ্বাসযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই হার্ট অ্যাটাকের পর থেকেই তিনি আর অ্যালবামের কোনো কাজ করতেন না।তবে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ এবং দূরদর্শনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাবো, আমিও নদীর মতো আসবো না ফিরে আর আসবো না ফিরে কোনোদিন’।ইহলোকে তিনি আর ফিরে আসবেন না কোনো দিন কিন্তু তাঁর সৃষ্টিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরদিন।ভক্তদের মাঝে তিনি ফিরে ফিরে আসবেন বারবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *