অ্যাপোলোনিয়ান সত্যজিৎ রায়, রুহিনা ফেরদৌস

d3ec2360895457037e2b6fe720efb7b7--satyajit-ray-indiaযে কোনো জাতির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন করে প্রাণপুরুষ থাকে। বাঙালির কাছে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে প্রাণপুরুষটি হচ্ছেন সত্যজিৎ রায়। তার মানে এই নয় যে ওনার চেয়ে ভালো চলচ্চিত্র অন্য কোনো বাঙালি পরিচালক বানাননি, তা নয়। তবে যা তর্কাতীত তা হলো, সত্যজিৎ রায়ের কাজের ধারাবাহিকতা। একাধারে চলচ্চিত্রকার, সাহিত্যিক এবং আঁকিয়ে। মিউজিক করতেন, বিজ্ঞাপনের কাজ করেছেন। প্রতিটি কাজে সবদিক থেকে নিজেকে ‘ব্র্যান্ড’ তৈরি করেছিলেন। আমাদের উপমহাদেশের সিনেমাজগতে তার মতো ‘ব্র্যান্ড’ আর আছে বলে মনে হয় না।

বাঙালির সন্তান বড় হয় সত্যজিতের সোনার কেল্লা, গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখে। অন্যদিকে সে পড়ে শঙ্কু এবং ফেলুদা। সত্যজিৎ রায়ের বাঙালি জীবনে এমনই সর্বব্যাপী উপস্থিতি যে চতুর্দিক থেকে বাঙালির অস্তিত্বকে ঘিরে রেখেছে।

কাজের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নিজস্ব একটা ভঙ্গিমা, সিগনেচার থাকে। প্রতিটি মানুষের সৃজনে সে স্বাতন্ত্র্য থাকবেই। তবে সিনেমা নামের বিশেষ আর্ট ফর্মটির বয়স তো আর বেশি কিছু নয়, ১০০ বছরের কিছু বেশি। অন্যান্য আর্ট ফর্মের তুলনায় সিনেমা অনেকটাই নতুন। এ আর্ট ফর্মটাকে সারা পৃথিবীতে সমৃদ্ধ করেছেন যারা এবং পরবর্তী প্রজন্মর কাছে যারা শেখার পাথেয় রেখেছেন, এমন প্রধান পাঁচজন বা ১০ জনের মধ্যে সত্যজিৎ রায় একটি নাম। তার কাছ থেকে আমরা প্রতিনিয়ত শিখি, তার ডায়ালগ লেখা, তার সঙ্গীতের ব্যবহার  থেকে শিখি।

তার অসাধারণ ফটোগ্রাফিক মেমোরির কথা অনেকের কাছ থেকে শুনতে পাওয়া যায়।ছবির মতো সবকিছু মনে রাখতে পারতেন।১৯৫৩ সালের দিকে তিনি অজন্তা ইলোরা দর্শনে গিয়েছিলেন।এ জায়গার প্রেক্ষাপটে ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’ লেখেন প্রায় ২০ কিংবা ২২ বছর পরে!

একবার একটি জার্মান ছেলে সত্যজিৎ রায়ের ওপর কাজ করতে এসেছিল।কিছুদিন থাকার পর জার্মান ছেলেটি নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছে।অল্প কিছুদিনের মধ্যে আবার ফিরে আসবে।ওই ছেলেটি সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ফেরার সময় আপনার জন্য কিছু আনব?  তখন উনি ছেলেটিকে বলেছিলেন, ‘যদি বিটোফেনের ওই পিসটা পাও, তাহলে আনতে পারো।’ ছেলেটি সেই পিস বা সিম্ফনির নাম জানতে চাইলে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘নামটা তো ঠিক মনে নেই, প্রায় ৪০ বছর আগে রেডিওতে একবার শুনেছিলাম।’ ছেলেটি আবার বলল, ‘তাহলে কী করে বুঝব।’ সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘এক মিনিট।’ এর পর একটি কাগজে পুরো স্টাফ নোটেশনটা লিখে দিয়েছিলেন।

সত্যজিৎ না ঋত্বিক—দুজনার মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এই বিতর্কের অবসান বোধহয় বাঙালি জীবনে কোনদিনও অবসান হবে না।অ্যাপোলোনিয়ান ও ডিয়োনিসিয়ান— দুজনকে নিয়ে গ্রিক সাহিত্য-শিল্পের ক্ষেত্রে সমান বিভাজন ও বিতর্ক চলে।অ্যাপোলোনিয়ান শিল্পসৃষ্টি হচ্ছে খুব মেধা থেকে, ঠাণ্ডা মাথায় নিয়ম মেনে। আর ডিয়োনিসিয়ান শিল্প হচ্ছে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত, লাগামছাড়া, জান্তব।সত্যজিৎ বাবুর সৃষ্টিরা অনেক বেশি অ্যাপোলোনিয়ান, আর ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টিরা অসম্ভব ডিয়োনিসিয়ান।আমাদের দুটোরই সমান প্রয়োজন রয়েছে।দুটোরই মেলবন্ধন প্রয়োজন, অন্তত তাদের কাছে যারা পরবর্তীকালের চলচ্চিত্রে নিয়ে কাজ করবে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *