দোলের ইতিবৃত্ত( দেবাশিষ পাইন)

holi1যেমন খেলব হোলি রং দেবো না তাই কখনো হয়…তেমনি উৎসবের ইতিহাস থাকবে না, তাই কখনো হয়!! ভক্ত প্রলহাদ অসুর বংশে জন্মগ্রহণ করলেও পরম ধার্মিক ছিলেন। কিছুতেই প্রলহাদকে হত্যা করা যাচ্ছিল না। হিরণ্যকশিপুর বোন ‘হোলিকার’ বর প্রাপ্তি হয়েছিল যে হোলিকা আগুনে প্রবেশ করলেও তার কোনও ক্ষতি হবে না যদি না কোন অন্যায় কাজের জন্য আগুনে প্রবেশ করে। এবার হোলিকা ঠিক করলেন প্রলহাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করবেন এবং করলেনও। ফল হোল প্রলহাদ অক্ষত রইলেন কিন্তু হোলিকা পুড়ে ছাই হোল। প্রলহাদ অক্ষত ছিল কারন সয়ং বিষ্ণু ওই মুহূর্তে আগুনে প্রবেশ করেছিলেন। এর থেকেই হোলি কথার শুরু।

holi2

অনেকে বলেন বসন্তপূর্ণিমার দিনে শ্রী কৃষ্ণ ‘কোশী’ নামের এক দৈত্যকে বধ করেন। অন্যায় অত্যাচারকারী ওই অসুর বধের পর সকলে আনন্দ করে আর শ্রী কৃষ্ণ আনন্দ-বিশ্রামে দোলনায় দুলতে থাকেন এটাই নাকি দোলের ইতিহাস। অনেকে বলে থাকেন ফাল্গুনে সমগ্র সৃষ্টিকে কৃপা করার জন্য দোল- ঝুলন উৎসবের সূচনা হয়।

রাধা কৃষ্ণের কাহিনি তো আছেই। একদিন রাধা কৃষ্ণ বৃন্দাবনে সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে খেলা করার সময় হটাত রাধা বিব্রত অবস্তায় পড়ে যান। রাধার লজ্জা ঢাকতে কৃষ্ণ সকলের নজর ঘোরানোর জন্য দুম করে আবীর খেলতে শুরু করে দেন। এই আবীর খেলাকে কেন্দ্র করে হিন্দুরা হোলি উৎসব পালন করে বলে প্রচলিত।

আবার এমন কথাও শোনা যায় কৃষ্ণ নিজের কালো রং ঢাকতে প্রায় সময় নানান রং মেখে রাধার সামনে হাজির হতেন এটাও নাকি হোলির উৎস।

holi3

তবে যে যাই বলুক হোলি বা দোল সর্বজনীন। রাধা ও কৃষ্ণকে নিয়ে যেমন দোলের ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস তেমনি ১৪৮৬ সালে পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেন সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় রাখতে গৌর বাংলায় দোলের সূচনা হয়। আমাদের বহু ধর্মীয় উৎসবে সেই স্থানের লোক ও আচার এর প্রভাব দেখতে পাই। দোল উৎসব এর বাইরে নয়। যেমন দুর্গা পুজা হিন্দুদের উৎসব হলেও আজ সার্বজনীন, জাতীয় উৎসব। সেই কারনে দোলকে সার্বজনীন বলতে বাধা নেই।

holi5

যুগে যুগে এই উৎসবের মাত্রা বদলেছে। যেমন পুরাকালে মহিলারা পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রং খেলতেন। দোল মানব সভ্যতার অতি প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরান,ভবিস্য পুরানে এর উল্লেখ আছে। ৩০০ খ্রিস্ট পূর্বের শিলালিপিতে আছে যে হর্ষবর্ধনের সময় হোলি উৎসব হত। আলবেরুনির লেখাতে পাওয়া যায় মধ্যযুগে কোনও কোনও অঞ্চলে মুসলিমরাও হোলি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। অযোধ্যার নবাব আসফ-উদ-দৌল্লা বা নবাব সুজা-উদ- দৌল্লার আমলে হোলির উৎসব হত। সম্রাট আকবর তো ১৩দিন ধরে হোলি খেলতেন।

হোলির ইতিহাস বলে শেষ করার মতো বিষয় নয়। ভারতের বিভিন্ন ও ভারতের বাইরে হরেক নামে হোলি পালিত হয়, যেমন- উত্তরাঞ্চলে হোলি, দক্ষিণে ‘কমপণ্ডগাই’, কন্নড এ ‘কমন্নন হব’, পাঞ্জাবে ‘হল্লামহল্লা’, শ্রীলঙ্কায় ‘তালুক’, পোল্যান্ডে ‘আরিনা’, তাইল্যান্ডে ‘সঙ্গকাল’, ইন্দোনেশিয়ায় ‘পিউরো’ বাংলাদেশে লালন ফকিরের আড্ডায় ধুম ধাম করে হোলি পালিত হয়।

holi4

 আমি অনেক বড় বয়স অব্দি দোল খেলেছি। দোলের আগের দিন পেতলের পিচকারীর মাধ্যমে বেলুনের ভেতর রং ভোরে সারা রাত জলের বালতিতে চুবিয়ে রাখা। সারা রাত দুচোখের পাতা এক হত না কখন সকাল হবে। চলত বেলা অব্দি দোল খেলা। বয়সসন্ধির কালে রং মাখাতে গিয়ে একটু যে প্রাপ্তবয়স্ক কাজ করি নি এটা অস্বীকার করছি না। ভালো লাগার কাউকে রং মাখাতে গিয়ে একটু স্পর্শের ছোঁয়া এটুকু খুব অপরাধ নয়। বন্ধুদের স্পর্শের আনন্দ গল্প করার সময় শরীরে লেগে থাকা রঙের রেশ রোমাঞ্চিত করত আজও স্মৃতির সরণীতে অম্লান।

সকলে ভালো থাকবেন… হোলি/ দোল উৎসবে আনন্দ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *