জলদস্যুতার সেকাল একাল.. (দ্বিতীয় পর্ব) (লেখক- অনির্বাণ ভট্টাচার্য)

1

 

 

 

 

জলদস্যুতার ইতিহাস অবশ্য বেশ প্রাচীন ক্যাপ্টেন চার্লস জনসনের লেখা বিখ্যাত বই “এ জেনারেল হিস্ট্রি অফ দি রবারিস এন্ড মার্ডারস অফ দি মোস্ট নোটোরিয়াস পাইরেটস”বই থেকেজানা যায় ১৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরীয় ফারাওদের নথিতে প্রথম জলদস্যুদের উল্লেখ পাওয়া যায়।ভাইকিংরাও নৌচালনায় পারদর্শী হওয়ায় সে যুগে সমুদ্রপথে লুঠ পাট চালাতো।শোনাযায় জুলিয়াস সিজার ও নাকি একবার জলদস্যুদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন।ক্রমে ক্রমে ইংরেজদের পাশাপাশি ফরাসীরাও জলদস্যুতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।জলপথে পণ্য পরিবহন করার সময়তারা রীতিমত অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত হয়ে তবে বেরোতো।

রাণী প্রথম এলিজাবেথের শাসন কালে জলদস্যুতা একটা লোভনীয় পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।শাসকের প্রত্যক্ষ মদতে এরা ছোট ছোট রনতরী নিয়ে লুঠ পাটে বেরোত।এদের বলা হত”প্রাইভেটিয়ার্স”।এরা প্রধানত ফরাসীদের জাহাজ লুঠ করত।দেখাদেখি ফরাসীরাও এই ধরনের রাষ্টীয় মদতপুষ্ট সাগরদস্যুদল তৈরি করে।নাম দেয়,”করসেয়ার্স”।

2
প্রাইভেটিয়ার্স আর করসেয়ার্সরা সমুদ্রে ত্রাসের সঞ্চার করলেও দেশের বিপদে বা শত্রু দেশের আক্রমনের সময় স্বদেশের রাজকীয় নৌবাহিনীর পক্ষ নিত।স্পেনের সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপ ব্রিটিশ নৌসেনাপতি স্যার রিচার্ড গ্রেনভিল কে প্রকাশ্যেই জলদস্যু বলে ঘোষনা করেন।

১৬৫০ থেকে ১৭২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জলদস্যুদের সুবর্ণযুগ চলেছিল।এসময়ে তারা বেশিরভাগই ক্যারিবিয়ান দ্বীপের আশেপাশে ঘোরাফেরা করত।লুঠ পাট করার পাশাপাশি লুঠের মাল লুকিয়ে রাখা,লুঠ করার পরে দ্রুত আত্মগোপন করার মত ভাল জায়গা আর কোথাও ছিলো না।প্রথম দিকে তাদের ঘাঁটি ছিল সেন্ট কিটস আইল্যান্ড।১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে বিতাড়িত হলে তারা আইল এ লা টোর্টু দ্বীপে(হাইতির উত্তর উপকূলের অদূরে অবস্থিত)।প্রচুর টার্টেল বা কচ্ছপ ছিল এই দ্বীপে।তা থেকেই এমন নাম।তাছাড়া,বন জঙ্গলের অভাব ছিল না।ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় গভীর বনে বুনো জন্তু ও ফল পাকুড়ের অভাব ছিল না।তারা বনের পশু শিকার করে বনে প্রাপ্ত কাঠের আগুনে ঝলসে খেত।এই ধরনের আগুন জ্বালিয়ে রান্না করাকে স্প্যানিশ ইন্ডিয়ান ভাষায় “বুক্যার্ন”বলা হত।তা থেকেই এদের নাম হয় “বুক্কানির”বা “বাক্যানিয়ার”(Buccaneer)।কারুর কারুর মতে “ঝলসানো বিফ” কে বলা হয় “Boucan”।যা ছিল জলদস্যুদের প্রিয় খাদ্য। তা থেকেই নামকরণ।১৬৮২ থেকে পোর্ট রয়াল জলদস্যুদের একটা নিশ্চিন্ত আস্তানা হয়ে উঠেছিল।কেননা এই দ্বীপটার ওপর কোনো নির্দিষ্ট দেশের কর্তৃত্ব ছিলনা।ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের এই অংশে অসংখ্য খাঁড়ি,জলা,ঝোপ জঙ্গলপরিবৃত দূর্গম অঞ্চল থাকায় লুঠতরাজের পরে দ্রুত আত্মগোপন করার সুযোগ ছিল,তেমনি সহজে ধরা পড়ার ভয়ও থাকত না।শোনা যায় অনেক বিখ্যাত জলদস্যু তাদের সারাজীবনের লুঠের সম্পদ এখানকারই কোনো গুহার মধ্যে বা মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখে।যদিও সেই হারানো গুপ্তধনের অনুসন্ধানে বহু মানুষ,অনেক বড় বড় কোম্পানি বহু অর্থ ব্যয় করেছে।অনেক কোম্পানি অনুসন্ধানে ব্যয়িত অর্থ যোগান দিতে গিয়ে দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে।

3

রবার্ট লুই স্টিভেন্সনের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস “ট্রেজার আইল্যান্ড”এ এই ধরনের একটি দ্বীপ কে দেখানো হয়েছে।যেখানে লুকোনো গুপ্তধনের হদিশ পেতে জিম হকিন্স,লং জনের সঙ্গে “হিসপানিওয়ালা”জাহাজে চড়ে সেই দ্বীপে পৌঁছে গিয়েছিল।উপন্যাসের রত্ন দ্বীপ ছিল দূর্গম,নির্জন।জলদস্যু সর্দার জনা কয়েক সহযোগী দস্যুদের সাহায্যে ধন রত্ন বোঝাই সিন্দুক নিয়ে সেই দ্বীপে নেমে যেত।তারপর কোনো পাহাড়ের গুহায় বা মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখত।যে সব দস্যুদের  সঙ্গে করে নিয়ে যেত,তাদের সেই দ্বীপেই হত্যা করত।যাতে তারা গুপ্তধনের সুলুক সন্ধান কোনোদিন কারুর কাছে ফাঁস করতে না পারে।বেশিরভাগ সময়েই সেই দস্যু সর্দার যুদ্ধে মারা গেলে বা জাহাজ ডুবি হলে,সেই গুপ্তধন অধরাই থেকে যেত।ট্রেজার আইল্যান্ডে উল্লিখিত রত্নদ্বীপ(কংকাল দ্বীপ) সম্ভবত: বাস্তবের কোকোস আইল্যান্ড।বেনিতো বনিতো নামক দুর্ধর্ষ জলদস্যু কোকোস দ্বীপকেই বেছেছিল,তার সারাজীবনের সঞ্চয় লুকিয়ে রাখার জন্য।বহু মানুষ তাদের জীবন পন করে গুপ্তধনের সন্ধানে সারাজীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছিল।রিচার্ড জ্যাকের লেখা কুখ্যাত জলদস্যু সর্দার ক্যাপ্টেন কিডের ওপর লেখা বইটি থেকে জানা যায়,কিড নাকি তার সারা জীবনের লুণ্ঠিত রত্ন্ররাজি,সোনা দানা “ওক”আইল্যান্ডে লুকিয়ে রেখেছিল।যদিও পরে কেউই তা খুঁজে পায়নি।দ্বীপগুলো এত অসংখ্য খাঁড়ি পরিপূর্ণ ছিল,যে, খোঁজপাওয়াটাও খুব একটা সহজ কাজ নয়।

১৭০১ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন কিডকে প্রকাশ্য রাজপথে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *