জলদস্যুতার সেকাল একাল.. (তৃতীয় পর্ব) (লেখক- অনির্বাণ ভট্টাচার্য)

2বাংলায় জলদস্যুদের নানান নামে ডাকা হত।বোম্বেটে,হার্মাদ(নামটা সম্ভবত: স্প্যানিশ আর্মাডা থেকে অপভ্রংশ হয়ে বাংলা শব্দভাণ্ডারে এসেছে),ইত্যাদি।বুকানির,প্রাইভেটিয়ার এগুলোতো ছিলোই।শোনা যায় বাংলার বর্তমান দক্ষিন চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে নাকি পর্তুগীজ জলদস্যুদের বেশ বড়সর একটা ঘাঁটি ছিল। 

 

সেকালের জলদস্যুরা মূলত দ্বীপ অঞ্চলে থাকতে পছন্দ করত।এতে লুকিয়ে থাকার সুবিধার পাশাপাশি নানা ধরনের বেলেল্লাপনা করার এন্তার সুযোগ থাকত।থাকত অফুরন্ত ফূর্তির সুযোগ।যখন জাহাজে করে সমুদ্র লুটে বেরোত,তখন তাদের উর্ধাঙ্গ থাকত অনাবৃত।কোমরে বেল্ট বাঁধা ঢোলা পাতলুন গোছের প্যান্ট।পায়ে ফিতে বাঁধা গামবুট জাতীয় জুতো।ডেকে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকত।হাতে খোলা বাঁকা তলোয়ার,লম্বা পিস্তল,কখনো ঢাল।কেউ কেউ কামানের তোপ দাগার জন্য প্রস্তুত থাকত।দূরে মালবাহী বা যাত্রীবাহী জাহাজ দেখা গেলেই পৈশাচিক চিৎকার করা শুরু করে দিত।দ্রুত জাহাজ চালিয়ে অন্য জাহাজের ডেকের একদম গায়ে ঠেকিয়ে নিজেদের জাহাজ দাঁড় করাতো।তারপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে লাফিয়ে পড়ত আক্রান্ত জাহাজের ডেকে।এর পরের গল্পটা মোটামুটি একই। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শত্রু পক্ষের সক্কলকে কচুকাটা করা।তাদের সামনে হাঁটু মুড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করলেও নিস্তার পাওয়া যেতনা।শিশু,বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও ছাড় পেত না।দীর্ঘদিন নারীসঙ্গ বঞ্চিত দস্যুদের যৌন লালসার শিকার হত নারী যুবতীরা। তাই দূর থেকে কোনো জাহাজের মাস্তুলে কালো পতাকার ওপর নর করোটি আর আড়াআড়ি করে সাদা রঙে আঁকা নর অস্থির ছবি দেখা গেলেই অন্য জাহাজীদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যেত।

1

সেকালের জলদস্যুরা যে সমস্ত জিনিষগুলো লুঠ করত তার মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের ছিল,সোনা,সোনার গুঁড়ো,রূপো,উজ্জ্বল মনি রত্ন।ফরাসী ও ইংরেজ জলদস্যুরা বাণিজ্য জাহাজগুলো লুঠ করার উদ্দ্যেশ্যই ছিল,উপনিবেশ সমূহ থেকে সংগৃহীত ধন সম্পদ আত্মসাৎ করা। 

দিনের পর দিন দস্যুরা জলে ভেসে থাকতে থাকতে খিটখিটে,বদরাগী হয়ে যেত।কথায় কথায় হাতাহাতি থেকে খুনোখুনি কিছুই বাদ যেত না।আর সেই কারনেই সবসময় মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকত।তার ওপর মদ্যপানের প্রভাব তো ছিলই।জলে থাকার সময় তারা একমাত্র মদ আর শুখনো চিজ বা জমে যাওয়া মাংস ছাড়া আর কিছুই খেতে পেত না।অভাব ছিল পানীয় জলেরও।দীর্ঘদিন ধরে কাঠের পিপে বন্দী জলে পোকা কিলবিল করত।ফলে রোগ ব্যাধি লেগেই থাকত।প্রধানত টাটকা শাক সব্জীর অভাবে তারা অনেকেই স্কার্ভি তে আক্রান্ত হত।ড্রপসি ও ম্যালেরিয়ার মত দুরারোগ্য রোগও ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।বেশির ভাগ অসুখই ছিল ছোঁয়াচে ও ভীষন পীড়াদায়ক।সেক্ষেত্রে যন্ত্রনা সহ্যের বাইরে চলে গেলে,সঙ্গীরাই পীড়িত ব্যাক্তিকে গুলি করে বা শিরা কেটে দিয়ে চিরতরে মুক্তি দিত।শোনা যায় ম্যাগেলানের পৃথিবী পরিক্রমার সময়,খাদ্যের অভাবে নাবিকরা কাপড় ও চামড়ার মাস্তুল জলে ভিজিয়ে খেত।এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য এরা স্বল্পায়ু হত।অল্প বয়সেই তাদের শরীরে নানা ধরনের যৌন ব্যাধি বাসা বাঁধত।অনেকেরই মুখের মাড়ি ফুলে যেত।ঠোঁট ফুলে যেত।মুখের পচা গন্ধে তাদের কাছে যাওয়া যেত না।

জলদস্যু সমাজে শাস্তিও ছিল তাদের মতই নির্মম।যন্ত্রনাদায়ক।বিশ্বাসঘাতকতার একমাত্র শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড।অত্যন্ত কষ্টদায়ক সেই মৃত্যু।তাদের অনেকেই বড় বড় চুল রাখত।সেই চুলের মধ্যে একটা লাঠি ঢুকিয়ে দেওয়া হত।তারপর তেলের ঘাণির মত সেই লাঠির দুই প্রান্ত ধরে প্যাঁচানো হত।রোজ রোজ একটু একটু করে চাপ বাড়ত মাথায়।যন্ত্রনায় পাগল হয়ে যেত অধিকাংশই।ধীরে ধীরে চুল শুদ্ধু মাথার স্কালটা খুলে আসত।আর একটা শাস্তি ছিল,যাকে জলদস্যুদের ভাষায় বলা হত বেড়ালের ল্যাজ।এটা ছিল এক ধরনের চাবুক।তাতে নটা গিঁট বাঁধা থাকত।আর গিটঁগুলোতে আঠা লাগিয়ে পেরেক বা কাঁচের টুকরো আটকানো থাকত।সেই চাবুক শরীরের কোথাও লাগলেই খুব রক্তপাত হত।ভীষন অপরাধের শাস্তিও ছিল ভয়াবহ।সজ্ঞান অবস্থায় ছুতোররা হাত পা জিভ কাটত।আশ্চর্য ঘটনা হল,এর পরেও তারা বেঁচে থাকত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *