“I hate being late”(Mahatma Gandhi), Soumya Aich Ray

A2FHB8১৯৪৮ সালের ৩০সে জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী প্রার্থনা সভায় যেতে দশ মিনিট দেরি করে ফেলেছিলেন। এর জন্য তিনি মনু এবং আভা কে ভর্ৎসনা করেছিলেন। মৃত্যুর খানিক আগেও যে মানুষটি এ কথা বলেছেন সেই মানুষটি সম্ভবত ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।

২৬সে সেপ্টেম্বর প্রার্থনা সভাতেও তা‌ঁর আক্ষেপ ছিল নজর কাড়া। তিনি বলেছিলেন নতুন ব্যবস্থায় তাঁর আর কোনো স্থান নেই। কারণ কাল এর নিয়ম এ গান্ধীর স্বপ্নের রাম রাজত্ব প্রথমে দেশ, পরে রাষ্ট্রের দিকে বদল হতে শুরু করেছে। যেখানে মেশিন, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বন্দর, ইত্যাদি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। এইসব এর মধ্যে গান্ধীজি তাঁর নিজের কোনো স্থান খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে গভীর দুঃস্বপ্নের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি, তা রাম রাজত্ব কিনা জানিনা কিন্তু এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কিছুকাল আগে থেকেই। গান্ধীর দেখানো রাম রাজত্বের সঙ্গে এ রাম রাজত্বের বিস্তর ফারাক। বর্তমানের রাম রাজত্ব কেমন চলছে তা আমরা বিলক্ষণ উপলব্ধি করতে পারছি। কিন্তু গান্ধীর স্বপ্নের রাম রাজত্ব কেন গড়তে পারলেন না তাঁর উত্তরসূরিরা?

কি ছিল চার্চিল এর “অর্ধ উলঙ্গ ফকিরের” কল্পিত রাম রাজ্যে? প্রথমত তিনি বলেছিলেন রাম রাজত্ব কোনো হিন্দু রাষ্ট্রের কল্পনা নয়। রাম রাজত্ব বলতে তিনি বলেছিলেন ঈশ্বর এর রাজত্ব। যেখানে রাম ও রহিম অভিন্ন দেবতা। যেখানে সত্য আর ন্যায়পরায়ণতার ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো ঈশ্বর নেই। তাঁর স্বপ্নের রাম রাজ্যের প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো অন্তরবীক্ষন। নিজের দোষ হাজার গুনে বড় করে দেখা এবং অন‍্যের দোষগুলোকে উপেক্ষা করা। সত্যিকারের প্রগতির এই হলো একমাত্র পথ। এই রাম রাজত্বে সংখাগুরুবাদ নৈব নৈব চ।

আমরা মাথা গুন্তিতে বেশি, তাই অন্যরা আমাদের আধিপত্য মেনে নেবে এটা রাম রাজত্বের দস্তুর হতে পারে না। রাম ছিলেন কি ছিলেন না তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলতেই পারে কিন্তু রাম রাজত্বের কল্পিত আদর্শ, খাঁটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুবিচার, সমাজের সবথেকে দুর্বলতম মানুষটির জন্য বিচারের অধিকার গান্ধীজির কল্পিত রাম রাজ্যের পটভূমি। যে সমাজে জীব, জন্তু, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং নির্বাক উদ্ভিদেরও বেঁচে থাকার অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। থাকবে না সম্পদের অসম বন্টন।

বর্তমানের মতো নিষ্ঠুর সমাজে অসাম্যের দশায় গুটিকতক লোক সম্পদের কোলে গড়াগড়ি খাবেন আর সাধারণ মানুষ খালি পেটে রাত্রের অন্ধকারের তারা গুনবেন এটা হতে পারেনা। গান্ধীজির কল্পিত রাম রাজ্যে রাজা আর ভিখিরির কোনো ফারাক নেই। অধিকার দুজনেরই সমান সমান। গান্ধীজির রাম রাজত্বে রাষ্ট্রের কোনো কল্পনা ছিলোনা বোধয়। নাহলে তিনি ঠিক পছন্দ করতেন না রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে।

বাহারি সংসদীয় গণতন্ত্র ও তাঁর রাম রাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক আর যা কিছুই আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সবটাই গ্রহণযোগ্য নয়, যদি সেটা সর্বশেষ প্রান্তিক মানুষকে এগিয়ে না নিয়ে যায়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন গ্রাম স্বরাজ এর, যা স্বয়ং সম্পুর্ণ এমনকি এক গ্রাম অন্য গ্রাম এর কাছে কখনোই অনুগ্রহ প্রার্থনা করবে না, বাঁচবে সম্মান এর সঙ্গে।

গান্ধীজি হত্যার ঠিক পর পর আদালতে নাথুরাম গডসে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তার মধ্যে দিয়ে সভারকার এর হিন্দুত্ববাদ এর একটা অবয়ব পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর বিবৃতি অনুযায়ী সভারকার এর হিন্দুত্ববাদ এক ধরণের চরম আস্থা যেখানে নাথুরাম গডসে সংখাগুরুবাদের অন্ধ সমর্থক এবং গান্ধীজির “সংখাগুরুবাদ নৈব নৈব চ” এই যুক্তির তীব্র বিরোধী। অতএব গান্ধীজি ভারতবর্ষে মুসলিম বিরোধী নন তাই তাঁকে হত্যা করা ন্যায্য কাজ।

৩০সে জানুয়ারির গান্ধী হত্যা কোনো ধর্মখ্যাপা উন্মাদের কাজ ছিল না। ছিল এক সুপরিকল্পিত, সুচিন্তিত মতাদর্শের প্রেরণা। যেখানে নাথুরাম অহিংসা, সাম্যবাদ, স্বরাজ এবং সহিষ্ণুতার সঙ্গে রানা প্রতাপ, শিবাজী, এবং গুরু গোবিন্দ সিংহজি যে স্বাধীনতা এনেছিলেন তার তুলনা টেনে এনেছিলেন, অর্থাৎ গান্ধীজি মুসলমান বান্ধব, অহিংসনীতিতে বিশ্বাসী, তাই তিনি বধ‍্য।

মূল্যায়নের মাপকাঠি ছিল একটাই, মুসলমান বিরোধিতা। আজকের হিন্দুত্ববাদীরা বিজ্ঞান এর মানবকল্যাণ ও মুক্তচিন্তা কে হত্যা করেই সভারকার এর রাম রাজত্বের প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে চলেছেন। বরণ করছেন বিজ্ঞান এর বাণিজ্যিক ও সামরিক দিক, যা তথাকথিত রাষ্ট্রের প্রয়োজন হলেও সাধারণ এর প্রয়োজন কিনা, খতিয়ে দেখার সময় এসে পড়েছে।
দেশ কে সস্তা দরে বিক্রি করার ঠিকাদারি নিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকরা। অতএব, সভারকার এর হিন্দুত্ববাদের মুকুটে একটা নতুন পালক জুটেছে, যেটা নির্মম রূপে অর্থনৈতিক।

এই হিন্দুত্ববাদ শুধু ধর্মীয় দিক থেকে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশবিরোধী। সর্বোপরি, গান্ধীজির কল্পিত রাম রাজত্বের চরম বিরোধী। অধুনা ভারতবর্ষে এই ভাবনাতে প্রতিদিন প্রতিক্ষণে গান্ধী হত্যা হতে হতে অগ্রগতির ছক সাজানো হচ্ছে যাকে পুঁজির শেখানো ভাষায় উন্নয়ন বলতে শিখে গেছি আমরা। সেই উন্নয়ন এর সিংহভাগ পাবে এক শতাংশ মানুষ আর নিরানব্বই শতাংশ এই রাম রাজত্বের প্রজা হয়ে অভুক্ত দিন গুজরান করবেন। আমরা যাকে গণতন্ত্র বলি এবং বিশ্বাস করি, ভুলে গেলে চলবে না, সেই গণতন্ত্রেরই অন্ধকারের ফসল হিটলার।

আজ গণতন্ত্রের স্তম্ভরাই সভারকারের রাম রাজত্বের ভ্রান্ত নেশায় আক্রান্ত। তাই এই ভেকধারী গণতন্ত্রীদের হাত থেকে সত্যিকারের গণতন্ত্রীদের হাতে যেদিন ক্ষমতার হস্তান্তর হবে, সেইদিন পুনর্জন্ম হবে আধুনিক ভারতের। গান্ধীর রাম রাজ্য কিছুটা হলেও আলো হয়তো দেখতে পারে তখন।

গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন যুগোপযোগী মানব ধর্মতে, যার স্বাধীনতা, সাম্য, ও সমৃদ্ধি আধুনিক দুনিয়ার উপযুক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন এই ধর্মই ব্যবহার করলে ভারতবাসী পারবে উপনিবেশ ও আধুনিকতার যেটুকু ভালো তাকে নিজেদের সংস্কৃতির মধ্যে জায়গা দিতে। গান্ধীজি মনে করতেন প্রযুক্তি কে ব্যবহার করে ভালো কাজ সম্ভব, তবে সেটা যদি মানবিক হয় ও তার মধ্যে যদি নৈতিকতা থাকে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সর্বক্ষেত্রে এই দাবি পূরণ করে না, ঐতিহাসিক ভাবে তা শক্তিমান ও দক্ষ মানুষ এর পক্ষেই যায়, দরিদ্র আর দুর্বল এর বিপক্ষে।

গান্ধীজির রাম রাজত্বে এর কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। সত্য, স্বরাজ, মানবিক, নৈতিক অবস্থান, প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রগতি থাকবে এক সুতোয় বাঁধা। লেনিন উপনিবেশিকতাবাদ কে ধনতন্ত্রের সাথে যুক্ত করেছিলেন। গান্ধীজি আরো এক ধাপ এগিয়ে উপনিবেশিকতার সঙ্গে যুক্ত কররছিলেন আধুনিকতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রভুত্বের আকাঙ্খা এবং গৌরবের তৃষ্ণাকে। তিনি মুক্ত চিন্তা ও গ্রামোন্নয়ন এর মধ্যে দিয়ে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন জাতপাত, ধর্মান্ধতা, সংখ্যাগুরুর চাপিয়ে দেয়া মতবাদকে।

গান্ধীজির আসল প্রভাব লুকিয়ে আছে ভারতবর্ষের লিখিত আইন কানুন এর মধ্যে, এ দেশ এর রাষ্ট্রীয় নীতিগুলির মধ্যে। আমার মনে হয় আমার পূজিত গান্ধী দেশনায়ক, যিনি সারাজীবন ধরে কাজ করে গেছেন ভারতবর্ষকে একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে। সমস্ত ভারতবাসীর চেতনায় এবং মননে এক সেক্যুলার সমাজ গড়তে, যার সারকথা একে অন্যের দুঃখ ভাগ করে নেওয়া। এটা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে অহিংসা ও সত্যাগ্রহ আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। সেই রাম রাজ্যের গান্ধীর প্রভাবেই হয়তো আজও বর্তমান জাতপাত ও অস্পৃশ্যতা আইন, সংখ্যালঘুদের অধিকারের স্বীকৃতি, বি-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা, স্থানীয় সায়ত্ত শাসন, পঞ্চায়েতি রাজ, দীর্ঘ তালিকা। এ সবের পরেও মনে হয় কোথায় চলেছি আমরা?

সেদিন গান্ধীজি যে প্রাজ্ঞতা দেখিয়েছিলেন তা আজ কেবল আমাফের দেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্য মূল্যবান। গান্ধী কে বাদ দিয়ে আমাদের দেশ কি সত্যিই পারতো একটি লিবেরাল গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র হয়ে উঠতে? ভারতীয় গণতন্ত্রের বহু ত্রুটি বিচ্যুতি, অনেক অনিশ্চয়তা, তবু তা আজ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়, সুন্দর ও ভরসাযোগ্য। গান্ধীজির কল্পিত রাম রাজ্যে কোনো রাম থাকবে না, থাকবে না সীতা বা লক্ষণ। সেই রাম রাজত্বে বর্ণ হিন্দুবাদ এর কোনো জায়গা নেই। জায়গা নেই কোনো সংকীর্ণ মতবাদ এর। এই রাম রাজত্বে সবাই রাজা, আছে বহুত্ববাদের দৃষ্টি এবং বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের সন্ধান।
Thus, we should hate being late.

সৌম্য আইচ রায়

সৌম্য আইচ রায়

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *