E tumi kamon Tumi !!!! DG…Talks

20149প্রথমে ল্যান্ডলাইনে ফোন করলাম। বেজে গেল, দুপুরবেলা, এরপর যার কথা শুনব বলে ফোন করেছিলাম তার মোবাইলেও ফোন করলাম।বাজল, বেজেই গেল। কেউ ধরলেন না, জানি তো… ভারী গলায় যিনি ‘ ইয়েস প্রবীর মুখারজী স্পিকিং’ যিনি বলবেন, তিনি আর নেই। হা-হা-হা করে বাঁধন হারা হাসিটাও শুনব- সেটাও আশা করিনি। প্রবিরদা যে আর সাড়া দেবেন না!

মৃত মানুষের সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে নেই। সব ভালো বলতে হয়। প্রবীর মুখোপাধ্যায়( ইডেনের কিউরেটর) আর নেই-এটা ফেসবুকের একটি পোস্ট পড়ে মনে ধাক্কা লাগল। কে যেন মনের ভেতর থেকে জোর ধাক্কা মেরে বলতে চাইলঃ প্রবীর দা, এমনটার জন্য তুমি কি দায়ী নয়? যে তুমি সচিব, যুগ্ম সচিব, বাংলা দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব সামলে পরে সংস্থার কিউরেটর হোলে- তুমি কেন টের পেয়েও সিদ্ধান্তটা নাও নি! 153412কোণ সিদ্ধান্তটা? কখন থামতে হয় ‘গাভাস্কার’ মাঠে দেখিয়েছিলেন,তুমিও তো পারতে মাঠের সিদ্ধান্তটি সময় মতো মনকে মানাতে!কিন্তু পার নি। তাই তো একরাশ ঝকঝকে স্মৃতির গ্যালারিতে  শেষবেলায় বেলাশেষের যন্ত্রণায় ঝাপসাই হয়ে গেলে।প্রায় ছ’ ফুট দু’ ইঞ্চি লম্বা, কেতাবি সাজপোশাকে রঙিন মানুষটিকে আমার সাংবাদিক জীবনে নানা ভাবে পেয়েছিলাম। ময়দানে এমন দিলদরিয়া হাসি হাসতে পারা মানুষ খুব কম। চওড়া কাঁধ,বয়স সংখ্যায় বেড়েছে কিন্তু শরীরে থাবা বসাতে পারেনি। বলা ভালো প্রবীর দা বসাতে দেননি। দেশবন্ধু পার্কে শীত- গ্রীষ্ম- বর্ষা সাতসকালে হাঁটতেন। শরীর সচেতন মানুস,দিলখোলা মেজাজের জন্য নানান বয়সের বন্ধু- বান্ধবী ছিল। অধিকাংশই তাকে ফ্রেন্ড বলে ডাকতেন। আমি প্রবীরদা’ ই বলতাম। PRABIR_Cropped_2877339bতখন সবসময় সাড়া পেতাম, এখন তো আর পাবো না। প্রচারমাধ্যম থেকেই জানলাম প্রবীরদার মরদেহ ‘সিএবি’তে(বলা ভাল ইডেনে) পাঠাতে রাজী ছিলেন না ওনার   আত্মিয়রা। মাত্র ‘ছ’  মাষের  ব্যবধানে  একমাত্র  মেয়ে  ও    স্ত্রী   মারা   যায়।  কিন্তু  তাদের  পারলৌকিক  কাজকর্ম  মিটিয়েই  সাতসকালে ইডেনে এসে বসেছিলেন।অনেকেই ওনার এই আচরণে বলাবলি করছিল- লোকটার মাথা গেছে! পরে এনিয়ে ‘সিএবি’র দেড় তলায়(এখানেই তিনি বিশ্রাম নিতেন) প্রবীরদাকে প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরে বলেছিলেনঃ দ্যাখ- বাড়িতে থাকে একা ওদেরই খুজব, তারচেয়ে ইডেনের ফাঁকা গ্যালারির মাঝে মাঠে এসে যন্ত্রণাটা চাপাদিতে চাইছি বারবার। জানি না ক’দিন পারব, কিন্তু এই ইডেন,এই‘সিএবি’এই মাঠ- মালি-ময়দানই আমার বেঁচে থাকারঅ বলম্বন।
আমি শুনিনি উনি ইডেন মাঠের কাজকর্ম করা মালীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন।তবে নিয়মের বেড়াজালে বেঁধেছিলেন নিজেকে এবং সকলকে। গত দেড় দশকে মানুষটির সঙ্গে বহুবার আড্ডা দিয়েছি।অনেক খবর করেছি। অনেক এক্সক্লুসিভ খবরের সুত্র ছিলেন তিনি।তার একমাত্র পুত্র ‘প্রনব’ এখন বাবা’র সাফল্য নাকি, শেষবেলার মানসিক যন্ত্রণা বোলে মনে রাখবেন-জানতে পারি নি। Rohit-Sharma-pr9406এই দেড় দশকে প্রবীরদা’র থেকে অনেক কিছু জেনেছিলাম। কিছু খবর করেছিলাম,কিছু করিনি। অল্প-সল্প ক্রিকেট খেলতাম তাই অন্য ভাবেও চিনতেন। কখনও বিস্বাসভঙ্গের কাজ করিনি। স্টার আনন্দে যখন সাংবাদিকতা করি, তখন হিন্দি চ্যানেলের জন্য ‘মাস্ট’ ছিল খুব কাছ থেকে উইকেটের ছবি ভিডিও ক্যামেরায় তুলে আনা। দেশের অন্য মাঠে কাজটা যতটা সহজ ছিল,  ঠিক ততোটাই কঠিন ছিল কলকাতায়-ইডেনে। কারন প্রবরদা। ইন্টারন্যাশনাল কি ন্যাশনাল লেভেল- যে কোনও ম্যাচে প্রবিরদা’র নির্দেশ মতো দড়ি দিয়ে গণ্ডি কাটা থাকত মাঠের ধারে। তা টপকে যাওয়া যেত না। উইকেটের কাছে তো নয়ই। তিনি একবার রোহিত শর্মাকে চেঁচিয়ে বলেছিলেন, যেও না। দলের কোচ আর ক্যাপ্টেন শুধু ওখানে যেতে পারে। রোহিত সেদিন অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আবার সেই রোহিত যেদিন ইডেনে ডবল সেঞ্চুরি করল প্রবিরদা রোহিতকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন, রোহিতও প্রবীরদা’র বুকের উষ্ণতা অনুভব করেছিলে। প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ‘আথারটন’ টিভি সাংবাদিক হয়ে পিচের কাছে  পৌঁছে গেছিলেন। প্রবীরদা ‘মাইককে’ কড়া ধমক দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। ব্রিটিশ মিডিয়া কড়া সমালোচনা করে লেখালেখি করে। প্রবীরদা সেদিন বলেছিলেন , তোদের যেতে দি না, তাহলে, বিদেশী বলে ওরা চলে যাবে! আমি থাকতে ওটা হবে না। Probir Mukherjee_BCCI_0প্রবীরদা- স্যরি, আমি কিছু অন্যায় করেছিলাম। আমি জানতাম আপনাকে বল্লে-আপনিও হাত নেড়ে বলতেন, প্লিজ, নারে- এই অনুরোধটা করিস না। মাঠে ধকা যাবে না। জানতাম, তাই না বলে চ্যানেলের জন্য ক্যামেরা নিয়ে একাধিকবার ইডেনের উইকেটের ছবি তুলেছিলাম। ইডেনের ক্লাব হাউসের উল্টোদিক দিয়ে।এমন একটা সময়ে যখন আপনি ক্লাব হাউসে সামান্য বিশ্রাম নিতে ঢুকেছিলেন। পরে টিভি চ্যানেলের পর্দায় উইকেটের ছবি দেখে অন্য চ্যানেলের প্রতিনিধিরা আপনাকে গলার স্বর চড়িয়েই ছিল। সেদিনও আপনার স্নেহেতে বাড়তে দিয়েছিলেন। ওদের কি বলেছিলেন জানি না। পরে দেখা হলে আমায় বলেছিলেন, আমার চাকরিটা তুই খাবি। আর এমনটা করিস না। প্রবীরদা শেষবার আপনি- এটা বলার পরে আর অবাধ্য হইনি। কিন্তু আপনার হালকা শীতের জ্যাকেটটা  তো দেওয়া হল না! তখন কলকাতা টিভিতে, কোনও একটা ডে- নাইট ম্যাচ ছিল। সকালে লাইভ শোতে আপনার সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। একটা হালকা জ্যাকেট পড়েছিলেন। জ্যাকেটে রোদের আলো রিফ্লেক্ট করছিল। ক্যামেরায় ছবি ভালো আসছিল না। জ্যাকেটটা খুলে দাড়াতে বলেছিলাম।“ তোর বৌদির কিনে দেওয়া এটা, খোলাবি?” পরে খুলে লাইভ শোটা সেরেছিলেন। মন খুলে কথা বললেও আপনি বা আমি কেউই জ্যাকেটটার খেয়াল রাখি নি। আর জ্যাকেটটা পাওয়া যায়নি।দেখা হলেই জ্যাকেটটা চাইতেন, আমি ভেবেও ছিলাম একটা কিনে প্রবীরদাকে দেব কিন্তু সময় চলে গেছে। তাই আমারও আর ফেরত দেওয়া হল না। দাদা- ক্ষমা করবেন।

Chennai-Super-Kings-batsman-Mahendra-Singh-Dhoni-R-greets-pitch-curator-Prabir-Mukherjee   আচ্ছা,এভাবে চলে গেলেন শুধু অভিমান- দুঃখ-যন্ত্রণা দিয়ে? নাকি কথা রাখলেন! ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাষে ভারত- ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচর জন্য দলনেতা ‘ধনি’ প্রকাশ্যে বলেছিলেন- ঘূর্ণি উইকেট চাই ইডেনে। আপনি রাজী হন নি। স্পোর্টিং উইকেট বানানোর জিদ ধরে বসেছিলেন। চাপ বাড়ছে বুঝে হটাত বিশ্রাম নেবেন বলে ‘সিএবি’ সভাপতি জগমোহন ডালমিয়ার কাছে চিঠিও দেন। ইডেনে আসা বন্ধ করেন। ডালমিয়া ‘সিএবি’ কর্তা বিশ্বরূপ দে’কে উত্তর কলকাতায় আপনার বাড়িতে পাঠান। গাড়ী করে নিয়ে আসেন আপনাকে আলিপুরে ডালমিয়ার বাড়িতে। মিনিট দশেক আলোচনা, তার পর সাংবাদিক বৈঠক আর আপনি ঠোঁটের কোনায় হাসি ঝুলিয়ে ইদেনে।পরে আমাকে বলেছিলেন- জগু যখন বলল, এখন সেই সময় আসেনি। গুডবাই জানাব দুজনে একসঙ্গে।

Prabir-Mukherjee

সেই কথাই এভাবে রাখলেন! কিন্তু সন্তানসম কেউ যা বলেছিল টা আপনি  ইডেন ম্যাচটায় কেন শুনলেন না? হতে পারে আপনার বন্ধু ‘জগু’ ততক্ষণে চলে গেছেন সব মায়া কাটিয়ে। সৌরভ গাঙ্গুলি সভাপতি, দেশের অন্যতম সফল অধিনায়ক। সৌরভ চেয়েছিলেন ভারত- দক্ষিণ আফ্রিকা ওয়ান ডে ম্যাচে বৃষ্টির প্রকোপ রুখতে সারা মাঠ ঢাকতে। আপনি বলেছিলেন, থাক দরকার নেই। মাঠ খেলার যোগ্য কিনা আম্পায়ার ঠিক করবেন কারন তারা খেলাবেন। সেই ম্যাচ বৃষ্টির পর, মাঠ খেলার অনুপযুক্ত বলে বাতিল হয়ে যায় আর সাথে সাথে আপনিও বাতিল হয়ে যান। জানি- যে ভাবে যা যা হয়েছিল আপনি মানতে পারেন নি তাই ছেলে নাতিদের বলেছিলেন –আমাকে আর কোনদিনও ইডেনে নিয়ে যেও না। সঠিক সময় না থামার যন্ত্রণায় এমনটা কেন করলেন? তিন দশকেরও বেশী যেখানে এসেছেন- দিয়েছেন, বেলাশেষে তিক্ততা জিইয়ে রাখলেন? এ তুমি কেমন তুমি প্রবীরদা। আপনি সম্বোধন করিনি। তুমিই ডাকতাম কলম আর কালি এতক্ষণ আপনিতে ঘিরে রেখেছিল।আর শেষ রক্ষা হলঃ তুমি ভালো থেকো- প্রবীরদা- ইডেনের ভালোটা খেয়াল রেখ। RIP.

safe_image (5)

DG Talks

13292902_1100104186715965_1817452889_n-300x222

দীপঙ্কর গুহ

সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক

মতামত জানান-guha.dipankar@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *