বোলপুর আবির দেয় নি দোলে- (অদিতি বসুরায়)

bolpur2শান্তিনিকেতনে যাই বটে কিন্তু ভালবাসি বোলপুরে যেতে। বর্ষা থেকে শীত পর্যন্ত বহুবার ছুটেছি। যাওয়া হয় নি দোলের খেলায় অংশ নিতে। দেখিনি কখনো পৌষ মেলার আড়ম্বর। নিরিবিলি বোলপুরেই আমার অন্যতম প্রিয় পর্যটন।বরাবর। শনিবারের সোনাঝুড়ির হাট আমার গয়না কেনার ঠেক। ঝিরিঝিরি ছায়াতে তাঁতীরা নিয়ে আসেন গম্ভীর কমলা, গর্জাস রেড, একলা নীল, লাস্যময়ী গোলাপি জমিতে খেসের কাজ করা চমৎকার সব শাড়ি।  সেখানে বিকিকিনি চলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা পর্যন্ত। পাওয়া যায় পাটি-সাপটা, ক্ষীরপুলি, আনন্দ নাড়ু থেকে মোমো। চপ-মুড়ি-চায়ের আড্ডায় বসে কানে ভেসে আসে বাউলের মেঠো সুর আর একতারার আয়োজন। ভুবনডাঙ্গাতেই আমার দুনিয়ার সেরা শপিং ডেস্টিনেশন। রাম-শ্যামের দোকানে খেস এবং কলমকারি নিয়ে শাড়িতে যে ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করা হয়, তা কলকাতার বহু নামকরা বুটিককে যে কোন সময়ে দশ গোল দেবে নিঃসন্দেহে। ব্যাগ, টুপি,চাদর,ওড়নার এমন দুর্দান্ত কালেকশন খুব কম মেলে। এই বোলপুরেই রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি-বিজড়িত ইস্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়-মিউজিয়াম,যার পোষাকি নাম শান্তিনিকেতন। সেখান দিয়েই লাল মাটির পথ একলা চলে যায় কোপাই-এর দিকে। ইতস্তত দেখা যায় উদয়ন, শ্যামলী,মৃণালিনী পাঠশালা। হলুদ ইউনিফর্মে ছাত্র- ছাত্রীদের আসা-যাওয়া। কবিগুরুর শান্তিনিকেতন নিয়ে আমার নতুন করে কিছু বলা মানায় না। এ আমার এক নির্জন গন্তব্যের গল্প। এখানে ছড়িয়ে থাকে বর্ষার প্রথম কদম ফুল- আকাশমণির স্পর্ধা- শরতের হাস্যমুখী কাশের দঙ্গল- বৃষ্টি থামার পরের কনে দেখা আলো- যুবতী লাল মাটির ওড়াউড়ি- হেমন্তের নিঃশব্দ শিশির- আরাত্রিকার উদ্ভাস- হিমের রাজকীয় পদার্পন। এসব আমার বোলপুরের ঐশ্বয্য। কেবল পলাশ ফুলের সমারোহ দেখায়নি সে আমাকে কখনো। দেখায় নি কীভাবে দোল-পূর্ণিমায় ভেসে যায় এই ‘শান্তিকেতন’, কীভাবে চাঁদ নেমে আসে বসন্তের ফুলের বাগানে। বোলপুর আমার চির-হেমন্তের দেশ। সেখানে রাজত্ব করে বাদল দিনের জল-ভরা মেঘেরা আর শীতের কুহকী কুয়াশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *