“তার সাহিত্য দর্শনের মুল তত্ত্ব ছিল জীবন।”

‘কেউ imagesবলুক, না বলুক, তুমি সব জানো।

তবু কোথাও পাহাড় আছে

ছোটো কথা, বড়ো কথা, ছোটো দুঃখ, বড়ো বেদনা

সবই ছাড়িয়ে

মস্ত এক হাসির পাহাড়।

একদিন

সেই পাহাড়ে ঘর বাঁধবো তোমার সঙ্গেই ।

লোকে বলুক না বলুক; তুমি জান।’

‘যদি সেই মহামহিমায়

সব শিখা চিরকাল জাগে

তবে সেই প্রথম হৃদয়

আবারও জ্বলুক সংরাগে

কোথাও রয়েছে সেই তরু

যা কিছু সকলি বুকে নিয়ে

ব্যর্থ ক’রে নির্বেদের মরু

নিয়ে যাব মুকুল কুড়িয়ে।’

প্রথম প্রত্যয় (১৯৫৯) কবিতার বই দিয়ে সাহিত্য জীবনের পথ চলা শুরু করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি দম্পতি নরেন্দ্র দেব ও রাধারানি দেবীর একমাত্র সন্তান নবনীতা দেবসেন। ১৯৩৮ সালে ভালো-বাসা বাড়িতে বসে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর নবনীতা নামটি দিয়েছিলেন। আবাল্য সাহিত্য কৃষ্টির আবহে বেড়ে ওঠা নবনীতা সেনের নিজের জবানিতে- ‘নেহাত কপাল করে এই ভালো-বাসা বাড়িতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। শুধু তো লেখক গোষ্ঠই নয়, গানের জগৎ,চলচ্চিত্রের জগৎ, থিয়েটারের জগৎ সকলের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা ছিল মা-বাবার। পঞ্চাশ বছরের বেশিদিন ধরে বাংলা সংস্কৃতির দিকপালদের দেখেছি এ বাড়িতে।… লেখালেখিটাই ছিল এ বাড়িতে যারা সবচেয়ে বেশি আসতেন, তাদের জীবনযাপনের মুল সুত্র। …আমার তাই আবাল্য সাহিত্য চর্চাটাই জীবন চর্চার অন্য নাম বলে ধারনা হয়ে গিয়েছিল।’

প্রাথমিক শিক্ষা মা রাধারানি দেবীর হাত ধরে, পরে গোখেল স্কুল, ১২ বছর বয়সে বাবা- মায়ের সঙ্গে ইয়োরোপ ভ্রমন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস, ১৯৫৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামুলক সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ। ১৯৫৯ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের সঙ্গে বিবাহ। ১৯৬১ সালে হার্ভার্ডে ডিস্টিংশন নিয়ে এমএ পাস। ১৯৬৩ সালে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। এরপর বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন।

তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ‘আর্টিস্ট কলোনি’রও সদস্য ছিলেন যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াতো ও ম্যাকডাওয়েল কলোনি, ইটালির বেলাজিও, জেরুজালেমের মিসক্যানট ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন-হাভার্ড, কর্নেল, রাটজার্স, কলম্বিয়া, স্মিথ কলেজ ও শিকাগো ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত অধ্যাপক এবং সৃজনশীল লেখক হয়েছেন। এছাড়াও তিনি কানাডা, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশের আমন্ত্রিত অধ্যাপক হয়েছিলেন। ১৯৯৬-৯৭ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাব্যের ওপর রাধাকৃষ্ণান স্মারক ভাষণ প্রদান করে প্রভূত সমাদর লাভ করেছিলেন। ১৯৮৮-৮৯ সালে কলোরাডো কলেজে ‘মেট্যাগচেয়ার অফ ক্রিয়েটিভ রাইটিং অ্যান্ড কম্প্যারেটিভ লিটারেচার পদটি অলংকৃত করেছিলেন। তিনি শিক্ষামূলক ও সাহিত্য সংক্রান্ত বহু আন্তরজার্তিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রান্ট কমিশনের ফেলোও ছিলেন।

সমগ্র জীবনে তিনি একাধিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন যেমন- ১৯৯২ সালে গৌরি দেবী পুরষ্কার, মহাদেবী ভার্মা পুরষ্কার, ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরষ্কার, জার্মানি পুরষ্কার। ১৯৯৩ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কার, চেল্লি পুরষ্কার, ভাগলপুর শরৎ পুরষ্কার,প্রসাদ পুরষ্কার। ২০০০ সালে পদ্মশ্রী পুরষ্কার। ২০০৩ সালে অ্যাকাডেমির লাইফ টাইম এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।২০০৮ সালে বিদ্যাসাগর পুরষ্কারে ভূষিত হন।

রাসসুন্দরী দাসীর লেখা ‘আমার জীবন’ বইটি থেকেই শুরু হয়েছিল জীবন ও সমকালের কথা লেখা। তারপর থেকে বিভিন্ন কালে সাহিত্যিকরা তাদের কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজ বদলের কথা, সমকালের কথা। বর্তমান সময়, সমাজ, ব্যক্তি মানুষ ও মূল্যবোধের রংবদলের চেহারাকে চলচ্ছবির মতো তুলে ধরেছেন নবনীতা দেবসেন। আত্মকথার ছলে আত্ম উন্মোচনের মধ্য দিয়ে সমাজ ও সমকালের কথা অতি প্রাঞ্জল ভাবে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের কাছে।

যেহেতু তার সাহিত্য সৃষ্টির সূচনা স্বাধিনতার পরবর্তি কাল তাই তার সাহিত্য দর্শনের মুল তত্ত্ব ছিল জীবন। তিনি মনে করতেন, ” সেতু বন্ধনই শিল্পের কাজ। সেতু বন্ধনই জীবনেরও কাজ।… কোন সৎ-শিল্পীই জীবনকে উপেক্ষা করেন না, হয়ত বা সত্রুভাবে ভজনা করেন। জীবনকে স্পর্শ করার তীব্র ইচ্ছে,আর আহত হওয়ার ভয় দুটো যখন একসঙ্গে কাজ করে তখনই এই ‘বিচ্ছিন্নতার উৎপত্তি’ হয় মানুষের মধ্যে। শিল্পের কাজ গ্রন্থিমোচন নয়, শিল্প সাধনা কিন্তু সন্ন্যাস নয়। শিল্পী বরং সবচেয়ে বেশি শক্ত করেই গ্রন্থি বাঁধেন, স্থান, কাল পার হয়ে। একেবারে নিরবধিকাল বিপুলা পৃথ্বীর সঙ্গে তার কনট্রাক্ট।”

নবনীতা দেবসেনের লেখনি ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। ইন্দ্রিয়সর্বস্ব প্রেম ও যৌনগন্ধি শব্দ আবহের বাইরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল তার সাহিত্য। প্রকাশকদের অনেক চাপ সত্ত্বেও খুব সতর্ক ভাবে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।বিন্দুমাত্র টালমাটাল হতে দেননি নিজ সাহিত্য দর্শনকে।

নবনীতা দেবসেনের প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম প্রত্যয়’। প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনুপম’। বহু জনপ্রিয় বইয়ের স্রষ্টা তিনি। তাঁর জগৎমোহনবাবুর জগৎ, খগেনবাবুর পৃথিবী, পলাশপুরের পিকনিক, ট্রাকবাহনে মাকমোহনে, বুদ্ধিবেচার সওদাগর, গল্পগুজব, অন্যান্য গল্প, বসন মামার বাড়ি ছাড়াও স্বাগত দেবদূত, তিন ভুবনের পারের মতো কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। ১৯৯৯ সালে আত্মজীবনীমূলক রম্যরচনা ‘নটী নবনীতা’ বইটির জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।

বাঙালির প্রিয় লেখিকা, গবেষক, অধ্যাপিকা নবনীতা দেবসেন ক্যান্সারের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে হেরে গেলেন।মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বৃহস্পতিবার সন্ধেয় তাঁর হিন্দুস্থান পার্কের বাড়ি ‘‌ভালো-বাসা’য় মৃত্যু হয়। শুক্রবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রসদন ঘুরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

ওনার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আসুন ওনার অমর আত্মার শান্তি কামনা করি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *