গল্প, সত্যতা, প্রথা মিলেমিশে একাকার ভালোবাসার পূজোয়– সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

41416094_1069287726563538_4104095825230518927_nবাতাসে কেমন হালকা হিমের পরশ, কেমন বদলে যাওয়া গন্ধ। কেউ বলবে পূজোর গন্ধ, আমার মনে পরে যাচ্ছে সেই প্রথম প্রেমের গন্ধ। প্রথমবার কলেজ ছুটির পর দল বেঁধে যেদিন তোমাদের বাড়ি এসেছিলাম, তোমার ঘরে। ঠিক পূজোর আগে, ফিরতি পথে আধতৈরী প্যান্ডেল দেখে বললাম “পূজো কি এসে গেলো?” তুমি বললে “হ্যাঁ আর কদিন ই বা বাকি?”
আজো আসতে যেতে সেই প্যানডেলটার সামনে এলেই মনটা কেমন প্রথম প্রেম বেলায় চলে যায়। আজ আর তুমি সেই ঘরে থাকোনা। বাবা থাকতেন এখনতো বাবাও নেই। কেমন স্মৃতি মেদুর একা ঘরটা, শুধু টেবিলের ওপর হারমোনিয়ামের ওপর কালু শুয়ে থাকে, ভুতোও ঐ ঘরে ঢুকতে চায় না, ছটপট করতে করতে বেরিয়ে আসে, তাই আমি  তোমার সেদিনের ঘরটায় অবসর পেলেই একাই ঘুরে বেড়াই , গোছাই, ঝাড়পোঁছ করি, আসলে প্রেমের স্মৃতিটুকু উপোভোগ করি একা।

সরস্বতী পূজো বাঙালীর ভ্যালেনটাইন হলে দূর্গাপূজায় অনেকেরই লাভ এট ফার্স্ট সাইট। ছুটকি, পুচকি, মুন্নী, বেবি, ডলিরা যখন পাটভাঙা শাড়ি আর এলোচুলে হালকা প্রসাধনে অষ্টমীর দিন অঞ্জলীতে প্যান্ডেলে দুহাত জড়ো করে চোখবুজে দাঁড়ায় তখন দাদার বন্ধু অলোকদা, ছাদের দাদা সৌরভ, পাশের বাড়ির বান্টি সকলের মনেই মনে হয় কবে বড়ো হলি রে? তারপর প্রস্তুতি ভ্যালেটাইনের।

মা যাচ্ছেন সন্তান সহ বাপের বাড়ি। ভোলে বাবার কাছে গেলেন বিদায় চাইতে, উওরে শুনলেন” প্রত্যেক বার সংসার ফেলে যেতেই হবে শিবিনী? একবারও কি ভাবো আমার কি ভাবে দিন যায় পাঁচদিন?” মা তো আসবেন ই। আসলে সব স্বামীরাই এমন, স্ত্রী বাপের বাড়ি যাবে শুনলেই মুখ ভার। যা হোক, মা এলেন বাপের ঘরে। কিন্তু দশমীর পরে কৈলাশে পা রাখতেই শুনতে হলো ঢুকবেনা ঘরে, যাও যেখানে ছিলে সেখানে যাও। মা কচুগাছ তলায় বসে কাঁদতে থাকেন। লক্ষ্মী পূজোর পর মাকে নিয়ে লক্ষ্মী বাবাকে শান্ত করে ঘরে ঢোকেন। সেই জন্যেই দশমীর পর থেকে লক্ষ্মী পূজো পর্যন্ত কচুগাছ কাটতে নেই।

ঘরের মেয়েকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। মূর্শিদাবাদের একগ্রাম। রাতুয়া গ্রামের শাঁখারি চলেছেন ভিনগাঁয়ে। রাজুয়া দীঘির ধারে এক অপূর্বা ষোড়শী শাঁখারীর কাছে আবদার করলে শাঁখা পরার। শাঁখা পরার পর শাঁখারী মূল্য চাইলো। ষোড়শী বলিলেন ” বংশবাটি গাঁয়ের ভবানন্দ ভট্টাচার্য আমার পিতা তিনি মূল্য দেবেন”। বংশবাটির ভবানন্দ ভট্টাচার্য নিষ্ঠাবান, চন্ডীর উপাসক, নিঃসন্তান। শাঁখারি কথা শুনে প্রথমে হতবাক। ক্ষণিক পরে দৌড়লেন সস্ত্রীক দীঘির ধারে। কান্নায় ভেঙে পরলেন “মাগো আর ছলনা করিস নে, পিতা নই আমি তোর সন্তান মা, কন্যা যদি হবি দেখা দে মাগো”। মাঝ দীঘির উপর ভেসে উঠলো শাঁখা পলা নোয়া পরা দুটি সুদৌল হস্ত।
মা আমি গো তোমারি অকীর্তি তনয়।

কেতুগ্রামের গোমাইএর কাটামুন্ড মায়ের আবার ভিন্ন জনশ্রুতি।গ্রামের কোঁয়ার সদগোপদের এই দেবী কাটামুন্ড মা।এরা ছিলেন প্রাচীন গোপভূমির অমরাগড় দিগনগর প্রভৃতি অঞ্চলের ডাকসাইটে ভূস্বামী। এরা নাঙ্গল ধরে না ,কলম ধরা জাত।এদের দাপটে বাঘে গোরুতে  একসময়ে  এক ঘাটে জল খেত।প্রায় তিনশ  বছর আগে  এদেরই পূর্বপুরুষ হরগোবিন্দ রায় অমরাগড় থেকে  গোমাই এ চলে আসেন জমিদারি প্রাপ্তির সূত্রে।একদিন তিনি শরতের দুপুরে কেতুগ্রাম থেকে ফিরছিলেন গোমাই।নির্জন মাঠে ঠাকুরপুকুরের ধারে বিরিক্ষি বটতলা।ভাদরমাসের রোদ চরা দুপুরে তিনি ক্লান্তি মেটাবার জন্য বটতলায় বসলেন।শরীর মন শীতল হলো ,পুকুরে পদ্মফুল আর পদ্মপাতার যেন বন লেগেছে। তৃষ্ণা মেটাবার জন্য পুকুরের জল আঁচলা  ভরে পানকরতেই একটা অলৌকিক দৃশ্য দেখে চমকে উঠলেন।একি মায়া না মতিভ্রম।পদ্মফুলের মাঝে একটা আস্ত নারীর মুখমন্ডল। পদ্মের মতোই  সরোবরে ভাসছে।কাছে যেতেই সেই পদ্মমুখ জলের তলায় ধীরে ধীরে তলিয়ে যায়।তিনি বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকেন।ভোর রাতে  স্বপন দেখলেন  ওরে হরগোবিন্দ তুই ঠিকই দেখেছিস ।আমি দেবী দুর্গা ।যে রূপে তুই আমাকে দেখেছিস সেই রূপেই কর পূজা।অনুরূপ স্বপ্ন দেখলেন পার্শবর্তী শিবলুন গ্রামের মৃৎশিল্পী গোপাল সূত্রধরের পূর্বপুরুষ।আর সেই শুরু।উভয় বংশ পরম্পরার সহযোগিতায় আজও অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে গোমাইএর জাগ্রতা কাটামুন্ডর পুজো।

বাঙালির প্রধান উৎসব ‘দূর্গাপূজা’। প্রশ্ন হল দূর্গা কে? আসলে এ পুজোর নির্মিত প্রতিরূপ মূর্তি দেবাসুর যুদ্ধের চুড়ান্ত পরিনতির ইঙ্গিত বহন করে চলে আসছে। এই দেব ও অসুরের যুদ্ধ সাঁওতালি লোকসাহিত্যে বিদ্যমান ও পুরাণ কথিত। দেব ও অসুর যুদ্ধ মূলত আর্য ও অনার্যের লড়াই, এটাই আবার মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নামে ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। আমরা জানি বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম অংশে ‘অসুর’ কথাটি প্রশংসাসূচক অর্থে উল্লেখ রয়েছে। দেবরাজ ইন্দ্র এই ‘অসুর’ অর্থাৎ ‘হড়’ বা অনার্যদের দলনেতা ‘হুদুড়দূর্গা’র নিকট যুদ্ধে বার বার পরাজিত হন। তখন ইন্দ্র কৌশলে আর্য নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী এক যুবতীকে হুদুড়দুর্গার নিকট উপহার হিসাবে প্রেরণ করেন। ঐ সুন্দরী যুবতী হুদুড়দুর্গার কামুক হৃদয় জয় করে তাকে আক্রমণ করে হত্যা করে। এইভাবে আর্য দ্বারা হড় অর্থাৎ অনার্যরা পরাজিত হয় এবং চাম্পা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়। ঐশ্বর্যবান, বীর্যবান প্রতাপ হুদুড়দুর্গাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়ে ছিল বলে উমা দেবীর নামের সঙ্গে হুদুড়দুর্গার নামের শেষ অংশ যুক্ত করে দেবীদুর্গা বা দুর্গাদেবী নামে পরিচিত হয়। দুর্গা শব্দটি সাঁওতালি পুংলিঙ্গ শব্দ। শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ হল দুর্গী। শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে, “দোর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা অর্থাৎ দুর্গা নামক অসুরকে বধ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা। বিষয়টি অবশ্যই ভাবা প্রয়োজন। বর্তমানে তপশীলি উপজাতি যে তালিকাভুক্ত রয়েছে,তার প্রথম গোষ্ঠীর নাম অসুর সম্প্রদায়। এই জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র ও অশিক্ষিত। যেভাবে এদের পূর্বপুরুষ রাজা মহিষাসুর শূলবিদ্ধ অবস্থায় পুজিত হয়, সেটা ওই সম্প্রদায়ের নিকট চরম বেদনা দায়ক। গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে এটা মানবতা বিরোধী। আর্য নির্মিত ঋকবেদে এদেশের ঐ জনগোষ্ঠীকে দাস, দস্যু, অসুর, রাক্ষস, নাগ ও অহি ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। এবং তারা যুদ্ধে পরাজিত বলে তাদের বিকৃত ছবিটা মানবচক্ষে তুলেধরা হয়েছে।

ভারতের ভূমিপুত্র খেরওয়াল আদিবাসীদের মধ্যে বিশেষত সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাও প্রভৃতি সম্প্রদায়ের যুবকেরা আশ্বিনের ষষ্ঠী থেকে দশমী দিন গুলিতে দলবদ্ধভাবে ভূয়াং, করতাল, ময়ূরপঙ্খী নিয়ে গ্রামে গ্রামে দাঁশাই নাচ করে থাকে। এই দাঁশাই নাচ কোন আনন্দের নাচ নয়। দাঁশাই কোন উৎসবও নয়। এটি তাদের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বেদনার প্রকাশ। তাই তো দাঁশাই এর গান “হায়রে হায়রে” এই বিরহসূচক সুরে গাওয়া হয়। অন্যদিকে আবার বাউরি, কোড়া, সহিস, মুদি প্রভৃতি ভূমিপুত্র জাতিগোষ্ঠীর যুবকেরাও গ্রামে গ্রামে দলবদ্ধভাবে কাঠিনাচ করে থাকে।

“দূর্গা দূর্গা বলে যেবা পথে যায়
শূল হস্তে শুলপাণি রক্ষা করেণ তায়”।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *