৭৫ বছর আগে সাভারকার কি বলেছিলেন,আজ আরএসএস ভুলিয়ে দিতে চায়–সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল।

subhash chandra bose
আজ সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে একটা মেসেজ ঘুরছে। “বিপ্লবের জন্ম দিবস হয়। মৃত্যু দিবস হয় না।”নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস। আজও তিনি মানুষের হৃদয়ে জীবিত। শুধু বাংলাতেই নয় দেশ জুড়ে। স্কুল, কলেজ, হাটে-বাজারে, ময়দানে তার আলেখ্য দেখতে পাই। তিনি মৃত্যুঞ্জয় মহিমায় মানুষের মনে বিরাজমান।
“বোস দা ফরগটন হিরো”। সত্যিই কি তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে? আসলে ঐতিহাসিক যথার্থতা বিচার করে আমরা একথা বলতেই পারি নেতাজি বাধ্য হয়েছিলেন কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আলাদা দল গঠন করতে। তবে তিনি আপাদমস্তক কংগ্রেসী ছিলেন।
সুভাষচন্দ্র বসু ভারত থেকে ব্রিটিশ সমেত সমস্ত বিদেশির উচ্ছেদের লক্ষ্যে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ২১ শে অক্টোবর সিঙ্গাপুরে একটি অস্থায়ীআজাদ হিন্দ সরকারগঠন করেন। স্বাধীন ভারত গঠনের লক্ষ্যে এই সরকারের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার জন্য তিনি ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর নেতৃত্বে এবং ‘চলো দিল্লি’ ডাক আজাদ হিন্দ বাহিনীর মনে অভূতপূর্ব উন্মাদনা ও কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল । সিঙ্গাপুর ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যে জাপান, ইটালি, জার্মানি, ব্রহ্মদেশ এবং থাইল্যান্ড সুভাষচন্দ্র বসুর জাতীয় সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
এরপর বার্মার প্রধানমন্ত্রী বা-মৌঁএবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোর কাছ থেকে ভারতের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত রকম সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে জাপানি সাহায্যপুষ্ট আজাদ হিন্দ বাহিনী কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ভারতীয় সীমান্তের দিকে রওনা হয় ও নেতাজির বাহিনী বার্মার মউডক বন্দরে প্রচন্ড বোমা বর্ষণ করে ব্রিটিশ সেনাকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এই সময় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ৬ ই নভেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো নেতাজির হাতে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দুটি অর্পণ করেন।
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ৩১ শে ডিসেম্বর সুভাষচন্দ্র বসু এই দুটি দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করেন যথাক্রমে ‘শহিদ দ্বীপ’ ও ‘স্বরাজ দ্বীপ’ । এখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নেতাজির আঘাত হানার পরিকল্পনা ছিল। সাঁড়াশি আক্রমণ চালাতে নেতাজি ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ৪ জানুয়ারি বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে ‘প্রধান সামরিক ঘাঁটি’ গড়ে তোলেন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি দল ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে মার্চ কোহিমায় উপনীত হয়ে স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন । অন্য একটি বাহিনী মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের অদূরে মৈরাং -এ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন । এই ভাবে পূর্ব ভারতের ১৫০ মাইল এলাকা আজাদ হিন্দ ফৌজের দখলে আসে ।
কিন্তু হঠাত্‍ বিশ্বযুদ্ধের গতি পরিবর্তন এবং মিত্র বাহিনীর হাতে জাপানের পরাজয়ের ফলে আজাদ হিন্দ বাহিনীতেও বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে । সুভাষচন্দ্র বসুর বারবার আবেদন সত্ত্বেও জাপান সরকার সাহায্যদান বন্ধ করে দেয় । ফলে বাধ্য হয়ে বাহিনীকে অস্ত্র সংবরণের আদেশ দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি টোকিওর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান । পথে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর তথাকথিত মৃত্যু সংবাদ রটনার সঙ্গে সঙ্গে আজাদ হিন্দ বাহিনীর পরাজয় সম্পূর্ণ হয় । বহু প্রতিকূল পরিবেশ, সামরিক সরঞ্জাম, খাদ্য ও রসদের পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাব সত্ত্বেও আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্যরা অভূতপূর্ব শৌর্য, বীর্য ও পরাক্রমের পরিচয় দিয়েছিল । দেশের মানুষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ব্যতীত আজাদ হিন্দ বাহিনীর এই পরাক্রম দেখে ব্রিটিশ সরকার যথার্থ উপলব্ধি করেছিল যে ভারতে তাদের সাম্রাজ্য আর বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর লালকেল্লার প্রকাশ্য সামরিক আদালতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচার শুরু হলে বিখ্যাত আইনজীবী জওহরলাল নেহরু, তেজবাহাদুর সাপ্রু, ভুলাভাই দেশাই প্রমুখ আজাদ হিন্দ বন্দি সেনাদলের পক্ষ নেয় । আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার ভারতীয় জনগণের ওপর ভয়ংকর প্রভাব বিস্তার করে । আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি আধিকারিকদের বিচারে যে সিদ্ধান্ত হয় তার প্রতিবাদে, দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ ও ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, ভারতের নানা স্থানে যেমন কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক ধর্মঘট ডাকা হয়, আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দি সেনাদের বিচারকে কেন্দ্র করে সারা ভারতে যে প্রবল গণবিক্ষোভ ও গণ-উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল তার ফলে ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে প্রবল ভীতির সঞ্চার হয় । এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ফিলিপ ম্যাস্‌ন বলেছেন, ‘এই ঐতিহাসিক বিচার ভারতে ব্রিটিশ শাসনের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দেয়’ ।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, নেতাজিকে নিয়ে লোকসভা ভোটের মুখে হইচই করার তোড়জোড় চলছে, অতীতে সেই নেতাজির তৈরি আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং নেতাজির স্বাধীনতা আন্দোলন প্রক্রিয়াকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছিল বিজেপি’‌র নীতিগত মেন্টর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ৷
৭৫ বছর আগে ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে স্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাঙালি তরুণ সুভাষচন্দ্র বসু৷  আরএসএস নেতা সাভারকার প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, হিন্দুদের এগিয়ে আসতে হবে৷ আজাদ হিন্দ ফৌজকে রুখতে হিন্দুদের ব্রিটিশ সেনায় নাম লেখাতে হবে৷ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ‘‌যুদ্ধ’কে ‘‌সুযোগ’ হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি৷ ময়দানে নেমে পড়েছিলেন ৷ তাঁর আহ্বানে সেই সময় ‘‌নিয়োগ শিবির’ খোলা হয়েছিল ৷ প্রচুর হিন্দু নাগরিককে ব্রিটিশ সেনায় নাম লেখানো হয়েছিল, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে এগিয়ে আসা আজাদ হিন্দ ফৌজকে আটকানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল ৷ আরএসএসের সেই উদ্যোগ সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ বাহিনীকে আটকাতে ব্রিটিশের সহায়ক ‌প্রমানিত হয়েছিল৷ আজাদ হিন্দ বাহিনীর বহু সেনাকে হত্যা করেছিল সেই সেনাদল৷
ইদানিং ভারতীয় জনতা পার্টি যথারীতি ভোল বদলে প্রচারে নেমেছে যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেহরু ও ‌গান্ধী পরিবারের কৃতিত্ব জাহির করতে গিয়ে নাকি সুভাষচন্দ্র বসুর অবদানকে আড়াল করে এসেছে কংগ্রেস ৷ অভিযোগকারী খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৷ তিনি বলেছেন,‌ তাঁর সরকার এবার সব বদলে দেবে ৷
দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছিল সেই ১৯৪১ সালে সাভারকারের নেতৃত্বেই আজ তা মহীরূহে পরিণত হয়েছে। নেতাজির জন্ম জয়ন্তীতে সকলের সাথেসাথে সাভারকারের বংসধররাও তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পারে তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে কিনা তা রাখা থাক আগামীর ঊদ্দেশ্যে।
জয়তু নেতাজি।
সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *