২৯ শে মার্চ ১৮৫৭ ব্যারাকপুরের সেনা ছাউনিতে “মঙ্গল পাণ্ডে’র বিদ্রোহ–

5446571_orig১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাতে গরু ও শুকরের চর্বিযুক্ত কার্তুজ নিয়ে সিপাহীদের উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল কিন্তু ভেতরে ভেতরে।২৯শে মার্চ ১৮৫৭ দুপুরবেলা ব্যারাকপুর সেনাব্যারাকে মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম বিদ্রোহ করে।পরে বহরমপুরেও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে।২৯শে মার্চ বিদ্রোহের দায়ে ৮ই এপ্রিল ১৮৫৭ মঙ্গল পান্ডেকে ফাঁসি দেওয়া হয়।মূল বিদ্রোহ শুরু হয় মিরাটে, ১০ মে ১৮৫৭ সালে।এইদিন সিপাহীরা বিদ্রোহ শুরু করে সেনা ছাউনি থেকে বেরিয়ে যায় এবং শত্রুদের হত্যা করে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করে।বিদ্রোহ শুরুর আগে ব্রিটিশ প্রশাসক ও সেনা কর্মকর্তারা সিপাহী ও জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষের ইঙ্গিত অনুমান করেছিল, কিন্তু ঊর্ধ্বমহল ব্যাপারটাকে অতটা পাত্তা দেয়নি। ব্রিটিশ কর্তারা ভেবেছিল মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসির ঘটনায় সিপাহীরা দমে যাবে।কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি উল্টে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল।ব্রিটিশরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, এমনকি বহু বছর পরও বিদ্রোহকে খাটো করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল।ব্রিটিশ প্রশাসক ও তাদের পেটোয়া ইতিহাসবিদরা বিদ্রোহটিকে শুধু কতিপয় সিপাহীর বিদ্রোহ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল।তারা দেখাতে চেয়েছিল কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও পথভ্রষ্ট্র সিপাহী হাঙ্গামা করেছে এবং এর সমুচিত বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশদের রচিত অনেক গ্রন্থে সিপাহীদের নৃশংসতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ব্রিটিশদের লাগাতার প্রচারে অনেক দেশীয় ইতিহাসবিদও প্রভাবিত হয়েছিলেন।এদের মধ্যে অনেকেই মহাবিদ্রোহের ইতিহাস লিখতে গিয়ে বিদ্রোহটিকে শুধু সিপাহী বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।উদাহরণ স্বরুপ রতন লাল চক্রবর্তী তাঁর লেখা সিপাহি যুদ্ধ ও বাংলাদেশ শীর্ষক বইটিতে বলতে চেয়েছেন-বিদ্রোহটি কি আসলে বিদ্রোহ ছিল?এই বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কার্ল মার্ক্স ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন।বিদ্রোহের ইতিহাস যদি আমারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখি,তাহলে দেখব যদিও বিদ্রোহটি শুরু করেছিল সিপাহীরা কিন্তু এই বিদ্রোহে কৃষক এবং সাধারণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। কারন ১৮৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত একের পর এক যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশরা প্রায় পুরো ভারতেই তাদের শাসন বিস্তার করেছিল।দেশীয় রাজ্যগুলোকে তারা দখল করে নিচ্ছিল।ব্রিটিশরা বাংলায় তাদের কর্তৃত্ব পত্তন করেই ভূমি কর ও শোষন বৃদ্ধি করেছিল।ব্রিটিশদের ভূমি নীতির ফলে জমিদার এবং নিম্নবিত্ত কৃষক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।সেই সময় কৃষকদের সামনে প্রধান তিন শত্রু ছিল। জমিদার,জোতদার ও ব্রিটিশ সরকার।এরিক স্টোকসের মতে কৃষক সমাজই তাদের গ্রামীণ অসন্তোষকে বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত করে।স্টোকস মনে করেন, বিদ্রোহটি ছিল মূলত কৃষকদের ও সেনাবাহিনীর যৌথ বিদ্রোহ। সিপাহীরা কার্তুজে গরু শুকরের চর্বি লাগান ছাড়া আরও অন্য বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহ শুরু করেছিল।ধর্ম, আইডেনটিটি, আত্মসম্মান ইত্যাদি কাজ করেছিল।এছাড়া অর্থের ব্যাপারও ছিল।সেসময়ে সিপাহীদের মাইনে ও সুযোগসুবিধা ছিল যৎসামান্য।পাশাপাশি ইউরোপীয়ানদের জন্য এলাহি ব্যবস্থা।সব মিলিয়ে শুধু কৃষক নয়, অনেক জমিদার এবং দেশীয় রাষ্ট্রের কর্ণধাররাও এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন।এর মধ্যে ঝাঁসির রানী এবং নানা সাহেবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে ঝাঁসির রানীর বীরত্ব নিয়ে এখনো ঝাঁসিতে অনেক মিথ প্রচলিত রয়েছে। বিদ্রোহকে শুধু সিপাহীদের বিদ্রোহ দেখানোর প্রচেষ্টা যেমন হয়েছে তেমন এই প্রপাগাণ্ডায় অনেক ভারতীয়  ইতিহাসবিদ প্রভাবিত হয়েছেন। আবার এর বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। অনেক ইতিহাসবিদ রয়েছেন যাঁরা বিদ্রোহকে শুধু সিপাহী বিদ্রোহ বলেই ক্ষান্ত হতে চাননি। যেমন ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ইতিহাস রচয়িতা শশীভূষণ এই বিদ্রোহকে দেখেছেন সিপাহী বিদ্রোহ ও গণবিপ্লব হিসেবে। ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায় বিদ্রোহেকে আখ্যা দিয়েছেন মহাবিদ্রোহ হিসেবে।এছাড়া ভারতীয় মার্কসবাদী  চিন্তাধারার ইতিহাসবিদরা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহেকে মার্ক্সের পথ অনুসরণ করে খুব গুরুত্বের সাথেই দেখেছেন। কমিউনিস্ট নেতা পিসি যোশী ১৯৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তিতে, রেবেলিয়ন ১৮৫৭ নামে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন।পিসি যোশী ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ হিসেবে দাবী করেছেন।গৌতম ভদ্র তাঁর প্রবন্ধ, ‘ফোর রিবেলস অব ১৮৫৭, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশ ও নেতৃত্ব দেওয়া চারজন বিদ্রোহীকে নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এখনো আমাদের অনেক ইতিহাসবিদের মধ্যে, স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে শুধু সিপাহীযুদ্ধ বলার প্রবণতা রয়ে গেছে। যত দিন না এই প্রবণতা থেকে আমরা বের হতে পারব ততদিন আমাদের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক ভূত বিদ্যমান থাকবেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *