২৫ শে বৈশাখ: বার্ষিক ‘পীড়া’ প্রতিযোগিতা-অণির্বাণ ভট্টাচার্য

GL110509241
“তোমার  আকাশ দাও কবি,
দাও দীর্ঘ আশি বছরের
আমাদের ক্ষীয়মান মানসে ছড়াও
সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আশি বছরের আলো”
                                           -বিষ্ণু দে-
সপ্তোত্তর একশো পঞ্চাশতম রবীন্দ্র জন্মদিবসে আমরা আমাদের প্রণাম নিবেদন করি।মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন দু একটি দিন থাকে যার সঙ্গে একটা গোটা জাতির হৃদয়ের যোগাযোগ ঘটে এবং মানবমন তার একটি মূল্য দিতে প্রস্তুত হয়।বছরের অন্যান্য দিনের থেকে এই দিনটি পৃথক,ভাবার্থে স্বতন্ত্র ও স্মরণীয়।নিছক আনুষ্ঠানিক জন্মোৎসব হৃদয়কে তাঁর সঙ্গে যেন যুক্ত না করে,এটা বিস্মৃত না হই।
চারিদিকে বারোয়ারি আর সার্বজনীন এর ধূম পড়েছে।উৎসব,ব্যসন,শোক সন্তাপও আজ সার্বজনীন।রবীন্দ্র জন্মতিথিও ছাড় পায়নি এই সার্বজনীনতার হাত থেকে।রবীন্দ্রনাথ সবার।সর্বজনের।কিন্তু ঠাকুর হিসেবে এই একদিনের পুজো,বড়ই উৎকট,বড়ই অশ্লীল। ভক্তি প্রদর্শনে আমাদের আপত্তি নেই,আপত্তি পীড়াদায়ক অবান্তর অতি উৎসাহে।
কবি নিজেও এ দেশের এই লোকারণ্যের উপর ‘অর্পিত পূজার’ ভারকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে দেখতেননা।বারোয়ারি বৃত্তির মধ্যে গভীর শূন্যতা অনুভব করে লিখেছিলেন “মাহাত্মাকে লইয়া সকলে মিলিয়া একদিন বারোয়ারি কোলাহল তুলিয়া কর্তব্য সমাধার চেষ্টা লজ্জাকর এবং নিষ্ফল।”তাঁর মতে ”যথার্থ ভক্ত যখন মহতের মহাত্মা কীর্তন করে তা,স্বাভাবিক এবং সকলের পক্ষেই শুভ ফলপ্রদ।”রবি ঠাকুরের প্রতি আমাদের ভক্তি কতটুকু অকৃত্রিম,সেটার হিসেব কষতে গেলে দেখি,কপিরাইট উঠে যাওয়ার পরে,জন্মের সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের পরেই এ নিয়ে “ধূম” এবং “ধূমধাম” এর উৎপাত বেড়েছে।সন্দেহ জাগে,কোথাও কোনো অসুস্থ উত্তেজনা নেই তো! কপট আরোপিত,বাধ্যতামূলক পালনীয় নাগরিক-কৃত্য নয় তো! মালা,চন্দনে ভূষিত কবি সেই ‘রাজা ও রাণী’ র ভক্তের ভক্তির আতিশয্যের মত ঢাকা পড়ে যান উপাচারে।একবর্ণ পড়ার জো থাকেনা।না পড়া যায় গীতবিতান,না পড়া যায় সঞ্চয়িতা,গল্পগুচ্ছ।সবই তখন ঝাপসা, অস্পষ্ট। কবির ছবির মতই তাঁর বাণী,তাঁর রচনা।
মহাপুরুষদের জীবন এবং কাজের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণ খুব স্বাভাবিক।এদেশের প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন মহাপুরুষরা।নমস্য তাঁদের পদচারণায় ধন্য ভূমি,স্পর্শে লালিত প্রকৃতি।কিন্তু এর জন্য কোথাও সমবেত হয়ে মহাজাঁকজমকের মধ্যে দিয়ে প্রচার সর্বস্ব জন্মদিবস পালনের কথা বলা হয়নি।এজন্য কোথাও তাঁর মূর্তি,ছবিতে পুষ্প -বিল্বপত্র ছিটিয়ে পুজো করার কথাও বলা হয়নি।আমরা স্বীকার করি এ স্মরণ ভক্তিভাব থেকেই আসে।কিন্তু বছরের একটা দিন অষ্টপ্রহর তাঁর নাম গান করলেই কি সবটুকু উজার করে দেওয়া যায়? নাম জপ করলেই কি তাঁকে নিজের করে পাওয়া যায়? রবি ঠাকুরের মত একজন মহাপুরুষ কে স্মরণ করে আমরা আত্মউৎকর্ষের সুযোগ পাই। অনুপ্রাণিত হই। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি। একজন যথার্থ ভক্ত তাঁর দেবতাকে গ্রহণ করেন। দেবতারা তো অদৃশ্য,অধরা,তাই তাঁদের গ্রহণ বর্জন কোনোটাই আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা। আত্মজ্ঞানের জন্য একজন ভক্ত দেবতাকে গ্রহন-বর্জনের মাধ্যমে নিজেকে কখনো সম্পৃক্ত করে তোলে আরাধ্যের সঙ্গে,কখনো বা দূরত্ব অনুভব করে,দুর্বোধ্য ঠেকে তার কথা,বাণী,আদর্শের উপমাগুলিকে। নিজের জীবন চর্চার মধ্যে দিয়েই তার ভক্তির সারত্ব প্রমাণিত হয়। রবি ঠাকুরের কতটা কাছে যেতে পেরেছি,সেটা বড় কথা নয়।তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার কাছাকাছি আসতে পেরেছেন কি?
রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে কি কি দিয়েছেন,সেটা বলা বাহুল্য হবে। তাঁকে আমরা কি দিয়েছি,কতটুকু দিয়েছি সেটার হিসেব দেওয়ার সময় এসেছে। কতটুকু সর্বান্তকরণে গ্রহন করেছি,তাঁর শিক্ষা,তাঁর উপদেশ?কতটুকু গ্রহণ করতে পারলে কবিগুরুর চিন্তা,ধ্যান সার্থক হত,আমাদের জীবনেও? নাগরিক জীবনের সর্বাঙ্গীণ অবক্ষয় থেকে বোঝা যায় জাতীয় জীবনে কবির গানের কথা,কবিতার লাইন কতটা হৃদয়ঙ্গম করেছি। আমাদের মনে বা চেতনায় এই বিরাট পুরুষটির প্রভাব যদি কোথাও না পড়ে থাকে তবে নিতান্তই অর্থহীন এই আয়োজন।
মানবচেতনা,কর্মপ্রয়াস,আত্মমর্যাদা,সৌন্দর্যপ্রীতি,ধর্মজ্ঞান মানুষকে সঠিক জীবনপথে পরিচালিত করে। সেই পথের দিশা দেখায় রবি ঠাকুরের গান,কবিতার লাইন। তবুও আমরা মূর্খের মত সে পথের ধারে রবি ঠাকুরের দেউল রচনা করি,ধূপ ধুনো দিয়ে পুজো সারি,উচ্চ নীচের ভেদাভেদ করি,ফুলের মালায় সুচতুরভাবে ঢেকে দিই কবির অন্তর্ভেদী দৃষ্টিকে। যাঁর গানে আজও স্পন্দিত হয় জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত,তিনিই তো প্রকৃত প্রস্তাবে আজও যুগিয়ে চলেছেন প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেমের ভাষা,অভিভাবকের শাসনের ভাষা,অনুশোচনার ভাষা,আবেগের ভাষা,শোকের ভাষা,ভালোবাসার ভাষা।তিনিই আমাদের অন্তিম বিশ্বাস,নিঃশ্বাসের নিঃশ্বাস,জীবনের সারাৎসারবাণী,তিনিই আমাদের প্রতিদিনের ধ্যানে,মননে জীবনের বীজমন্ত্র ছড়িয়ে চলেছেন আজও অকৃপণভাবে,কোনোমতেই তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।তিনিই আমাদের আশ্রয়,ঐশ্বর্য,ঐতিহ্য সব কিছু।
 ঘটা করে আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে জন্মজয়ন্তী পালনের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞাপিত না করে ,অমেরুদণ্ডী সমাজের বিবর্তনে বহুশিরা কাচের মধ্যে দিয়ে রবিচ্ছটার বর্ণালীর বিশ্লেষন করাটা তার চেয়ে আজ অযুত গুন জরুরী,সেটার চৈতন্য হওয়াটাই জরুরী। তা না হলে, দূরারোগ্য চরিত্রহীনতায় আক্রান্ত বাঙালী,ভাগাড়ের মাংস খেয়ে হজম করা বাঙালী,অস্থি-ভিত্তিহীন বাঙালীর মহতী বিনষ্টি এই বার্ষিক প্রাপ্তিটুকুও ধরে রাখতে পারবে না।
অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *