১৬ই ডিসেম্বর,অনেক রক্ত-অনেক কান্না…

14-743x1024১৬ই ডিসেম্বর ২০১৬,৪৫ তম বিজয় দিবস উদযাপনের কয়েকদিন আগে পাকিস্থান দাবী করেছে যে ১৯৭১ সালে পাকিস্থান সেনাবাহিনী দ্বারা বাংলাদেশে কোনরূপ গনহত্যা সংগঠিত হয় নি।দাবীর সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর স্বাভাবিক কারনেই বিতর্কের ঝড় ওঠে।গত ১৬ই ডিসেম্বর কলকাতায় আয়োজিত একটি সভায় অতিথি বক্তা হিসাবে এসেছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন প্রথমসারির সেনানায়ক।কৌতূহলবশত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওঠা বাংলাদেশে গনহত্যার করার দায় অস্বীকার করার বিষয়টি উত্থাপন করি।উত্তেজিত মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের জবানীতে এমন কিছু ঘটনার কথা শুনলাম যা শুনে শিউরে উঠলাম।কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি।

এক.মালতিয়া গ্রামের কাছে আসতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়ি আটকে পড়ল।রাস্তায় মৃতদেহের স্তূপ। মৃতদেহ না সরালে কিছুতেই এগোন সম্ভব নয়।পাকিস্তানী সৈন্যরা কয়েকজন লোককে অস্ত্রের মুখে দাঁড় করিয়ে লাশগুলো টেনে রাস্তার একপাশে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করাল।পাক জিপ গাড়ি কেশবপুর হয়ে যশোরের রাস্তায় কিন্তু গাড়ি চলছে খুব মন্থর গতিতে।গাড়ির আগে কয়েকজন মানুষ সমানে লাশ সরিয়ে চলেছে তাই গাড়ির গতি মন্থর।তাড়াতাড়ি যেতে হবে।বিকল্প ডুমুরিয়া-খুলনা যাওয়ার রাস্তা সেটাও একই অবস্থা।ডুমুরিয়া-খুলনা কাঁচা রাস্তায় শুধু রক্ত আর লাশ।

খেয়া পেরিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।লোক নেই।ভদ্রার নদীর বুকে ডুবে আছে অনেক নৌকো, ভেসে বেরাচ্ছে অগুন্তি লাশ।ভদ্রার তীরেও থিক থিক করছে লাশ।পাক সেপাই গিয়ে চেয়ারম্যান,মেম্বারদের খবর দিয়েছে যে ক্যাপ্টেন এসেছে আপনাদের এখুনি যেতে হবে।জিপের মধ্যে বসা ক্যাপ্টেন চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের হুকুম দিলে আজ রাতের মধ্যে সব লাশ নদীতে ফেলে দিতে হবে।এতো লাশ কি করে একরাতে নদীতে ফেলবে সেই চিন্তায় সকলে একে অন্যের মুখ দেখছে।সাহস করে চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেনকে বললেন ‘স্যার, এই অল্পসময়ে এত লাশ নদীতে ফেলা সম্ভব নয়।’

‘কিঁউ?’- বিশ্রীভাবে চিৎকার করে উঠে পাক ক্যাপ্টেন।
কতজন লোক পাওয়া যাবে?

‘পুরো এলাকা খুঁজে একশ’জন।’

‘একশ’ লোকই যথেষ্ট। কাজ শুরু কর।’

‘চার পাঁচদিন লাগবে স্যার।’দুইজনের এক একটা দল দিনে বড়জোর ৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে।ঘণ্টায় গড়ে ৬টা লাশ সরাতে পারে।৮ ঘণ্টায় ৪৮ বা ৫০টা খুব বেশি হলে ৬০টা। এর বেশি কোনমতেই সম্ভব না।

‘ক্যায়া বক বক করতা হ্যয়’- ক্যাপ্টেন রেগে ওঠে।

স্যার ‘লাশগুলো টেনে নদী পর্যন্ত নিয়ে যেতে সময় লাগবে। ২ জনের একটা দল বয়স্কদের ১টার বেশি লাশ নিতে পারবে না। ছোট ছেলে-মেয়েদের ৪/৫টা নিতে পারবে। নদীর লাশগুলো বাঁশ দিয়ে ঠেলে ঠেলে ভাটার টানে ছেড়ে দিলে সমুদ্রে চলে যাবে। কিন্তু ডাঙার লাশ সরাতে খাটুনি অনেক….

‘তব তো কাল তক হোনা চাহিয়ে?

‘না সাহেব, লাশ অনেক।’

‘কিতনা?’

মালতিয়া গ্রামের আশপাশ, রাস্তাঘাট, চুকনগর বাজার, পাতাখোলার মাঠ, বিল এখানেই প্রায় ১০/১২ হাজার। নদীতে ৩/৪ হাজার।ক্যাপ্টেন বিশ্বাস করতে চায় না।জিপের সিটের উপর দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন দেখতে থাকে চারপাশ। কিছুক্ষণ দেখার পর ক্যাপ্টেন শান্ত-কণ্ঠে বলে, সে সোমবার বিকেলে অথবা মঙ্গলবার সকালে আসবে—

B676T04IMAAmx__

দুই.

একজন মানুষ সর্বোচ্চ কতজন মানুষকে হত্যা করতে পারে? ১০?১০০?২০০?৫০০?১০০০…? অফিসিয়ালি একজন মানুষের হাতে সর্বোচ্চ হত্যার সংখ্যা ২,৭৪৬ এবং এই বিশ্ব রেকর্ডটির মালিক আমেরিকা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট ডিলার্ড জনসন।ইনি সৈনিক জীবনের বেশীরভাগ সময় কাটিয়েছে ইরাকে।এই পর্যন্ত শুনলেই বলতে হয়—বাবা এবার থাম।কিন্তু থামার উপায় নেই।৮ই নভেম্বর ১৯৭১ সালে রাওয়ালপিণ্ডির সিএমএইচে এক তরুণ পাকিস্তানী অফিসারকে আনা হয়েছে মানসিক চিকিৎসা করার জন্য…“সে নাকি একাই প্রায় ১৪,০০০ মানুষকে হত্যা করেছে।এত লাশ দেখতে দেখতে সে পাগল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কথা মনে পড়লেই তার ক্রমাগত খিঁচুনি হচ্ছে এবং ঘুমিয়ে পড়লে দুঃস্বপ্ন দেখছে… তাকে ফিরে যেতে হবে হিন্দুদের শেষ করতে হবে…”গল্পটা ক্যামন যেন বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছে তাই তো? এই কথাগুলি কোন ভারতীয় বা বাংলাদেশী লেখক নিজের বইয়ের কাটতি বাড়ানোর জন্য লেখেননি। এটা লিখেছেন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পুত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গওহর আইয়ুব, তার “Glimpses into the corridors of power”- বইতে। বইটার “স্পিলিটিং পাকিস্তান” অধ্যায়টা খুললেই খুঁজে পাবেন।

তিন.

১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে সাতক্ষীরার দিকে যাচ্ছিলেন। তার সাথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মূসা সাদিক সহ অন্য কয়েকজন। হঠাৎ মাহমুদপুর ঘোনার মাঝামাঝি স্থানে তাঁর গাড়ির সামনে এসে দাড়ায় তিন কৃষক ও দুই বালক। যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আচমকা এই ঘটনায় সতর্কতার সাথে গাড়ি থামিয়ে ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং জানতে পারলেন – কাছের একটি মসজিদে পাকিস্তানী খান সেনারা কয়েক মাস থেকে তাদের এলাকার ১১টি মেয়েকে আটকে রেখেছে। এরা মৃত না জীবিত তার কোন খবর নেই।সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং তার ফোর্স নিয়ে মসজিদের দিকে যান।তিনি মসজিদের কাছে গিয়ে মেয়েদের কান্নার শব্দ শুনতে পান।ভেতরে ঢুকে দেখেন ১১ জন কন্যা মসজিদের মধ্যে বিবস্ত্র অবস্থায় একে অপরকে ধরে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করছে, আর অঝোরে কাঁদছে।পাক সেনারা কোন সময় যে এখান থেকে চলে গেছে তা তারা জানেই না।ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং শিশুর মত কেঁদে ওঠেন।কাঁদতে কাঁদতে নিজের মাথার পাগড়ি খুলে-মেয়েদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে চলে যান গাড়িতে।

289870-salil-tripathi-book-on-bangladesh-war-twitter

চার.

কুষ্টিয়ার কুমার খালির কাছাকাছি একটি ক্যাম্পে পাক বাহিনীর ধর্ষন সম্পর্কিত অন্যরকম একটি ঘটনা ঘটে।একদিন পাকিস্তানী সৈন্যরা স্থানীয় রাজাকার কমান্ডারকে সঙ্গে নিয়ে মেজরের জন্য সুন্দরী মেয়েদের খোঁজে বের হয়।সমস্থ গ্রাম খুঁজে কোন মেয়ের সন্ধান না পেয়ে পরে রাজাকার কমান্ডারের বাড়িতে খেতে আসে।এখানে এসে সৈন্যরা সেই রাজাকারের ঘরে তার ষোড়শী কন্যাকে দেখতে পায়। রাজাকারের বাড়িতে সৈন্যরা খাওয়া-দাওয়া শেষে রাজাকারকে ঘরের খুটির সঙ্গে বেঁধে রেখে তার স্ত্রী, বোন সহ বাড়ির অন্যান্য মহিলাদের ধর্ষন করে, যাওয়ার সময় সৈন্যরা রাজাকারের কন্যাটিকে সঙ্গে নিয়ে যায়।কয়েক দিন পর এই কন্যার লাশ কচুরিপানা ভর্তি ঐ পুকুরে ভেসে থাকতে দেখা যায়।

পাঁচ.

পাক বর্বরেরা প্রত্যেক মহিলাকে অবর্ণনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে ধর্ষণ করত।ধর্ষণের পর তাদের হত্যা করত। ধোপা যেভাবে কাপড় কাচে সেভাবে রেললাইনের ওপর মাথা আছড়ে, কখনও দু’পা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে দু’টুকরা করে হত্যা করেছে শিশুদের।স্বাধীনতার অনেকদিন পরেও সেখানে মহিলাদের কাপড়, ক্লিপ, চুল, চুলের খোঁপা ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখা যায়।

ছয়.

একটি মেয়ে সদ্য মা হয়েছে, আট দিনের বাচ্চা কোলে। ঐ সময় সে বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াচ্ছিলো। এমন সময় বাড়িতে আক্রমণ। ঘরে তখন কেউ ছিলো না। এরপর যা হবার তাই হলো, মেয়েটির উপর চলল অমানসিক নির্যাতন। এরমধ্যেই দুপুর গড়িয়ে এল, পাকিরা খাবার খেতে চাইল। ঘরে কিছু না থাকায় ক্ষেত থেকে বেগুণ এনে দিতে বলল। ভীত মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটির আসতে দেরি হচ্ছিলো দেখে পাকিরা তার বাচ্চাকে গরম ভাতের হাঁড়িতে ছুঁড়ে দিয়ে ঘর থেকে নেমে গেল… ছাব্বিশা, ভূয়াপুর, টাঙ্গাইল

সাত.

মার্চে মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি না হলে প্রথমে বাবা এবং ছেলে কে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সাথে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।”বাটিয়ামারা কুমারখালি।

এরকম আরও আরও অনেক ছোট ঘটনার নাম বাংলাদেশ।বিজয় দিবস পালন হচ্ছে কিন্তু  “একটা দেশ তো আর এমনিতে পাওয়া যায় না, কেউ দয়া করেও দেয় না, লড়ে নিতে হয়েছে,অনেক দামদিয়ে কেনা। রুমির জন্য পাকিদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষার প্রস্তাব নাকচ করে ছেলের জন্য শহীদের মৃত্যু পছন্দ করেছিলেন তার পিতা। মায়ের সামনে মেয়ে খায়রুন্নেসা ধর্ষিত হয়েছে, ভাই এর লাশ নিয়ে বোন বিলকিস দারে দারে ঘুরেছে একটু কবর হবে এই আশায়। মেজর নুরুল ইসলামের প্রেগন্যান্ট স্ত্রী কে পাকিস্তানীরা….., ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে মা অন্ধ হয়ে গেছে, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের লাশ দেখে নাতি রাহুল আজও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে আছে।না আশা হারাই না,হতাশ হই না,৭১ এ এই দুর্বল বাঙালি-ই জিতেছিলো।জয় বাংলা।সবাই কে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *