হামলার জবাব দিতে পারব তো আমরা ??,, দেবাশীষ পাইন।

Pulwama_dগত বৃহস্পতিবার কাশ্মীরে পুলওয়ামায় হামলার পর আবার একটা জঙ্গি হামলা হয়ে গেলো গত রবিবার রাতে। হামলায় চার ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এখনও মোদী সরকার কর্তব্য করণীয় ঠিক করে উঠতে পারেনি।

মঞ্চে উঠে ভাষণ দেওয়ার সময় সময়োপযোগী গরম গরম ভাষণ দেওয়া সহজ। দেশের মানুষের মানসিক অবস্থান বুঝে ভাষণে অনেক অস্তিন গুটানো যায় কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করা ততটাই কঠিন।

গোয়েন্দা কর্তারা জানে পুলওয়ামা হামলার অন্যতম চক্রী জইশ কমান্ডার আব্দুল রশিদ গাজী ওরফে আফগানি এখনও কাশ্মীর উপত্যকায় লুকিয়ে আছেন। মাসুদ আজহারের অত্যন্ত আস্থাভাজন গাজী যতক্ষণ উপতক্যায় লুকিয়ে থাকবে ততক্ষণ দুশ্চিন্তা। আফগানিস্তানে তালিবানদের কাছে যুদ্ধ কৌশল ও আইইডি বানানোর ওস্তাদ, পোড় খাওয়া জঙ্গি গাজীকে নিকেশ করা সর্বাগ্রে দরকার। নাহলে গাজী উপতক্যায় আরও ফিদায়ে তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবারের পর থেকে প্রতিদিন দেশবাসি দেখছে মন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও সমর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। যেটুকু খবর সংবাদে প্রকাশ পায় সেটুকুই দেশবাসি জানতে পারছে। যেমন, সৈন্যবাহিনীর হাত খুলে দেওয়া হয়েছে।পাকিস্থানের সঙ্গে সবরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিমান্তে ভারি মাত্রায় সৈন্য ও সমরসম্ভার মোতায়েন করা হয়েছে। ১৪০টি যুদ্ধবিমান মহড়া দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশবাসিকে দেখানোর জন্য প্যাঁয়তারা অনেক চলছে। যেকোনো মুহূর্তে ভারত পাকিস্থানকে আক্রমন করতে পারে এমনধারা একটা স্নায়ু টানটান করা উত্তেজক পরিস্থিতি জিইয়ে রাখা হয়েছে।

কেন এই পরিবেশের সুচনা? সামনে লোকসভার নির্বাচন। বিরোধীরা পাকিস্থানকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করছে। মোদী পড়েছেন মুস্কিলে, কিছু একটা করতে না পারলে নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশবাসির সামনে ভোটের জন্য দাঁড়ানোটাই মুশকিল হয়ে পড়বে। হুঙ্কার পাল্টা হুঙ্কারের খেলায় দুদেশই সমান পারঙ্গম। মজার হোল, দুদেশই কিন্তু জানে তারা পারমানবিক শক্তিধর। এও জানে যুদ্ধ একবার লেগে গেলে তার পরিনতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। আর ভারতের জন্য বিষয়টা বিশেষ ভাবনার তার কারন ২০১৮সালে মার্চ মাসে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট ছিল এই মর্মে, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ৬৮ শতাংশ সমরসম্ভার বহু পুরনো।প্রায় ব্যবহার অযোগ্য। পাকিস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ লাগলে মাত্র ১০দিনের মতো গোলা বারুদ মজুদ রয়েছে।তাই ভারতের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। নাহলে একেকটা হামলা হবে আর বাহিনীর জওয়ান প্রান হারাবে।

এই পরিস্থিতির উদ্ভবই হতো না যদি সময়ে সরকারি এজেন্সিগুলিকে সঠিক ব্যবহার করা হতো। দিনের পর দিন পাকিস্থান বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংঘটনের মাধ্যমে ছায়াযুদ্ধ খেলে চলেছে।যার ফলে নিত্যদিন সিমান্তে গোলাগুলি, সৈন্যবাহিনীর জওয়ানদের মৃত্যু, সাধারন মানুষের জান-মালের ক্ষয় ক্ষতি চলমান।

সিমান্তে অবস্থিত রাজ্যগুলির মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর সবচাইতে উত্তেজনা প্রবন। বিশাল সংখ্যক নিরাপত্তা রক্ষী সারা বছর ধরে এখানে মোতায়েন করা থাকে। এদেরকে সাহায্য করার জন্য থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে গোয়েন্দাবাহিনী। এই গোয়েন্দাবাহিনী কাশ্মীরি সাধারন মানুষের জীবনযাপনের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ নজরদারি চালায়। কোথায় যাচ্ছে, কি কিনছে ও কতটা কিনছে, টেলিফোন নজরদারি, পারিবারিক সামাজিক অনুষ্ঠানে নজরদারি ইত্যাদি ইত্যাদি। মানে নর-নারীর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত ছাড়া সবটাই নজরদারিতে থাকে। গাড়িতে আইইডি বোমা বানানো তো আর কয়েকঘন্টার এবং একজনের কম্ম নয়। সময় লাগে এবং সংখাও দরকার। কয়েকজন জঙ্গি মিলে বোমা বানিয়েছে আর খালি পেটে ছিল এমনটা তো নয়। তাহলে গোয়েন্দা নজরে এলো না কেন?

সেনা কনভয় যাবে, এই খবর সাধারনের কাছে থাকার কথা নয়। তাহলে নিখুঁত সময় ও লক্ষে জঙ্গিরা হামলা চালালো কি করে? কনভয় যাওয়ার সময় আকাশ পথে এবং আরওপি নজরদারির ব্যবস্থা ছিল না কেন? নিয়ম অনুযায়ী সেনা কনভয় যাওয়ার আগে সেই পথে সার্চ টিম যাওয়াটাই নিয়ম। এক্ষেত্রে গাফিলতির চরম উদাহরন রেখেছে গোয়েন্দাবাহিনী।

pulwama-attack-coffins-pti

এখন মেরে ফেলব, কেটে ফেলব, মুতোড় জবাব দেওয়া হবে এই সমস্থ কথা বলা অবান্তর। ভারত পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলির মধ্যে অন্যতম এসব গালভরা কথাগুলির কোন মানেই হয় না। কারন তাই যদি হতো তাহলে ইসরায়েল বা অন্য শক্তিধর দেশগুলি যা করতে পারে ভারতও করে দেখাতো। কয়েকটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সুখস্বপ্ন নিয়ে জাবর কাটতো না।

এখন মোদীর উদ্দেশ্য, আজাহার মাসুদের ঘাঁটিতে ‘প্রিসিশন এয়ার স্ট্রাইক’ মানে নিখুঁত লক্ষ্যে বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা। নিয়ন্ত্রনরেখার ওপারে জঙ্গি লঞ্চপ্যাডগুলিকে ধংশ করা। খুব ভালো কথা কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর জন্য দরকার নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য। মানে রিয়াল টাইম গোয়েন্দা তথ্য। জানতে হবে জইস জঙ্গি ঘাঁটির নির্ভুল অবস্থান। কিন্তু আমাদের দেশের এজেন্সিগুলোর যা হাড়ির হাল তা কি সম্ভব?

ভারত যদি প্রিসিশন এয়ার স্ট্রাইকের কথা ভাবে তাহলে জনবহুল এলাকায় করা যাবে না। করলে, বহু নিরীহ মানুষের প্রান যাবে। নিরীহ প্রান গেলে এখন ভারত আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় যে সমর্থন পাচ্ছে সেটা চলে যাবে। লাদেনের ক্ষেত্রে আমেরিকা যেটা করেছিল। বোমা না মেরে সরাসরি অ্যাবোটাবাদে নেভিসিল কম্যান্ডো নামিয়ে কাম ফতে করেছিল।

উল্টো দিকে, পুলওয়ামার ঘটনার পর পাকিস্থানও বসে নেই, তারাও সতর্ক হয়ে আছে। ঘুঁটি সাজাচ্ছে। আঘাত নেমে এলে কিভাবে প্রত্যাঘাত করবে।  কিছু প্রাক্তন সেনাপ্রধানের অভিমত, পাকিস্থানের মাটিতে হামলা করার বদলে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে হামলা করলে ভালো। পাকিস্থান পাল্টা জবাব দেওয়ার আগে দশবার ভাববে।

পাকিস্থান এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে কোণঠাসা। পাকিস্থানের প্রতিবেশী দেশগুলো ভারত, আফগানিস্থান, ইরান সকলেই পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের শিকার। আমেরিকা প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসবাদীদের নিকেশ করতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। মওকার সুযোগ নিয়ে  ভারত যদি পরিকল্পিত আঘাত হানে তাহলে পাকিস্থান দিশেহারা হয়ে যাবে। আইএসআই ও পাক সেনার কোমড় ভেঙে যাবে। সন্ত্রাসবাদীদের মদত দেওয়া বন্ধ হবে।

এক সমর বিশেষজ্ঞের ব্যক্তিগত মতামত, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা যেমন চলছে চলুক পাশাপাশি ভারতের উচিৎ ‘নন স্টেট অ্যাক্টর্সদের’ ব্যবহার করা। মানে যারা কোনও রাষ্ট্রের নয়, বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। পাকিস্থান মদত দিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে ভারতও একই ভাষায় জবাব দিক। আয়নায় যেমন মুখ দেখাবে তেমন দেখবে।  শায়েস্তা হয়ে যাবে।

ভারত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের কথা ভাবুক। এছাড়া বিকল্প নেই। কারন যখনই একটা হামলা হবে তখনই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কথা ভাবা হবে এভাবে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করা যাবে না। কৌশলগত অবস্থানটা কি হবে সেটা আগে নিশ্চিত করা দরকার। এইটা নিয়ে কেউ ভাবছে না।

একটা হামলা হোল তখনই সবাই নড়েচড়ে বসে তার পর যেকে সেই। এই নিয়ে অনেকবারই হামলা হোল কিন্তু আমরা সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কি কি পদক্ষেপ নিতে পেরেছি। কিসসু পারিনি। পারলে, পুলওয়ামা হতো না।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *