হাতিদের ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ আর রইলেন না। 

DHRITIKANTA_low-res-275x300খবরটা এলো ১লা মার্চ শুক্রবার সকাল ৮টায়। ৮৭ বছর বয়সে ভবানিপুরে নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন হাতি বিশারদ ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী।

দীর্ঘ ছয় দশক হাতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ধৃতিকান্তবাবুর মৃত্যুর সংবাদে ভারতজুড়ে বন দফতরের কর্তা থেকে মাহুত, হাতি-প্রেমিক সকলের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সকলের বক্তব্য- “হাতি সংক্রান্ত কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে আমরা ধৃতিকান্তবাবুর পরামর্শ নিতাম। ওঁর মৃত্যুতে একটি বিরাট ক্ষতি হল। হাতিদের পিল খানা, তাদের পরিচর্যা, খাদ্যাভ্যাস-সহ নানান বিষয়ে আমরা নিয়মিত পরামর্শ নিতাম।”

বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিং জেলার কালিপুর ছিল নিজেদের জমিদারি। ছোটবেলায় বড়দের সঙ্গে বাড়ির পোষা হাতি শর্মিষ্ঠা ও চন্দ্রচূড়দের পিঠে চেপে জমিদারির মহাল দেখতে বের হতেন। সেই থেকে হাতির প্রেমে পড়া। পরে গৌরীপুর রাজ পরিবারের কিংবদন্তি সন্তান প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়ার কাছে হাতি নিয়ে হাতেখড়ি। দেশভাগের পর ধৃতিকান্তবাবুরা ময়মনসিংহ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন কিন্তু ওনার হাতির সঙ্গে সম্পর্ক মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বজায় ছিল।

প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির স্নাতক, ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, কেমব্রিজের অভিজাত ক্লেয়ার হল কলেজের আজীবন সদস্য এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা নিয়ে উজ্জ্বল কেরিয়ার কিন্তু হাতি, জঙ্গল, সাহিত্য ও সঙ্গীত ছিল তার জীবন। জঙ্গল ও হাতি ধৃতিকান্তকে  তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে গারো-জয়ন্তিয়া পাহাড়, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাঞ্চল, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও অসমসহ সারা দেশে। পাড়ি দিতেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও। উত্তরবঙ্গ ও অসমের জঙ্গলকে নিজের হাতের তালুর হাতের মতো চিনতেন।

হাতি বিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি ছিলেন ভারত সরকারের ‘প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট’ এবং ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন অফ নেচার-এর সদস্য ছিলেন। বহু বছর তিনি রাজ্য সরকারের বন্য প্রাণী বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন। ভারত সরকারের হস্তি প্রকল্প চালু হওয়ার আগে তার রূপরেখা নির্ধারণের জন্য নিযুক্ত টাস্ক ফোর্সেরও সদস্য ছিলেন তিনি।

হাতি ও অন্য বন্যপ্রাণী বিষয়ক ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর লেখা অনেক বই দেশে ও বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর লেখা বই- ‘হাতি ও বনজঙ্গলের কথা’, ‘হাতির বই’, ‘বৈঠকী’, ‘জঙ্গলগাথা ও রসনাবিলাস’, ‘জীবনের ইন্দ্রধনু’, ‘আ ট্রাঙ্ক ফুল অব টেলস’, ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান এলিফ্যান্ট বুক’ ইত্যাদি। তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকায় ও সংকলনে। ‘হাতির বই’-এর জন্য ২০০৭ সালে আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন ধৃতিকান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *