“হর হর ব্যোমকেশ”, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

1513660519_938_lord-shiva-digital-art-devo-ke-dev-mahadev-mahadeva-god-gods-goddess-maya-Hinduiযিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, সর্বকারণের কারণ, জ্যোতির জ্যোতি, তঙরীয় অন্ধকারের অতীত, আদি ও অন্তবিহীন তিনিই ভগবান শিব।

হর হর ব্যোম ব্যোম পিনাকপানি তিনিই  মহা ঈশ্বর। উপনিষদ মতে “যদাহতমস্তন্ন দিবা ন রাত্রির্নসন্ন চাসচ্ছিব এব কেবলঃ।”

অর্থাৎ যখন আলো ছিল না, অন্ধকারও ছিল না; দিন ছিল না, রাত্রিও ছিল না; সৎ ছিল না, অসৎ ছিল না- তখন কেবলমাত্র ভগবান শিবই ছিলেন। উল্লেখ্য বেদান্ত বৈদিক সনাতন ধর্মের ভিত্তি তথা বেদের শিরোভাগ; সম্পূর্ণ বেদান্তে শিব ব্যতীত কারো সম্পর্কে এভাবে বলা হয়নি। শুধুমাত্র শিবের ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে “শিব এব কেবলঃ”। সুতরাং সৃষ্টির পূর্বে একমাত্র শিবই বর্তমান ছিলেন। তিনিই লীলাচ্ছলে ব্রহ্মারূপে সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপ ধারণ করে পালন করেন আবার রুদ্ররূপ ধারন করে সংহার করেন। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-হর তাঁরই সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের তিনটি রূপভেদ মাত্র। তাই এই তিন রূপের মধ্যে সত্বার কোন পার্থক্য নেই। তবু সনাতন রূপ পরম শিবরূপই মূলস্বরূপ। তাই ভগবান শিব সৃষ্টির প্রাক্ষালে শ্রীবিষ্ণুকে বলেন-

“অহং ভবানয়ঞ্চৈব রুদ্রোহয়ং যো ভবিষ্যতি।

একং রূপং ন ভেদোহস্তি ভেদে চ বন্ধনং ভবেৎ।।

তথাপীহ মদীয়ং শিবরূপং সনাতনম্।

মূলভূতং সদা প্রোক্তং সত্যং জ্ঞানমনন্তকম্।।”(-জ্ঞানসংহিতা)।

অর্থাৎ আমি, তুমি, এই ব্রহ্মা এবং রুদ্র নামে যিনি উৎপন্ন হবেন, এই সকলই এক। এদের মধ্যে কোনো ভেদ নাই, ভেদ থাকলে বন্ধন হত। তথাপি আমার শিবরূপ সনাতন এবং সকলের মূল স্বরূপ বলে কথিত হয়, যা সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ।

শ্রীকৃষ্ণেরও আরাধ্য ছিলেন পরমেশ্বর শিব। ভগবান শিবের বরেই বিষ্ণু বা কৃষ্ণের ভগবত্বা। তাই হিন্দুধর্মের মূল স্তম্ভ ত্রিশক্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) মধ্যে শিবই প্রধান । তিনি সমসাময়িক হিন্দুধর্মের তিনটি সর্বাধিক প্রাচীন সম্প্রদায়ের অন্যতম শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা।এছাড়া শিব স্মার্ত সম্প্রদায়ে পূজিত ঈশ্বরের পাঁচটি প্রধান রূপের (গণেশ, শিব, সূর্য, বিষ্ণু ও দুর্গা) একটি রূপ। তাঁর বিশেষ রুদ্ররূপ ধ্বংস, সংহার ও প্রলয়ের দেবতা।

তিনি একটি বেলপাতাতেই তুষ্ট

আবার মেদিনীকে কাঁপান তিনি, যখনই হন রুষ্ট

তার অনেকগুলি সদাশয় ও ভয়ঙ্কর মূর্তিও আছে। তিনি একজন সর্বজ্ঞ যোগী। তিনি আবার গৃহস্থ রূপে পার্বতীর স্বামী। ভয়ঙ্কর রূপে তাঁকে প্রায়শই দৈত্যবিনাশী বলে বর্ণনা করা হয়। তাকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতাও মনে করা হয়। এছাড়াও তিনি চিকিৎসা বিদ্যা ও কৃষিবিদ্যারও আবিষ্কারক।

শিবমূর্তির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল তাঁর তৃতীয় নয়ন, গলায় বাসুকী নাগ, জটায় অর্ধচন্দ্র, জটার উপর থেকে প্রবাহিত গঙ্গা, অস্ত্র ত্রিশূল ও বাদ্য ডমরু। শিবকে সাধারণত ‘শিবলিঙ্গ’ নামক বিমূর্ত প্রতীকে পূজা করা হয়।  সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রসমূহে শিব পূজাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক ফলপ্রদ বলে বর্ণনা করা হয়। শিবের পুজোয় কেমন করে বেলপাতা এলো এবং তা কেমন করে শিবের প্রিয় হয়ে উঠল, তার একটি আশ্চর্য উপাখ্যান শিবপুরাণে আছে। সেখানে বলা হয়েছে, শ্বেতকরবী, শেফালি, কুন্দ, মল্লিকা, চাঁপা, শিরীষ, নাগকেশর, মুচুকুন্দ, টগর, বজ্রপুষ্প, ধুতরো আর পদ্ম হল শিবের প্রিয় ফুল। তবে এদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রিয় হল পদ্ম। কিন্তু পুজোর অর্ঘ্যে যদি কোনো ফুল নাও থাকে, তখন শুধুমাত্র একটি বেলপাতা দিয়ে যদি কোনো ভক্ত তাঁকে পুজো করেন, তাতেই পরম তুষ্ট হন আশুতোষ শিব। বেলপত্র তাঁর কাছে সমস্ত পুষ্পের চেয়ে, অর্ঘ্যের চেয়ে প্রিয়।

বেলপাতা ত্রিফলক পাতা। পুরাণ অনুসারে তিনটি পাতা তিন দেবের প্রতীক ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু সংরক্ষণ ও প্রতিপালন করে থাকে ও মহেশ্বর শিব ধ্বংস করেন। ধ্বংস না করলে সৃষ্টি হয়না ৷ সৃষ্টির জন্যই ধ্বংস অনিবার্য ৷

তিনটি বেলপাতা ভগবান শিবের ত্রিনয়নের প্রতীক, তার ত্রিশূলের প্রতীক ৷ ত্রিশূল অর্থাৎ তিন শূলের সমাহার ৷ যাবতীয় অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে থাকে ৷ যে কোনও বিধ্বংসী পরিস্থিতি থেকে হাজার মাইল দূরে রাখে আমাদের ৷

এছাড়াও ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বেলপাতা। মন শান্ত রাখে। উদগ্রীব হতে বাধা দেয়। ঠিক এ কারণেই শিবপুজোয় বেলপাতা অপরিহার্য।

আমাদের শাস্ত্রে অন্যান্য লিঙ্গের তুলনায় বাণালিঙ্গের পূজায় বেশি প্রশংসা লক্ষ্য করা যায়। বাণ নামে এক ভক্ত অসুর ছিলেন। তিনি শিবকে তুষ্ট করার জন্য সুন্দর সুন্দর লিঙ্গ তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করতেন। সুতরাং বাণাসুরের দ্বারা তৈরি লিঙ্গকে বাণলিঙ্গ বলে অভিহিত করা হয় ।

ঔঁ এ্যম্বকম্ যাজ্যামমহিম সুগন্ধী ম্ পুষ্টি বর্ধন

পুরবারুকমিভবন্ধন মৃত্যরমুক্ষি মামৃতাত

তিনি মহামৃত্যুঞ্জয়। তার এই মন্ত্র জপ করলে স্বয়ং যম ও তাকে ছুঁতে পারেনা। পুরাণে বলা হয়েছে নচিকেতা ছিলেন স্বল্পায়ু। তিনি যমদুয়ারে গিয়ে এই মন্ত্রের দ্বারা দীর্ঘায়ু বরপ্রাপ্ত হন ও মৃত্যুকে জয় করে ফিরে আসেন।

ভোলেবাবা পার লাগাও ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও।

ভোলেনাথ জাতপাতের ঊর্ধ্বে, অন্ত্যজ শ্রেণীর ত্রাতা, ডোম, ব্যাধ, ইত্যাদি শ্রেণীর পরম পূজনীয়।

বারাণসীতে এক ব্যাধ ছিলেন। এক ফ্লাগুনী চতুর্দশীতে শিকারে গিয়ে কোন শিকার না পেয়ে ঘুরতে ঘুরতে রাত্রি হয়ে যায়। জঙ্গলের এক বেলগাছের ডালে আশ্রয় নেয়। গাছে অবস্থানকালে ব‍্যাধ নরলে বেলপাতা পড়তে থাকে চার প্রহরে গাছের নীচে থাকা শিবলিঙ্গে। ব্যাধ ছিল অভুক্ত তৃষ্ণার্ত দিনটাও ছিল শিবচতুর্দশী। তাই নিজের অজান্তেই ব্যাধ শিবরাত্রি পালন করে। এরপর তার দারিদ্রতা কেটে যায় মৃত্যুর পর শিবলোক প্রাপ্তি হয়।

পরম শিব ভক্ত ছিলেন লঙ্কেশ্বর রাবণ, বণিক চাঁদসদাগর, ব্যাধ রাজ কালকেতু।

এবছর শিবরাত্রি নিয়ে মতভেদ দেখা দিচ্ছে। কেউ বলছেন আজ সোমবার কেউ বলছে কাল মঙ্গলবার শিবরাত্রি। আজ চতুর্দশী তিথি আরম্ভ বিকেল ৪.২৯ মিনিটে। সূর্যাস্ত বিকেল ৫.৩৭মিনিটে। আগামী কাল সূর্যোদয় ৫.৫৯ মিনিটে। পুরো সময়টা হল ১২ ঘন্টা ২২ মিনিট। নিশীথ কাল ১১.২৪ মিনিট থেকে ১২.১২ মিনিট তাই শিবরাত্রি পালন করুন আজ। মঙ্লবারে নয়।

ওঁ নমঃ ভগবতে রূদ্রায়।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *