স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক:-সোনালী সাহা নন্দী

 

maxresdefault-1505105587ভারতবর্ষ তথা সারা বিশ্বের ইতিহাসে নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে উজ্জ্বলভাবে স্বামী বিবেকানন্দের নাম উল্লিখিত। পরধর্ম সহিষ্ণুতার প্রবক্তা এই মহান ব্যক্তিত্ব,স্বামী বিবেকানন্দের নাম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায়। শুধু তাই নয়,তিনি আমাদের রাজনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পিতা।

১৮৯৩ সালে ১১ ই সেপটেম্বর আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলন, বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের ৪00 বছর পূর্তি উপলক্ষে এই মহাধর্ম সভার আয়োজন করা হয়েছিল। নাম ছিল কলম্বিয়ান এক্সপোসিশন। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ধর্ম মহাসভা ছিল প্রথম। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্ম গুলির মধ্যে সনাতন ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ,বৌদ্ধ ধর্ম ,কনফুসিয়াস ও খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা এই ধর্ম মহাসভায় উপস্থিত ছিলেন নিজেদের ভাবের আদান-প্রদান করার জন্য। এই ধর্ম মহাসভার প্রস্তুতি ও আয়োজনে কোন খামতি রাখা হয়নি। জন হেনরি ব্যারেসের উল্লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, এই মহাসভার আগে বিশ্বব্যাপী এর প্রচারের জন্য ১০,০০০ চিঠি বিলি করা হয় ও ৪০,০০০অন্যান্য নথিপত্র বিভিন্ন ঠিকানায় পাঠানো হয় এবং প্রায় ত্রিশ মাস ধরে রেলপথ ও নৌপথে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়। এই ধর্ম মহাসভার পক্ষ থেকে আহ্বান পেয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ওই সভায় অংশগ্রহণ করেন। এবং ঐ মহাসভায় স্বামীজি মূলত ২৫ বছর আগে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যা সনাতন ধর্ম সম্পর্কে বলেছিলেন তারই কিছু ব্যাখ্যা তিনি করেছিলেন।

প্রথমেই তিনি সিস্টার এন্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা বলে তার বক্তব্য শুরু করেন এবং তিনি অমৃতের পুত্র হিসেবে সকলকে সম্বোধন করেন। তার এই আন্তরিক সন্মোধন শুনে সকলে উচ্ছ্বসিত এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। আমেরিকায় সেই মহা ধর্ম সম্মেলনে তিনি কমবেশি বারোটি পর্যায়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার এই বক্তৃতা সমূহকে‌ আমরা বক্তৃতামালা বলে থাকি‌।

সেদিন তিনি ওই ধর্ম সম্মেলনে উপস্থিত সমগ্র মানবজাতিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো বলেন যে একবার রোম সাম্রাজ্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ইহুদী জাতির একাংশ দক্ষিনে ভারতের দিকে আশ্রয় নেয় এবং আমরা হিন্দু ধর্মালম্বীরা কমবেশি তাদেরই বংশধর ‌।
তিনি বলেন হিন্দুধর্ম এমনই একটি ধর্ম যা পরধর্ম সহিষ্ণু। অর্থাৎ নিজ নিজ ধর্ম প্রতি সকল ধর্মাবলম্বীরাই সহিষ্ণু হয় কিন্তু হিন্দু ধর্ম এমনই একটি ধর্ম যারা নিজধর্ম সহিষ্ণুতার পাশাপাশি পরধর্ম সহিষ্ণুতার কথা শুধু বলেই না দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। এই ধর্ম সকল জাতি এবং সকল ভাবধারার মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। সনাতন ধর্মের মধ্যে টলারেন্স অর্থাৎ সহ্য ক্ষমতার পাশাপাশি রয়েছে  এক্সেপ্টেন্স অর্থাৎ গ্রহীষ্ণুতা। এই সনাতন ধর্মে এক্সক্লুশন শব্দ অর্থাৎ বর্জন বা বাদ দেওয়া বলে কোন শব্দ নেই। তারা নিজ ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া বা শ্রদ্ধা করার পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও ততটা গুরুত্ব এবং শ্রদ্ধা করে থাকে।

এবং স্বামী বিবেকানন্দ উপসংহারে বলেন যে, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি মানবসভ্যতাকে ক্রমাগত হতাশ করে চলেছে। ধর্ম মত্ততা মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এবং সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে। এর ফলে নদীর ন্যায় মনুষ্য রক্ত স্রোত প্রবাহিত হয়েছে। এই ধর্মান্ধতা না থাকলে মানব সভ্যতা আজ কত উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারত তা বলা বাহুল্য। তিনি আরো বলেন, আমি আশাবাদী যে এই ধর্ম সম্মেলনের পবিত্র ঘণ্টাধ্বনিতে সকল ধর্ম বৈষম্যের সমাপ্তি ঘটবে এবং বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে সনাতন ধর্ম অগ্রগতি লাভ করবে।
তিনি হিন্দু ধর্ম দিয়ে শুরু করে সর্বধর্ম সমন্বয়ে দাড়ি টানেন।

সমসাময়িককালে ভারতবর্ষ পরাধীনতার কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় প্রাশ্চাত্য দেশকেই ভারতবর্ষের নাগরিকরা গুরু বলে মনে করতেন। অর্থাৎ তারা যা বলতেন সেই মতামত অনুযায়ী তারা চলতেন। কিন্তু আমেরিকার শিকাগোতে ধর্ম সম্মেলনের সংবাদ শোনার পরে দেশের নাগরিকদের মধ্যে গভীর বৈদ্যুতিক প্রভাব ঘটে, এবং ভাবতে শুরু করে,তাদেরই দেশের একজন সাধারন সন্ন্যাসীকে পাশ্চাত্য দেশ এত সম্মান এত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে, বিষয়টি ভারতবাসীর মধ্যে এক আমূল জাতীয় জাগরণের পরিবর্তন ঘটায়।সেদিন তার বক্তব্যের পর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বলেন- “স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্য দেশে ভারতবর্ষের মর্যাদার ভাবধারা তুলে ধরার জন্য যা করেছেন তা অতুলনীয় এই ঋণ ভোলার নয়। তিনি একা যা সার্থক করেছেন তা সম্মিলিত ভাবে তারা করতে পারেননি”।

এবং পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা স্বামীজি প্রসঙ্গে বলেছিলেন-“আমরা এতদিন অন্ধ ছিলাম তিনি আমাদের দৃষ্টি দিয়েছেন। ভারতবর্ষের আত্মমহিমাকে পৃথিবীর কাছে তো বটেই তথা ভারতবাসীর কাছেও দৃষ্টি উন্মোচন করিয়েছেন”। আমরা জানতে পেরেছি আমাদের কত সম্পদ আছে ।‌তিনি না থাকলে আমরা ধর্ম হারাতাম, স্বাধীনতা লাভ করতে পারতাম না। তাই আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পিতা হলেন স্বামী বিবেকানন্দ।

স্বামী বিবেকানন্দের মহাসম্মেলনের এই বক্তব্য ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্বব্যাপী দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে নিরপেক্ষ তাৎপর্য রয়েছে । আজও ভারতবর্ষের দিকে তাকালে বুঝতে পারি যে এক বিপুল সংখ্যক যুবসমাজ মানব সম্পদ রূপে এদেশে বড় হচ্ছে তাদের জন্য দরকার সঠিক একটি পথ ও দিশা। এই দিশাটির দুটি অভিমুখ থাকবে। এক, ভারতবর্ষে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য যা কিছু সত্য, যা কিছু মহৎ, এবং গৌরবের সে সকল কিছুকে তুলে ধরা । এবং দুই, ভারতবর্ষের বাইরে যা কিছু ভালো আছে সেগুলো কে সাদরে আহবান জানানো। এই দুই অভিমুখ নিয়ে আজকের যুব সমাজকে বড় হতে হবে।  স্বামীজির বক্তৃতা মালা ভারতবর্ষকে শিখিয়েছেন এবং বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে কি মহান সত্য লুকিয়ে আছে ভারতের সনাতন ধর্মে।

সোনালি সাহা নন্দী

সোনালি সাহা নন্দী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *