স্বদেশী, সন্যাসি না বিজ্ঞানী ?

lossy-page1-200px-আত্মচরিত_(প্রফুল্লচন্দ্র_রায়)_005.tifবিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন নির্লোভ, পরোপকারী, শিক্ষাবিস্তারে নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ।  ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট বাংলাদেশের খুলনা জেলায় রাঢ়ুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  ১৮৭২, তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন কিন্তু বার বার রক্ত আমাশা হবার কারণে বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে ।

১৮৭৪ এ আলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স পাস করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে পড়েন এবং ১৮৮১ সালে এফ,এ পাশ করে, ১৮৮২ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। অসাধারণ মেধার বলে তিনি গিলক্রিইষ্ট বৃত্তি নিয়ে চলে যান এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়।

১৮৮৭ সালে রসায়নশাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্য এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কার পান। ১৮৮৮ সালে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর শুরু হয় রসায়নের গবেষণা ও বিভিন্ন সামাজিক কাজ।

তিনি ঘি, সরষের তেল এবং বিভিন্ন ভেষজ উপাদান নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন। ১৮৯৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে তাঁর প্রথম গবেষণা ‘ অন দি কেমিক্যাল একজামিনেশন অফ সার্টেন ইন্ডিয়ান ফুড স্টাফস, পার্ট ওয়ান, ফ্যাটস অ্যাণ্ড অয়েলস।’ পরবর্তীকালে প্রফুল্লচন্দ্রের গবেষণার মূল বিষয় ছিল নাইট্রাইট যৌগ নিয়ে কাজ, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়।

রসায়ন শাস্ত্রে গবেষণারত প্রফুল্ল চন্দ্র মারকুইরাস নাইট্রাইট এর মত রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক পদার্থ উদ্ভাবন করে বিশ্বকে চমকে দেন এবং স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯১৮ সালে নাইট উপাধি পান।  সাংসারিক জীবন থেকে শত হস্ত দূরে থাকা এই সন্যাসি বিজ্ঞানীর হাতে তৈরি অসংখ্য সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান আজও মানব সেবায় নিবেদিত।

প্রেসিডেন্সি কলেজে যখন অধ্যাপণা করতেন তখন তার প্রিয় ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, নীলরতন ধর, পুলিনবিহারী সরকার, রসিকলাল দত্ত, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ বিজ্ঞানীদের  স্বাদেশী শিক্ষা দিতেন। ছাত্রদের বলতেন, “গরীব মানুষের পয়সায় লেখাপড়া শিখছিস। এদের কৃতজ্ঞতার ঋণের বোঝা কিন্তু একদিন তোদের ফিরিয়ে দিতে হবে।”

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র স্বদেশী আন্দোলনের প্রথম পর্যায় থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যখন বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন বিপ্লবীদের গোপনে অস্ত্র কেনার টাকা যোগাতেন।  ১৯১৬ সালে কলকাতায় তিনিই প্রথম মহাত্মা গান্ধীর জনসভার আয়োজন করেছিলেন। ১৯১৯ সালে কলকাতার টাউন হলে রাউলাট বিলের বিরোধিতায় আয়োজিত জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, “ দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীদের টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে।

তিনি বাঙালিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করেছেন। ১৮৯২ সালে মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি সম্বল করে গড়ে তোলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস।

ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে দেশীয় উদ্যোগ বিকাশের যে চেষ্টা স্বদেশী যুগে শুরু হয়েছিল, সেই ভাবনার তাগিদ থেকেই প্রফুল্লচন্দ্র বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তাঁর আনুকুল্য পেয়েছিল, যেমন বেঙ্গল পটারি (কোলকাতা পটারি নামে শুরু হয়), বেঙ্গল এনামেল, ক্যালকাটা সোপ ওয়ার্কস, মার্কেনটাইল মেরিন, ন্যাশানাল ট্যানারিজ প্রভৃতি।

৭৫ বছর বয়সে অধ্যাপনা থেকে অবসর নেওয়ার পর মাত্র আট বছর বেঁচে ছিলেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের সেই চির পরিচিত ছোট কক্ষে। একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাবার ও পড়ার জন্য একটি টেবিল ও একটি আলনা।

১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মাত্র ৮৩ বছর বয়সে বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *