শহীদ ক্ষুদিরাম বোস জন্মেছিলেন ৩রা ডিসেম্বর-ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী

hqdefault১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর পাঁচটায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবককে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করাল।কারাফটকের বাইরে অপেক্ষামান হাজারো জনতা।কণ্ঠে তাদের ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান।ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ নিয়ম মত যুবকটির কাছে জানতে চাইল, তার শেষ ইচ্ছা কী? যুবকটি বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে জবাব দিয়েছিল, ‘আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ উপস্থিত কারা কর্তৃপক্ষ সেদিন বিস্মিত হয়েছিল যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ দেখে। সেদিনের সেই যুবকই হচ্ছেন অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু (জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯, মৃত্যু ১১ আগস্ট ১৯০৮)।
খুব ছোটবেলায় মা-বাবাহারা ক্ষুদিরাম দিদি অপরূপা দেবীর সংসারেই বেড়ে ওঠেন। ক্ষুদিরামের নামটি নিয়েও আছে মজার এক গল্প। তখনকার দিনে পর পর কয়েকটি ছেলেসন্তান মারা গেলে মা তাঁর কোলের ছেলের সব লৌকিক অধিকার ত্যাগ করে বিক্রি করার ভান করেন। তখন যে কেউ তাকে কড়ি অথবা খুদ দিয়ে কিনে নেয়। দিদি অপরূপা দেবী তিন মুট খুদ দিয়ে কিনেছিলেন বলে সেই থেকে ভাইটির নাম হলো ক্ষুদিরাম।
মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় এক বন্ধু  পরিচয় করিয়ে দেয় বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে।ক্ষুদিরামের দেশাত্মবোধ দেখে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে সে যুগের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য করে নেন।এই দল সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে সত্যেন্দ্রনাথ এক তাঁতশালা স্থাপন করেছিলেন। তাঁতশালার আড়ালে তিনি তাঁর শিষ্যদের লাঠিখেলা, অসি চালনা, বোমা ফাটানো, পিস্তল, বন্দুক ছোড়া ইত্যাদি শিক্ষা দিতেন।
অচিরেই ক্ষুদিরাম এই তাঁতশালার দক্ষ সদস্য হয়ে পড়লেন। তখনই দিদির বাড়ির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরের মারাঠা কেল্লায় এক শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে সেই যুগের বিখ্যাত রাজদ্রোহমূলক পত্রিকা সোনার বাংলা বিলি করার দায়ে পুলিশ ক্ষুদিরামকে ধরতে গেলে তিনি পুলিশকে প্রহার করে পালিয়ে যান। কিন্তু পরে ধরা পড়েন। তাঁর বয়স অল্প হওয়ায় পুলিশ মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
১৯০৭ সালে বিপ্লবী দলের অর্থের প্রয়োজনে ক্ষুদিরাম এক ডাকহরকরার কাছ থেকে মেইলব্যাগ ছিনিয়ে নেন। সে সময় বিপ্লবীদের রাজদ্রোহ মামলায় কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড মরিয়া হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরাতে বিপ্লবীরা প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেন কিংসফোর্ডকে হত্যা করা করতেই হবে।
যথাসময় এ দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষুদিরাম বসুর ওপর। আর তাঁর সহযোগী করা হয় রংপুরের আরেক যুবক বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে। বিপ্লবীদের সম্ভাব্য আক্রমণ এড়াতে কিংসফোর্ডকে বদলি করা হয় মজফফরপুরে।দুই তরুণ বিপ্লবী জীবনের কঠিন ব্রত পালন করতে রওনা দিলেন মজফফরপুর। দুজনে আশ্রয় নিলেন কিংসফোর্ডের বাসভবনের পাশের একটি হোটেলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা কিংসফোর্ডের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকেন।কিংসফোর্ডের বাসভবনের পাশেই ইউরোপিয়ান ক্লাব।অফিস আর ক্লাব ছাড়া কিংসফোর্ড বাইরে যেতেন না। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল কিংসফোর্ডের খেলার সঙ্গী অ্যাডভোকেট কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে রাত আটটার দিকে খেলা শেষ করে।মিস ও মিসেস কেনেডি কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো হুবহু দেখতে আরেকটি গাড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন।গাড়িটি ফটক পার হতে না হতেই প্রচণ্ড শব্দে পুরো শহর কাঁপিয়ে বোমা বিস্ফোরণ হলো।কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। কিংসফোর্ড কপাল জোরে বেঁচে যান।
বোমা নিক্ষেপ করেই দুই বিপ্লবী পালায়।পলাতক দুই বিপ্লবী পরদিন সকালে ওয়াইসি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই তড়িঘড়ি করে নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করলেন।সেদিন পুলিশবেষ্টিত ক্ষুদিরামকে একনজর দেখতে হাজারো লোক ভিড় জমাল ওয়াইসি রেলস্টেশনে। উৎসুক জনতার উদ্দেশে ক্ষুদিরামের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হলো বজ্রনিনাদ বন্দেমাতরম…। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই তরুণ বিপ্লবীকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার অনেকটা বিপাকেই পড়ে যায়। যত দিন যাচ্ছিল, সারা ভারতে ক্ষুদিরামকে নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হচ্ছিল। ব্রিটিশের মাথা থেকে সেই বোঝা নামে, যেদিন মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ ধারা মোতাবেক ক্ষুদিরামের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ক্ষুদিরামকে তাঁরা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সেই রায় কার্যকর করেছিল ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ।
আজ ক্ষুদিরাম নেই, কিন্তু সারা ভারতের মানুষের হূদয়ে ক্ষুদিরাম যে স্বাধীনতার অগ্নিমশাল জ্বালিয়েছিল, শত চেষ্টা করেও ব্রিটিশ সরকার নেভাতে পারেনি। এখানেই ক্ষুদিরামের সার্থকতা। তাঁর মৃত্যুর এত বছর পর এসেও যখন হাটে-মাঠে-ঘাটে পথ চলতে প্রায়ই বাউল, সাধক ও কবিয়ালদের কণ্ঠে আচমকা শুনতে পাই, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’, তখন মনে হয়, দেশের জন্য ক্ষুদিরামের এ আত্মদান বৃথা যায়নি। ক্ষুদিরামদের মতন বিপ্লবীদের কারণেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ একদিন ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।সে জন্য ক্ষুদিরামের মৃত্যু নেই। দেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হূদয়ে ক্ষুদিরাম বেঁচে থাকবেন অনাদিকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *