শতাব্দীর অতন্দ্র প্রহরী- অন্নদাশঙ্কর রায়।

nurubrl-1458026700-9f784ea_xlargeউনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁ ঐতিহ্যের শেষ বুদ্ধিজীবী অন্নদাশঙ্কর ১৯০৪ সালে ১৫ই মার্চ জন্মগ্রহন করেন।

১৯২৫ সালে তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৮২৭ সালে এমএ  পড়াকালে তিনি আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে চলে যান। লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ’, ‘কিংস কলেজ’, ‘লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস’, ‘লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ’-এ পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে ১৯২৯ সালে অন্নদাশঙ্কর রায় যোগ দেন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে অ্যাসিসট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে। ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছরের মধ্যে নয় বছর পশ্চিমবঙ্গে এবং নয় বছর পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। অবিভক্ত বঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, নদীয়া, ত্রিপুরা, মেদিনীপুর, হুগলি এবং হাওড়ায় তিনি নিযুক্ত ছিলেন কখনো শাসন বিভাগে, কখনো বিচার বিভাগে যথাক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ হিসেবে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি উচ্চতর পর্যায়ের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (আইএএস) সদস্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ও বিচার বিভাগে কাজ করেন। ১৯৫০সালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় পদত্যাগপত্র করেন।

চাকরি ছাড়ার পর অন্নদাশঙ্কর শান্তিনিকেতনে বসবাস করা শুরু করেন। তার শান্তিনিকেতনের বাড়িতে নিয়মিত ‘সাহিত্য সভা’ বসতো। এই সভায় বহু দেশি-বিদেশি পণ্ডিত অতিথি হয়ে আসতেন। নানা দেশের নানা ভাষার মানুষের সমাগমে তৈরি হতো এক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অন্নদাশঙ্কর রায় মাত্র ২০ বছর বয়সে ওড়িয়া সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর প্রথম কবিতা ওড়িয়া ভাষায়। বাংলা, ইংরেজি, ওড়িয়া, সংস্কৃত, হিন্দি-সব ভাষায় পারদর্শী হলেও বাংলাকেই তিনি সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।

প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা অন্নদাশঙ্করকে প্রভাবিত করে।সেযুগে সবুজপত্র পত্রিকার দুই প্রধান লেখক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরী। বাংলা ভাষায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনার বিষয় ছিল নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা, যা ভারতী পত্রিকায় ছাপা হয়।  এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটক নিয়ে একটি  প্রবন্ধ লেখেন, যা রবীন্দ্রনাথকেও নাড়া দিয়েছিল।  তবে তাঁর ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ‘পথে প্রবাসে’ ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমেই তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান করে নেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত দুই বছর উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘পথে প্রবাসে’। একই সময় মৌচাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ইউরোপের চিঠি’।

অন্নদাশঙ্কর রায় কোনো গোষ্ঠীভুক্ত লেখক ছিলেন না। তবে সম্পাদকদের অনুরোধে কল্লোল, কালিকলম, পরিচয় প্রভৃতি পত্রিকার জন্য লেখেন। বেশ কিছু লেখা। দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রায় সত্তর বছর ধরে প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, ছড়া, কবিতা, নাটক, পত্রসাহিত্য, আত্মজীবনীমূলক রচনা প্রভৃতি লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা বাংলায় ১২৩টি, ইংরেজিতে ৯টি এবং ওড়িয়া ভাষায় ৩টি। বহুমুখী ভাবানা ও বিষয়বৈচিত্র তাঁর রচনাকে সমৃদ্ধ করেছে।

অন্নদাশঙ্কর ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সার্থক উত্তরসূরি। তবে রবীন্দ্রযুগের লেখক হলেও তাঁর স্টাইল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তা, আদর্শবাদ ও শুভবুদ্ধির প্রতীক। দেশভাগ, দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল আজীবন সোচ্চার।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাংলা ছড়া লেখা শুরু হয় প্রথমদিকে  রবীন্দ্রনাথ এবং পরে বুদ্ধদেব বসুর অনুরোধে। সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় থেকে শুরু করে প্রাণীজগতের ক্ষুদ্র জীবজন্তুও স্থান পেয়েছে তাঁর ছড়ায়। তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছড়া : ‘খোকা ও খুকু’। দেশবিভাগের তিব্র বেদনা তীর্যকভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই ছড়ায়- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে/খুকুর ’পরে রাগ করো,/তোমরা যে সব বুড়ো খোকা/ভারত ভেঙে ভাগ করো। তার বেলা?’ তাঁর বেশ কিছু ছড়া প্রতিষ্ঠিত সুরকারদের সুরে জনপ্রিয় গানে রুপ পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের বিদুষী তরুণী অ্যালিস ভার্জিনিয়া ওর্নডর্ফ ভারতে আসেন। অ্যালিসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে অন্নদাশঙ্করের। পরে পরিণয়ে আবদ্ধ হন তাঁরা।রবীন্দ্রনাথ অ্যালিসের নতুন নামকরণ করেন ‘লীলা রায়’। অন্নদাশঙ্করের জীবনে লীলা রায়ের প্রভাব ব্যাপক। বহু ভাষায় পারদর্শী লীলা রায় সাহিত্যিক এবং অনুবাদক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন।

অন্নদাশঙ্কর রায় ছিলেন সাহিত্য একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ফেলো। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির জন্মকাল ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি ছিলেন এর আজীবন সভাপতি ও পথিকৃৎ। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পুরস্কারে ভূষিত করে ১৯৭৯ সালে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করে দেশিকোত্তম সম্মান। বর্ধমান, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬২), আনন্দ পুরস্কার (দুইবার-১৯৮৩, ১৯৯৪), বিদ্যাসাগর পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৫), রবীন্দ্র পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার, বাংলাদেশের জেবুন্নিসা পুরস্কার। ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর কলকাতায় অন্তিমশ্বাস ত্যাগ করেন এই বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *