মন্দির-মসজিদ-আদালত,ফিরে দেখা।

unnamedঅযোধ্যা রায়ের পর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছে। সাধারনভাবে কিছু মানুষের অভ্যাস থাকে ঘোলা জলে মাছ ধরার এবং তারা সেটা ধরছেনও। এবার, অযোধ্যা রায়ের দিনগুলি অতীত হওয়ার পর যদি আমরা একটু ফিরে দেখতে বসি, যে রায় থেকে কি হোল? সাধারন মানুষ কি পেলেন? দেশের ইতিহাস বা ইতিহাস চর্চা কি পেল? সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি কি পেল? কেন অর্থনীতির কথা আসছে ! সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। একেবারে ভুমিকায় বলে রাখি,এমন প্রশ্নও উঠছে যদিও সরাসরি রায়ের বিরোধিতা না করে,মন্দির-মসজিদ তৈরি হলে কি দেশের মানুষ খেতে পাবে। অতন্ত্য সঙ্গত প্রশ্ন। তাই সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আবশ্যিক। অযোধ্যা রায় বা অযোধ্যা মামলা কোনটাই দেশের মানুষের খেতে পাওয়া বা দেশের অর্থনীতি পরিচালনা প্রশ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। কিন্তু প্রশ্ন যেহেতু উঠছে তাই এই প্রসঙ্গে মতামত স্পষ্ট করাটা খুবই প্রয়োজন।

প্রথমত রায়ের প্রসঙ্গে আসি, অযোধ্যা রায়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটা জিনিস স্পষ্ট করে দিয়েছে। (এক) অযোধ্যার ঐ বিতর্কিত জমি,যেখানে বাবরি মসজিদ গড়ে উঠেছিল যা ফাঁকা জমিতে গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ মসজিদ গড়ে ওঠার আগে সেখানে একটি স্থাপত্য ছিল। সেই স্থাপত্য যে নিশ্চিত ভাবে হিন্দু স্থাপত্য একথা সুপ্রিম কোর্ট বলতে পারেনি। কারন সুপ্রিম কোর্ট একথা নিজের বিচার বিবেচনায় বলেনি। সুপ্রিম কোর্ট যা বলেছে তার সবটাই আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার খোঁড়াখুঁড়ি অর্থাৎ প্রত্নতাত্ত্বিক  অনুসন্ধানের পর। এবং সেই অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত যা কিছু বস্তু তার বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, পুরাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সেই পুরাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পর সেখান থেকে এএসআই যে সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে তার পরিপেক্ষিতে দাঁড়িয়েই সুপ্রিম কোর্ট তার রায় দিয়েছে।

এএসআই’র সিদ্ধান্ত ছিল, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ যেখানে ছিল,বাবরি মসজিদ যে কাঠামোর ওপর গড়ে উঠেছে সেই কাঠামোটি মুসলিম কাঠামো নয়। বা অনইসলামিক একটি কাঠামো। এখন অনইসলামিক কাঠামো বলতে কি বোঝাতে চাওয়া হোল। কেন নির্দিষ্টভাবে হিন্দু কাঠামো বলা হোল না। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাত সত্যিই, ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্ম বলে আদৌ কোনও ধর্মের অস্তিত্ব কোনদিন ছিলনা। হিন্দু নামটিও বিদেশ থেকে আগত। তার সভ্যতা, সংস্কৃতির সঙ্গে হিন্দু শব্দটিকে যুক্ত করা আসলে ঠিকঠাকভাবে সিন্দু শব্দটিকে সঠিক উচ্চারন করতে না পারা একদল বিদেশীর দান বলা যেতে পারে।

যাই হোক, পৃথিবীর ভিতরে একটি নির্দিষ্ট জনসম্প্রদায়ের মানুষ যারা একটি নির্দিষ্ট জীবনযাত্রা মেনে চলেন তার সঙ্গে ধর্মীয় আচরনবিধির যোগাযোগ খুবই সামান্য। কারন তামিলনাড়ুর ব্রাম্ভনের কাছে যা শুচি বা পবিত্র বলাবাহুল্য তা পশ্চিমবাংলার ব্রাম্ভনের কাছে শুচি বা পবিত্র নয়। উত্তর ভারতের ব্রাম্ভন যাকে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করে পশ্চিম ভারতের ব্রাম্ভনের কাছে সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণই নয়। ফলে গোটা দেশজুড়ে হিন্দুদের একটি আলাদা আইডেন্টিটি, হিন্দু বলতে একটি নির্দিষ্ট ধর্ম যদি বোঝায়, তবে সেই ধর্মের কিছু নির্দিষ্ট রীতিনীতি এমনটা কিন্তু নেই।

তাহলে কি আছে হিন্দুদের? সাধারণভাবে একটি ধর্ম হিসাবে গড়ে উঠতে গেলে যা লাগে, যা আবশ্যিক, মানুষকে যা দিতেই হয় সেই চারটি জিনিস হিন্দুদের ক্ষেত্রে বহুনিষ্ঠ। যেমন- জন্ম সংস্কার,অর্থাৎ জন্মের পরে নির্দিষ্ট কিছুদিন আঁতুড়ের নিয়ম। তারপর ছেলে ও মেয়ে নির্বিশেষে অন্নপ্রাশন বা মুখেভাত ইত্যাদি। এটি হিন্দুদের নিয়ম এবং সেই নিয়ম কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, গুজরাত থেকে মনিপুর পর্যন্ত সমস্থ হিন্দুর ক্ষেত্রে একই রকমভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ হিন্দুদের একটি বহুনিষ্ঠ জন্ম সংস্কার আছে।

একইভাবে হিন্দুদের একটি বহুনিষ্ঠ বিবাহ সংস্কারও আছে। এবং হিন্দুদের একটি বহুনিষ্ঠ মৃত্যু সংস্কারও আছে। শ্রাদ্ধাদির বিধি এবং সেখানে প্রচলিত অশৌচের যে নিয়মকানুন তা দেশ, পরিবেশ, আবহাওয়া ও লোকাচার ভেদে কিছু তফাৎ হয়। সেটা নিতান্তই বৈচিত্রগত তফাৎ। কিন্তু ধর্মীয়ভাবে এই চারটি মুল সংস্কারে হিন্দুরা একমত এবং মোটের ওপরে এই চারটি সংস্কারে সমস্থ হিন্দুই একইরকম ভাবে পালন করে। এর সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে আরও একটি সংস্কার যুক্ত ছিল,সেটা উপনয়ন সংস্কার,যা বর্তমানে পৌরহিত্যের দাপাদাপিতে শুধুমাত্র ব্রাম্ভ্রনদের মধ্যে এসে ঠেকেছে কিন্তু যা আগে হিন্দুদের সমস্থ বর্ণ অর্থাৎ চতুরাশ্রমের বাকি তিনটি বর্ণ, বৈশ্য, শূদ্র ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে সমানভাবে প্রচলিত ছিল।

এই চারটি সংস্কারের কথা যদি মাথায় রাখি তাহলে গোটা ভারতবর্ষের হিন্দুরা যাকে স্বাভাবিকভাবে পবিত্র,শুচি ও কল্যাণকর চিহ্ন বলে মনে করে থাকেন, মজার বিষয় হোল ভারতবর্ষের মাটি থেকে উদ্ভাবিত এবং প্রতিষ্ঠিত বাকি দুটি ধর্ম,বৌদ্ধ এবং জৈন তারাও কিন্তু সেই সংস্কারগুলিকে, সেই চিহ্নগুলিকে শুভ মনে করে থাকেন। এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো হিন্দু, জৈন এবং বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে বিবাহ, জন্ম এবং মৃত্যু সংস্কারের কোন তফাৎ নেই। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই মৃত্যু পর অগ্নিসংস্কার আছে। বিবাহের ক্ষেত্রে মুল সুর মুলত একই জায়গায় বাঁধা। এরা কেউ একাধিক বিবাহে বিশ্বাস করে না। দ্বিতীয় পত্নি বা স্বামী গ্রহন, বৈধব্য ছাড়া এবং নিতান্ত প্রয়োজনে বিবাহ বিচ্ছেদ ছাড়া স্বিকৃত নয়। জন্ম সংস্কারের ক্ষেত্রেও তার শুভাশুভ বিচার এবং অন্নপ্রাশন তিনটি ধর্মের ক্ষেত্রে একইরকম ভাবে প্রচলিত।

ঠিক এখানে একটি মজার বিষয় হল, হিন্দুদের কাছে পদ্মফুল বা কমল চিহ্ন যেমন পবিত্র একইরকম ভাবে পবিত্র বৌদ্ধদের কাছে। বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে তার বর্ণনা রয়েছে। ধর্মগ্রন্থে যে চারটে স্বেত হস্তির কথা বলা হচ্ছে সেই স্বেত হস্তি আবার হিন্দুদের কাছেও পবিত্র চিহ্ন। একই রকম কথা জৈনদের ক্ষেত্রেও খাটে। শুধু পবিত্র চিহ্ন হিসেবে স্বেত হস্তি, সাদা পদ্ম,তরঙ্গায়িত জলরাশি, ওঁ চিনহের ব্যবহার, এগুলোই নয় এছাড়াও আরও অনেককিছু বিষয় আছে। যেমন সরস্বতীর প্রশ্ন।হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন তিনটি ধর্মের ক্ষেত্রেই দেবী সরস্বতীর উপস্থিতি রয়েছে। শুনতে খুব অবাক লাগলেও, বৌদ্ধ ধর্মের মহাজানির মতে ও পথে অনেক পরে হলেও লক্ষ্মী এবং গনেশের আবির্ভাব ঘটে। হুবহু হিন্দু ধর্মের মা দুর্গার সঙ্গে যেভাবে গনেশ ও লক্ষ্মীকে দেখা যায় ঠিক সে রকম ভাবে না হলেও, তারা আছেন। সরস্বতী কথাও বৌদ্ধ এবং জৈনদের মধ্যে দেখা যায়। লক্ষ্মী, গনেশ এবং সরস্বতী অর্থাৎ শুধুমাত্র চিহ্ন নয়, দেবদেবীরাও পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে বহুনিষ্ঠ। দুর্গা বা কালী মুর্তির মতো মুর্তি সরাসরি বৌদ্ধ ও জৈন ধরমে না থাকলেও বৌদ্ধ ও জৈন তন্ত্রে এমন অনেক সাধনা রয়েছে যা হিন্দু তান্ত্রিক সাধনার কাছাকাছি যায় বা সাজুস্য আছে।

এখন এতো প্রসঙ্গের অবতারনা কেন? একটাই কারনে। যে উপাসনা স্থলটি বা স্থাপত্যটি বাবরি মসজিদের নিচে আবিস্কার করলো প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এবং তার প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলো তা যে নিশ্চিতভাবে হিন্দু বলা যাচ্ছে না তার কারন ব্যাখ্যা করার জন্য এতো কথার অবতারনা। নিশ্চিতভাবে ভারতীয় কিন্তু হিন্দু নয়। এর ব্যাখ্যা হোল হিন্দু, বৌদ্ধ বা জৈন  যে কোন ধরনের স্থাপত্য হতে পারে কিন্তু  অনইসলামিক। অর্থাৎ ভারতবর্ষের মাটি থেকে উদ্ভূত কোন একটি ধর্ম, সেই ধর্মের পবিত্র চিহ্ন তা অন্য ধর্মগুলির সঙ্গেও যেহেতু সাধারন বা বহুনিষ্ঠ তাই নিশ্চিতভাবে এটি হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ স্থাপত্য বা বৌদ্ধ কোন স্তূপ বা জৈন কোন স্থাপত্য একথা জোর দিয়ে বলা না গেলেও, নিশ্চিতভাবে এই চিহ্নগুলি প্রমান করে দিচ্ছে যে তা অভারতীয় কোন ধর্ম বা ভারতের বাইরে থেকে আসা কোন ধর্ম বা ধর্মাবলম্বীদের তৈরি নয়। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে বাবরি মসজিদ ইসলাম বহির্ভূত কোন একটি ধর্মীয় স্থাপত্যকে ভেঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল।

এরপরে নিশ্চিতভাবে আর কারও মনে কোন প্রশ্ন থাকা উচিৎ নয় যে ঐ মসজিদের ভবিষ্যৎ কি হতে পারে। যা হতে পারে ঠিক সেই রায়টিই সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছে। যে ধর্মেরই স্থান ওটি হয়ে থাকুক না কেন ওটা যে মসজিদের স্থান নয় এবং মুসলিমরা ঐ জমির অধিকারে স্বাভাবিকভাবে ছিলেন না সেটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেই সুপ্রিম কোর্ট ঐ জমিটি মুসলিমদের দখলিস্বত্ব ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। এই দখলিস্বত্ব স্বিকার করে নিলেও সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু একইসঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, এই  দখলিস্বত্বর কোন আইনি প্রমান বা স্বীকৃতি মুসলিমরা দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ কি বাবরি অ্যাকসান কমিটি, কি সুন্নি ওয়াকাফ বোর্ড, কারোর কাছেই  দখলিস্বত্বর প্রমান ছিল না। এবং তার যে কোন পুরাতাত্ত্বিক ভিত্তিও ছিল না সেটাও ইতিমধ্যে প্রমানিত। অর্থাৎ বাবরি মসজিদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের যে রায়, তা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।

এখন তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে বৌদ্ধ বা জৈনদের না ফিরিয়ে ঐ জমি হিন্দুদের কেন ফিরিয়ে দেওয়া হোল? বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন তত্ত্বে এবং জৈন ধর্ম ও দর্শন তত্ত্বেও অয্যোধ্যা সম্পর্কে উল্লেখ খুব কম। নির্দিষ্টভাবে শতকের বা অবদান সাহিত্যের একটি বা দুটি জাতকের গল্পে ‘সাকেত’ নগরীর বর্ণনা রয়েছে এবং সরাসরি গৌতম বুদ্ধের জীবনের ঘটনার প্রসঙ্গেও ‘সাকেত’ নগরীর কিছু কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এই প্রাচীন সাকেত নগরী, পরবর্তীকালে অযোধ্যা বা সাকেত নগরী যে একই নগর বা খুব কাছাকাছি অবস্থিত দুটি শহর যা পরস্পরকে পরবর্তীকালে সম্পূর্ণভাবে গিলে খেয়ে নেয়, নগরায়নের জায়গা থেকে। এ নিয়ে কোন সন্দেহ বর্তমানকালে ইতিহাসিক বা পুরাতাত্ত্বিকদের নেই। কিন্তু এর বাইরে সাকেত যে বৌদ্ধদের জন্য একটি পবিত্র স্থান, সাকেতে বৌদ্ধদের কোন একটি পবিত্র স্তূপ রয়েছে বা গৌতম বুদ্ধের শরীরের কোন অংশ নিয়ে তৈরি স্তূপ বা চৈত্য রয়েছে বা গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের সঙ্গে যুক্ত এমন কেউ, যার স্মৃতিতে ওখানে সৌধ রয়েছে, এমন কোন দাবি আজ পর্যন্ত বৌদ্ধরা করেনি।

এই দীর্ঘ বাবরি মামলায়, বাবরি অ্যাকসান কমিটি ও সুন্নি ওয়াকাফ বোর্ড,যখন সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে মামলার শুনানি চলাকালিন বারবার ধরা পরে যাচ্ছিল যে একটি অনইসলামিক স্থাপত্যের ওপর বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছে। এবং এটা রীতিমত প্রমানিত হয়েছে এএসআই’র প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর। তখন হটাত হটাৎ করে এর মধ্যে বৌদ্ধদের নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। হতেই পারে এটা কোন বৌদ্ধ স্তূপ বা চৈত্য ছিল। কেন হতে পারে তা আমরা ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করেছি। সেক্ষেত্রেও যেহেতু ঐ স্তূপ বা চৈত্যের প্রতি বৌদ্ধদের কোন দাবি নেই তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় গৌতম বুদ্ধের অনুগামি বা প্রচারকদের কাছে অযোধ্যার এই জায়গাটি যেটিকে রাম জন্মভুমি বলে হিন্দুরা দাবি করেন তা একই রকমভাবে পবিত্র, প্রয়োজনীয় এবং ধর্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত একটি পবিত্র তীর্থস্থান। সেকারনেই তাদের পক্ষ থেকে কোন দাবি নেই।

জৈনরা এই ঘটনার বা এই রায়ের বা মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে ধারেকাছেও কোনোদিন দেখা যায়নি। যেহেতু দাবিদার মাত্র একটিই পক্ষ এবং তারা তাদের দাবি পেষ করেছিল তাদের ধর্মস্থান ফিরে পাওয়ার অধিকারে জায়গা থেকে, সুতরাং রায় তাদের পক্ষেই যাবে এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। যদিও এএসআই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী হুবুহু সরাসরি হিন্দুদের মন্দির ছিল বা স্থাপত্য ছিল একথা সুপ্রিম কোর্ট বলতে পারছে না। কিন্তু এর মধ্যে কোন দুর্বলতা খোঁজা অর্থহীন। তার কারন বাকি আরও যে দুটি ধর্মের ধর্মীয় স্থল,উপাসনা স্থল বা স্থাপত্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তারা কোনোদিন কোন দাবিই পেষ করেন নি। ফলে একমাত্র দাবীদারকে এই উপাসনা স্থলটি ফিরিয়ে দেওয়া হোল।

এই রায়ের পরবর্তী অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ, কেন পাঁচ একর জমি মুসলিমদের দেওয়া হোল এবং সেই জমি কোথায় দেওয়া হবে ইত্যাদি। জমি কোথায় দেওয়া হবে তার দায় ও দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণভাবে উত্তরপ্রদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ন্যাস্ত করেছে।জমি এরাই খুঁজে বার করবে। কিন্তু যে কথা উঠছে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড বা বাবরি অ্যাকসান বোর্ডের কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে মসজিদ যদি নাই থেকে থাকে তাহলে কিসের ভিত্তিতে পাঁচ একর জমি দেওয়া হচ্ছে। এটা কি সান্তনা পুরষ্কার? একেবারেই নয়। মসজিদ অবশ্যই ছিল না প্রাথমিকভাবে। কিন্তু যে স্থাপত্যকে ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল, সেই মসজিদে যারা নামাজ পড়তে আসতেন যার প্রমান সুপ্রিম কোর্ট বার বার স্বিকার করেছে, সেই নামাজীদের বিশ্বাস কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ইসলামিক ছিল। মসজিদের নিচে যে অনইসলামিক স্থাপত্য চাপা পড়ে রয়েছে সেটা জেনে তো তারা এই মসজিদে নামাজ পড়তেন না। তিনশো বছর ধরে একই লোক নিশ্চয় আজান দেন নি। তাহলে বিগত তিনশো বছরে কতগুলো প্রজন্ম পার হয়েছে সেই হিসাব সকলের কাছেই স্পষ্ট। তাই, সেই জায়গা থেকে তিনশো, সাড়ে তিনশো বা চারশো বছরের এই ইতিহাসে যে সমস্থ নামাজিরা রয়েছেন ও ইমামরা আজান দিয়েছেন, তাদের ভক্তি ও বিস্বাসে কোন খামতি ছিল না। এই বিশ্বাসে খামতি না থাকা এবং নিজের উপাসনা স্থলকে পবিত্র মনে করে উপাসনা করে যাওয়া মানুষগুলির বিশ্বাসকে দাম দেওয়ার জন্য ভারতবর্ষের সংবিধান এবং আইন একই রকম ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাবরি মসজিদ যদি ওখানে না থেকে থাকে অথবা বাবরি মসজিদ যদি ওখানে অন্য একটি স্থাপত্যের ওপর তৈরি হয়ে থাকে তাহলে নির্দিষ্ট তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে সেই মসজিদের জমি দাবিদার দুই পক্ষের মধ্যে কোন একটি পক্ষকে ফিরিয়ে দেওয়া যেমন সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব। তেমনই এই কাজটি শুধুমাত্রই সুপ্রিম কোর্টের কাজ এবং তার আগে কেউ কোন স্থাপত্য ভেঙ্গে ফেলতে পারেন না একথাও আমাদের স্বিকার করতে হবে। যদি সেটা কেউ ভেঙ্গে ফেলে থাকেন তাহলে তিনি আইনের বাইরে গিয়ে করেছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। সেকাজের জন্য যে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য হয় বিশ্বাসীদের, সেই ক্ষতিপূরণের ‘রায়’ই মুসলিম পক্ষ পেয়েছে। উপাসনা স্থল গড়ে তোলার জন্য পাঁচ একর জমির ব্যবস্থা কোর্ট করে দিয়েছে। খুব ভালো হয়, যে উপাসনা স্থল মুসলিমরা আগামী দিনে গড়ে তুলবেন এবং সেই গড়ে তোলার কাজে যদি হিন্দুরা সমানভাবে হাত লাগান। তাতে ভারতবর্ষের সংবিধানের যে মর্মার্থ ও আত্মা তা শুপ্রতিষ্ঠিত হবে। ঠিক যেমনভাবে আজ থেকে সাড়ে চারশো বা পাঁচশো বছর আগে পর্তুগাল থেকে আগত এক ধর্ম যাজক কে ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকুলে দেশের প্রথম গির্জাটি তৈরি করার জন্য এক হিন্দু রাজা জমি, অর্থ ও লোকবল দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ভারতবর্ষের এই ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র যেটাকে একদল নাস্তিকতার চরিত্র বলে কটাক্ষ করে, আসলে তা সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের চরিত্র। সেই চরিত্র অক্ষুণ্ণ থাকবে।

এবার আসা যাক সর্ব শেষ বিষয়ে। মন্দির – মসজিদ করে কি মানুষের পেটের ভাতের জোগাড় হয়?? একেবারেই হয় না। নিশ্চিতভাবে একটি এলাকাতে মন্দির বা মসজিদ গড়ে উঠলে সেখানে কিছু মানুষের ধর্মাচারনের সুত্রে যাতায়াত বাড়ে। ধর্মাচারনের উপাচার ক্রয় বিক্রয়ের সুত্রে বেশ কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। অতিথিশালা গড়ে ওঠার সুত্রেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তাই যেদিন অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি সম্পূর্ণ হবে সেদিন বারানসির মতো এখানেও সমগ্র বিশ্ব থেকে ভক্তদের ঢল নেমে আসবে।অর্থাৎ এক বিশাল ব্যাসার্ধ জুড়ে বহুসংখ্যক মানুষের পেটের জোগাড় হবে।

তাহলে এই রায়’কে আমরা কিভাবে দেখব ভবিষ্যতের জন্য? এ রায় নরেন্দ্র মোদীর জন্য শৃঙ্খল মুক্তির রায়। ভারতবর্ষে ১৯৮৯ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদী যে দলের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রত্যেকটি নির্বাচনে লড়ে এসেছে, মূলত চারটি দাবির ওপর ভিত্তি করে- রাম মন্দির নির্মাণ, ইউনিফর্ম সিভিল কোর্ট, তিন তালাক ও জম্মু কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ। তিনটি ইতিমধ্যেই কোর্টের মাধ্যমে প্রাপ্ত। এরপরে সঙ্ঘ পরিবারের যে কোর অ্যাজেন্ডা, যে অ্যাজেন্ডাকে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক রুপ দেওয়ার জন্য ভারতীয় জনতা পার্টির উদ্ভব পূর্বতন জনসঙ্ঘের উত্তরসুরি হিসাবে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কাছে সেই দলের যে অঙ্গীকার তার ৭৫ শতাংশ পূর্ণ হোল। নির্বাচনী ইস্তাহারকে যদি গুরুত্ব দেওয়া হয় তাহলে তার গুরুঅংশ পূর্ণ হয়েছে বলা যায়।

বাকি থেকে গেল ইউনিফর্ম সিভিল কোর্ট, মানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। সেটিও যেকোনো দিন পূর্ণ হতে পারে। লোকসভায় একক বহুমত রয়েছে। রাজ্যসভাতেও বিল পাস করার ক্ষেত্রে দলকে এখনও কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।  তাহলে ??? ১৫২৮ সালে বাবরের সেনাপতি মীর বাকী যে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি করেছিলেন, ৪৯২ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম, বলিদান ও প্রতীক্ষার পর আজ ৫ই আগস্ট ২০২০ দুপুর ১২.১৫ মিনিটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাম মন্দির নির্মাণের ভুমি পুজো কunnamedরলেন।এই আনন্দের দিনে সমগ্র ভারত শঙ্খ ও উলুধ্বনিময়। সন্ধ্যা সাতটায় সারা ভারত সেজে উঠবে দিপ মালায়, এযেন অকাল দীপাবলি।

“জয় শ্রীরামের জয়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *