বেস্ট সেলার বই– ‘সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী’

imgrok0602_26066ডক্টর সৈয়দ মুজতবা আলী ‘সত্যপীর’, ‘রায়পিথোরা’, ‘ওমর খৈয়াম’,‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ ইত্যাদি ছদ্মনামে ‘আনন্দবাজার’, ‘দেশ’, ‘সত্যযুগ’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘বসুমতী’, ‘হিন্দুস্তান স্টান্ডার্ড’,‘মোহাম্মদী’,‘চতুরঙ্গ’, ‘মাতৃভূমি’, ‘কালান্তর’, ‘আল-ইসলাম’ পত্রিকায় প্রজ্ঞা-ঐশ্বর্য-ধারণকারী রম্য-কথকতা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর রচিত উপন্যাস , গল্প , ভ্রমণকাহিনী, কবিতা, শিশুতোষ রচনা, অভিভাষণ, অনুবাদ, প্রবন্ধ ইত্যাদির সমন্বিত রূপ ১১শ খণ্ডের ‘সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী’।তবে,‘দেশে বিদেশে’,‘জলে-ডাঙায়,‘ভবঘুরে’ , ‘বিদেশবিদেশে’‘পঞ্চতন্ত্র,‘মুসাফির,‘অবিশ্বাস্য,‘তুলনাহীনা’,‘শব্নম,’‘চাচাকাহিনী,‘দ্বন্দ্বমধুর’,‘টুনিমেম’,‘ধূপছায়া’,‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘চতুরঙ্গ’,‘দু-হারা’,‘শর্হ-ইয়ার’,‘রাজা উজীর’,‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’ ইত্যাদি গ্রন্থই রসিক পাঠকসমাজে বেশি সমাদৃত।
সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন বিশ্ববোধদীপ্ত কথক। তাঁর রচনার প্রধান গুণ অসাম্প্রদায়িকতা। তাঁর অননুকরণীয় রচনাশৈলীতে সংবেদ্য হয়েছে আড্ডার ঢঙ, হালকা মেজাজ এবং বহুদর্শিতা-সমৃদ্ধ শিল্পায়ন। তাঁর নিবিড় অনুধ্যানে সংহত হয়েছে দুঃখ-বেদনা ও অপূর্ণতার কারুকাজ।সেই কারণেই তিনি ‘লঘুচালের ভাষায় বুদ্ধিদীপ্ত রচনাশৈলীতে চমক ও শ্লেষের ব্যবহারে’ রম্যকথার সত্যায়ন ঘটিয়েছেন। রসবিশেষজ্ঞের অভিমত,‘মনীষাকে বৈঠকী রীতিতে প্রকাশ, বিদ্যা আছে অথচ বিদ্যার ভার নেই – এ যেন চন্দ্রলোকের আবহাওয়ায় ভারের লঘুভবন।মামুলি বিষয়কে তিনি রসময় করে তুলেছেন অপাপবিদ্ধ শব্দ-বাক্যবন্ধে।তার লেখনী থেকে দু একটি অংশ তুলে ধরলেই আমরা অনুমান করতে পারব।
১)আবদুর রহমানের মতো বুরুশ করার কায়দা মামুলি সায়ান্স নয়,অতি উচ্চাঙ্গের আর্ট…
সর্বশেষে মোলায়েম সিল্ক দিয়ে অতি যত্নের সঙ্গে সর্বাঙ্গ বুলিয়ে দেবে, মনে হবে দীর্ঘ
অদর্শনের পরে প্রেমিক যেন প্রিয়ার চোখে মুখে, কপালে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
২)সৃষ্টিকর্তা যখন মানুষ গড়তে প্রথম বসলেন, তখন এ-বাবদে তাঁর বিলকুল অভিজ্ঞতা ছিলো
না। প্রথম সেট বানানোর পর সেটা ‘বেক’ করার জন্য ঢোকালেন ‘বেকিংবক্সে’।যতখানি
সময় বেক করায় প্রয়োজন,তার আগেই বাক্স খোলার ফলে সেগুলো বেরুলো ‘আন্ডার বেক্ট’
সাদাসাদা অর্থাৎ….ইউরোপের লোক।পরেরবার করলেন ফের ভুল।এবারে রাখলেন
অনেক বেশী সময়।ফলে বেরুলো পুড়ে যাওয়া কালো।এরা নীগ্রো।ততক্ষণে তিনি টাইমিংটা
ঠিক বুঝে গেছেন।এবারে বেরুলো উত্তম ‘বেক’- করা সুন্দর ব্রাউন-ব্রেড।অর্থাৎ আমরা,
ইরানী,আরব জাত।

৩)বাঙালী জাতিকে তিনি রসমিশ্রিত খোঁচা দিয়েছেন।
এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণী গিয়েছেন বাজারে স্বামীর জন্মদিনের জন্য সওগাত কিনতে।
দোকানদার এটা দেখায়, সেটা শোঁকায়, এটা নাড়ে, সেটা কাড়ে, কিন্তু গরবিনী ধনীর
কিছুই আর মন:পূত হয়না।সবকিছুই তার স্বামীর ভাণ্ডারে রয়েছে।শেষটায়
দোকানদার নিরাশ হয়ে বললেন,‘তবে একখানা ভালো বই দিলে হয়না?’ গরবিনী নাসিকা
কুঞ্চিত করে বললেন,‘সেও তো ওঁর একখানা রয়েছে।

৪)কবিতা,কাব্য-কাহিনী-রচনাতেও রসবেত্তার ভূমিকায়।প্রাচীন লোকবাংলার পুঁথি,ভনিতা ও বন্দনার রসছন্দিত ঢঙ তিনি তাঁর কাব্যবল্লরীতে সুস্থিত করেছেন।
কোন্ দেবে পূজা করি কোন্ শীর্নী ধরি ?
গণপতি, মোলা-আলী , ধূর্জটি, শ্রীহরি ?
মুসকিল্-আসান্ আর মুর্শীদ মস্তান
কোম্পানী কি মহারানী, ইংরেজ, শয়তান ?
হিন্দুস্তান, পাকিস্তান, যেবা আছো যথা
ইস্পাহানী, ডালমিঞা – কলির দেবতা।
সবারে স্মরণ করি সিতুমিঞা ভনে
বেদরদ বেধড়ক ভয় নাহি মনে।

মুজতবা আলী ছিলেন আনন্দের উৎস।তাঁর রচনায় মেলে উদ্দাম ও স্নিগ্ধ কোমল-মধুর ব্যক্তিত্বের পরশ। মজ্জাগত রসবোধ ও অর্জিত বৈদগ্ধ্যে তিনি ছিলেন সদাদীপ্র।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *