বেস্ট সেলার বই—“সেরা সত্যজিৎ” লেখক সত্যজিৎ রায়

sera-satyajit-original-imad75u7ckfkuebhবাংলা ভাষায় একটি কথা প্রচলিত রয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথের ছেলে কখনো রবীন্দ্রনাথ হয় না। তবে কথাটি সম্ভবত সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রে খাটে না। সত্যজিৎ রায়ের খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তায় তাঁর পিতা সুকুমার রায় এবং ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকেও হার মানিয়েছে।সত্যজিৎ রায়ের সাহিত্যিক সৃজনশীলতা শুধু এই দুই অমর চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর কলমের জোরের পরিচয় পাওয়ার আরও একটি উপায় হল তাঁর ছোটগল্প সমূহ। এমনই কয়েকটি ছোট গল্পের সংকলন হল ‘সেরা সত্যজিৎ’ নামক বইটি। এতে স্থান পেয়েছে সত্যজিৎ রায়ের মোট ১০টি অসাধারণ ছোটগল্প। এগুলো হলঃ- ১। বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম ২। পটল বাবু ফিল্মস্টার ৩। খগম ৪। রতনবাবু আর সেই লোকটি ৫। ভক্ত ৬। অসমঞ্জবাবুর কুকুর ৭। ক্লাস ফ্রেন্ড ৮। বৃহচ্চচঞ্চু ৯। লখনৌর ডুয়েল ১০। তারিণীখুড়ো ও বেতাল বইটি পড়লেই পাঠক সত্যজিৎ রায়ের অসাধারণ কল্পনাশক্তি ও আধিভৌতিক ব্যাপার এ কৌতূহল সম্পর্কে জানতে পারবেন। আধিভৌতিক ব্যাপারে কৌতূহল এর ফলাফলই সম্ভবত সংকলনে বাস্তব ঘটনার উপর অবলম্বন করে লেখা গল্পের সংখ্যা মাত্র ৪টি। এখন আসা যাক ছোটগল্প গুলো কেমন, সেই ব্যাপারে। ১। বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রমঃ এই গল্পের প্রধান চরিত্র হলেন বিপিন চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক। এক অফিসের কর্মকর্তা। নিরীহ, নির্বিরোধী মানুষ, তবে বেশ স্বার্থপর। অন্যের দুঃখে-কষ্টে মন তেমন ব্যাথিত হয় না। এমনিতে পরিষ্কার মাথার মানুষ। সেই বিপিন চৌধুরীই একদিন অফিস ফেরত হয়ে নিউমার্কেটে বই কিনছিলেন। সেই সময় আচমকা এক অপরিচিত আগন্তুকের দেখা মেলে। আগন্তুক, তাঁকে ১৯৫৮ সালের এক রাঁচি ভ্রমণের কথা বলে। সেই ভ্রমণেই নাকি আগন্তুকের সাথে দেখা মেলে বিপিন চৌধুরীর। কিন্তু আশ্চর্যের বিশয় হলো, বিপিন চৌধুরীর সেই ভ্রমণের কোন স্মৃতিই মনে নেই। এমনকি তিনি কোনোদিন রাঁচি গিয়েছেন কিনা তাও স্মরণ করতে পারছেন না। এই গল্পের মাধ্যমেই পাঠকের পরিচয় ঘটবে সত্যজিৎ রায়ের অপূর্ব গদ্যশৈলীর সাথে। তবে, এই গল্পের শেষেই পাঠক একটি চমক খাবেন। ২। পটলবাবু ফিল্মস্টারঃ- গল্পের নাম থেকেই গল্প সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়। গল্পটি পটলবাবু নামক এক মধ্যবিত্ত ভদ্রলোককে নিয়ে। এক কালে পাড়ার থিয়েটারে অভিনয় করতেন। বয়স হওয়ার কারণে পরে তা ছেড়ে দেন। তবে জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে হঠাৎ করেই সুযোগ আসে একটি ফিল্মে অভিনয় করার। আমাদের সমাজের এই সাধারণ ঘটনা বা নিজস্ব বোধকে সুনিপুণ শিল্পীর মত সত্যজিৎ রায় কলমের আঁচড়ে এঁকে দেন বইয়ের ক্যানভাসে। গল্পটি শেষ করার পরপরই পাঠক জীবনটাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখবেন। ৩) খগমঃ- ‘খগম’ গল্পটিকে বলা যায়, প্রাচীন হিন্দু মিথ বা রূপকথার আধুনিক সংস্করণ। ধূর্জটিবাবু নামক এক ভদ্রলোককে নিয়ে আবর্তিত হয় এর ঘটনা প্রবাহ।সত্যজিৎ রায়ের অসাধারন গল্প বলার ক্ষমতায় পড়ার সময় পাঠকরা প্রতি মুহূর্তেই গা শিউরে উঠবে। ৪) রতনবাবু আর সেই লোকটিঃ– গল্পটিকে বলা যায়, সায়েন্স ফিকশন এবং ভৌতিকতার সংমিশ্রণ। গল্পের মূল চরিত্র হল রতনবাবু নামে এক ভদ্রলোক। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় বেড়াতে ভালবাসেন। সিনিতে বেড়াতে যাওয়ার সময় তার সাথে পরিচয় ঘটে মণিলালবাবু নামে এক ভদ্রলোকের। অবিশ্বাস্য ভাবে রতনবাবুর চেহারা, স্বভাব এবং ব্যক্তিজীবনের সাথে হুবহু মিল রয়েছে মণিলালবাবুর। ঠিক যেন একজন আরেকজনের কার্বন কপি। পাঠক নিশ্চিতভাবেই রহস্যের গন্ধ পেয়ে যাবেন এ গল্পে। গল্পটি পড়ে আমার নিজের মনে হয়েছে, জগতের কিছু রহস্য হয়তবা পর্দার আড়ালেই থেকে যাবে। ৫) ভক্তঃ- গল্পটিকে আমার কাছে বেশ মজার বলে মনে হলেও, এই গল্পটি ‘সেরা সত্যজিৎ’ বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল গল্প বলে মনে হয়। অরূপরতন নাম লোকটির। পুরীতে বেড়াতে গিয়েছেন। হঠাৎ, তাঁর পরিচয় হয় একদল লোকের সাথে। তারা তাঁকে শিশু সাহিত্যিক অমলেশ মৌলিক ভেবে ভুল করে। তারপর নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে এগোতে থাকে গল্পের কাহিনী। ৬) অসমঞ্জবাবুর কুকুরঃ- এটি একটি সায়েন্স ফিকশনধর্মী ছোটগল্প। অসমঞ্জ নামে এক লোক রাস্তা থেকে এক ভুটানি নেড়ি কুকুর ক্রয় করেন। তবে এ কুকুর সাধারণ কুকুর নয়। কারণ তাঁর কুকুর মানুষের মত হাসতে পারে! এবং তা কিছুদিনের মধ্যেই দৃষ্টিগোচর হয় অসমঞ্জবাবুর। সারা শহরে ছড়িয়ে যায় কথাটা। শেষ পর্যন্ত অসমঞ্জবাবুর কুকুরের ভাগ্যে কি ঘটে তা জানার জন্যে পাঠকের এই গল্পটি পড়তে হবে। গল্প শেষ করার পরে বাস্তবিকই সত্যজিৎ রায়ের কল্পনাশক্তির প্রশংসা না করে পারা যায় না। ৭) ক্লাস ফ্রেন্ডঃ- আমাদের সমাজে নিজেদের মানসিকতার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি এই গল্পটি। স্কুল জীবনের দুই বন্ধুর পরিণত বয়সের কাহিনী এটি। ‘সেরা সত্যজিৎ’ গ্রন্থের সেরা গল্প কোনটি? নির্দ্বিধায় বলা যায় এই গল্পটি।নিজের বিবেককে নাড়া দেয়ার মত গল্প। ৮) বৃহচ্চঞ্চুঃ- ঠিক যেন জুরাসিক যুগের উপাখ্যান এটি। ত্রিশ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া এক দৈত্যাকৃতির পাখি নিয়ে লেখা সায়েন্স ফিকশন ধর্মী গল্প। তুলসীপ্রসাদ নামে এক লোক জঙ্গলে ঘুরতে গিতে হঠাৎ পেয়ে যান পাখিটির বাচ্চা। পোষ মানানোর জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন পাখিটিকে। বড় হওয়ার সাথে সাথেই যেন শুরু হয় পাখিটার তাণ্ডব। পুরো লোকালয় পাখির ভয়ে তটস্থ। শেষ পর্যন্ত পাখির ভাগ্যে কি ঘটলো, তা জানতে পড়তে হবে এই গল্পটি। ‘প্রফেসর শঙ্কু’ লিখে সত্যজিৎ রায় নিজে যে নাম কুড়িয়েছেন, তা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন এই গল্পের মাধ্যমে। ৯) লখনৌর ডুয়েলঃ- বাস্তবতার চাদরে ঢাকা এক ভৌতিক গল্প। লখনৌ শহরের প্রায় দুইশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ডুয়েলের ঘটনার আজও নাকি প্রতি বছর পুনরাবৃত্তি ঘটে সেই একই জায়গায়। নিজের দেখা সেই অভিজ্ঞতার ঘটনা গল্পের ছলে কিশোরদের শুনিয়েছেন তারিণীখুড়ো। সত্যজিৎ রায় যে ভৌতিক গল্প রচনায় হাত পাকিয়েছেন তা বোঝা যাবে এই গল্পটি পড়ে। এই গল্পের তুলনা চলে শুধুমাত্র তাঁরই রচিত আরেক ভৌতিক গল্প ‘সাইমন’ এর সাথে। ১০। তারিণীখুড়ো ও বেতালঃ- এটিও প্রাচীন এক হিন্দু মিথের আধুনিক সংস্করণ। এই গল্পতেও পূর্বের গল্পের মত গল্পকথকের ভূমিকা পালন করেছেন তারিণীখুড়ো। যৌবনের এক ভৌতিক ঘটনার কথা শুনিয়েছেন কিশোরদের। তাঁর সাথেই পুনরাবৃত্ত হয়েছিল বিক্রমাদিত্য ও বেতালের ঘটনা। এই গল্পের একটি উক্তি বেশ মজার। ঘটনাটি হল, ভোজরাজ, তারিণীখুড়োকে জিগ্যেস করলেন, “এই যে এসব ভৌতিক কাজ কারবার করছ যে, তার প্রতি বিশ্বাস আছে তো তোমার?” তারিণীখুড়ো ঝটপট উত্তর দিলেন, “ আমার মনের সব কপাট খোলা, ভোজরাজজী আমি হাঁচি টিকটিকি ভূত-প্রেত দত্যি-দানা বেদ-বেদান্ত আইনস্টাইন-ফাইনস্টাইন সব মানি।”== হলফ করে বলতে পারি একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যাবে না। সাহিত্যে এমন  রচনার জুড়ি মেলা  ভার। এছাড়া এই বইয়ের আরেকটি আকর্ষণ হল, সত্যজিৎ রায়ের নিজ হাতে আঁকা অপূর্ব সুন্দর স্কেচ! শেষ পর্যন্ত জটায়ুর মত বলতে ইচ্ছা করে ‘জয় বাবা সত্যজিৎ রায়!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *