‘বিপ্লবী নায়ক থেকে আধ্যাত্মিক সাধক’

shriarabindaশ্রী অরবিন্দ ঘোষ, জন্মঃ- ১৫ আগস্ট, ১৮৭২

১৯০৫-৬ সালে শ্রী অরবিন্দ বরোদার রাজ কলেজে ১৫০০ টাকা মাস মাইনের সহঃ অধ্যক্ষের চাকরি ছেড়ে মাত্র ১৫০ টাকার মাইনেতে কলকাতায়  ন্যাশনাল কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে চাকুরি নেন।ঐ সময়ে ভারতের সর্বত্র বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও বয়কট আন্দোলন চলছে। ক্রমশ বয়কট আন্দোলন স্বরাজলাভের আন্দোলনে রুপ নিতে শুরু করেছে।

বারবার বরোদা-কলকাতা যাতায়াত করে শ্রী অরবিন্দের পক্ষে বিপ্লবী দলের কাজকর্ম সঠিক ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই তিনি বিপ্লবী বারীন ঘোষের সঙ্গে পত্র মারফত পরামর্শ করে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। মাতৃভূমির বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে উচ্ছেদ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।।

কলকাতায় আসার পর ৩২ নম্বর মুরারী পুকুর রোডের বাগান বাড়িতে গঠন করেন সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন- ‘অনুশীলন সমিতি’। সঙ্গে চলতে থাকে ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজ। একে একে ভাই বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, হেমচন্দ্র ঘোষ ও অবিনাশ ভট্টাচার্যের মতো বিপ্লবীরা জড় হতে শুরু করে। ধিরেধিরে ৩২ নম্বর মুরারীপুকুরের বাগানবাড়িটি হয়ে উঠে সশস্ত্র বিপ্লবীদের মূল কেন্দ্র।

ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রী অরবিন্দের বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলার যুবকরা প্রতীবাদে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। যেখানেই ইংরেজের অত্যাচার দেখছে সেখানেই তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ব্রিটিশ অত্যাচারের মাত্রা যত বাড়তে থাকল তত সশস্ত্র বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের বিষয়টি প্রবল হয়ে উঠতে লাগল। ঝামাপুকুর ও মানিকতলায় বোমা তৈরির কারখানা গড়ে উঠল। বিপ্লবের এই গোপন আয়োজন ক্রমে ক্রমে মেদিনীপুর, চন্দননগর, কৃষ্ণনগর, শ্রীহট্ট, বগুড়া, রংপুর, বরিশাল, ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়ল।

১৯০৭ সালে ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রচারের কারনে অরবিন্দ ও বিপিনচন্দ্র পাল অভিযুক্ত হন। বিপিনচন্দ্রের ছয়মাস জেল হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অরবিন্দ মুক্তি পান। ১৯০৬-১৯১০সাল পর্যন্ত তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত থেকে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী নেতা ও বিপ্লবী দলের নেপথ্য নায়কের ভুমিকা পালন করেন।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা মারা হলে রেলগাড়ির আরোহী দুজন ইউরোপীয় মহিলা নিহত হয়। এ অপরাধে ৩রা মে অরবিন্দকে গ্রেফতার করা হয়। ৯ই মে পুলিশ অস্ত্রশস্ত্র, বোমা ও অন্যান্য কাগজপত্রসহ বারীন ও তাঁর সঙ্গীদের গ্রেফতার করে। তাঁদের সকলের বিরুদ্ধে আলিপুর বোমা মামলা শুরু হয়।দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এই মামলা লড়েন। ১৯০৯ সালে ৬ই মে মামলার রায়ে সকলের শাস্তি হয়।কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাস অরবিন্দকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে সফল হন।

জেলে থাকা অবস্থায় অরবিন্দের জীবনে পরিবর্তন শুরু হয়। তিনি সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ১৯১০ সালে রাজনীতির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে সনাতন ধর্ম প্রচার ও আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য পন্ডিচেরী গমন করেন। বিপ্লবী অরবিন্দ থেকে ‘ঋষি অরবিন্দে’ পরিণত হন।

অরবিন্দ বেদ, পুরান, উপনিষদ, ষড়দর্শন প্রভৃতি হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করে প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এই গভীর জ্ঞান থেকেই গড়ে ওঠে অরবিন্দের নিজস্ব দার্শনিক চিন্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন- ‘সবকিছু ব্রহ্ম থেকে জাত এবং ব্রহ্মেই লুপ্ত হয়, এ চক্র চিরন্তন’।  ‘জীবন ও মৃত্যু একই চক্রের দুটি দিক, এটি আত্মার পুনরুজ্জীবন’। ‘বিশ্বজগতের যা শাশ্বত নীতি তাই মানবাত্মা ও নিখিল প্রকৃতির পরিণাম নির্ধারণ করে’। ‘মানুষের লক্ষ্য হলো দিব্যজীবন, যা ব্রহ্মে মিশে যায়; আত্মজ্ঞানের মাধ্যমেই সে দিব্যজীবনের সন্ধান পাওয়া যায়’।

তিনি মোট ৩৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন– Essays on the Gita, The Foundations of Indian Culture, The Life Divine (১৯৩৯), Savitri (১৯৫০), Mother India, The Age of Kalidasa, The Significance of Indian Art, Lights on Yoga, A System of National Education, The Renaissance in India, Speeches of Aurovinda। বাংলায় প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা- ভারতের নবজন্ম (১৯১৫), পন্ডিচেরীর পত্র (১৯২১), কারা কাহিনী (১৯২১), ধর্ম ও জাতীয়তা (১৯৩১), যোগ-সাধনার ভিত্তি (১৯৪২), ভারতে রাষ্ট্রনীতিক প্রতিভা ইত্যাদি।

 ৫ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে ঋষি অরবিন্দ পন্ডিচেরির আশ্রমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *