বাঙালির কৃতি সন্তান-ইতিহাসিক, স্যার যদুনাথ সরকারের আজ জন্মদিন।

jadunath

স্যার যদুনাথ সরকার ছিলেন এক কীর্তিমান মহান পুরুষ। যার চিন্তা ও কর্মময় জীবনের অনেক ইতিবৃত্ত আজ সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে ঝাপসা। মহান ইতিহাসিক, সাহিত্যপ্রেমী, সফল অনুবাদক হওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেকে নানান জনহিতকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।আজ তার জন্মদিন।

স্যার যদুনাথ সরকারের জন্ম ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর।রাজশাহী জেলার কড়চমারিয়া গ্রামে।জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ঠাকুর পরিবারের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার গুণটি তাকে দারুণভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল। বাবার মাধ্যমেই অল্প বয়সে তার পরিচয় হয়েছিল বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘Hisotry of England’ নামক গ্রন্থের সঙ্গে। রাজকুমার সরকার ছেলের হাতে প্লুটার্ক রচিত প্রাচীন গ্রিক ও রোমান নায়কদের জীবনী তুলে দিয়েছিলেন। বাবাই তার কিশোর চিত্তে ইতিহাসের নেশা জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এ দেশের কৃতী সন্তান- বাংলার গৌরব।

১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করে প্রথম শ্রেণীতে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন।তারপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ। থাকতেন ইডেন হোস্টেলে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইতিহাস ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ পাস করেন এবং ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ৯০ শতাংশ নম্বর নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ’ স্কলারশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্বর্ণপদকসহ ১০ হাজার টাকা বৃত্তি লাভ করেন।

যদুনাথ সরকারের বর্ণাঢ্য জীবন শুরু হয় অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। ১৮৯৩ সালে তিনি রিপন কলেজের ইংরেজি অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এখান থেকে পরে চলে যান মেট্রোপলিটন কলেজে। ১৮৯৮ সালে যোগদান করেন বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল এডুকেশনাল সার্ভিসে।১৯১৭ সালে যোগদান করেন কাশী হিন্দু কলেজে। যদুনাথ সরকার ১৯২৩ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানিত সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তিনি কাশী হিন্দু কলেজে অধ্যাপনা করেন।১৯২৬ সালের ৪ আগস্ট তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি হিসেবে মনোনীত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনিই প্রথম বাঙালি অধ্যাপক ভিসি ছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে ওই বছরই আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিযুক্ত হন। যদুনাথ সরকারের প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে সিআইই এবং ১৯২৯ সালে ‘নাইটহুড’ (স্যার) খেতাবে সম্মানিত করে। ১৯৩৬ ও ১৯৪৪ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে।

ইতিহাস শাস্ত্রে অসাধারণ ও প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী যদুনাথ সরকারকে ইতিহাসচর্চায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। তিনি তথ্য ও প্রামাণিক ঐতিহাসিক গবেষণা গ্রন্থ রচনার জন্য বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ভাষা ছাড়াও উর্দু, ফার্সি, মারাঠীসহ আরও কয়েকটি ভাষা শিখেছিলেন। রবীন্দ্র অনুরাগী যদুনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই কবির রচনার ইংরেজি অনুবাদ করে পাশ্চাত্য জগতের কাছে তার পরিচয় তুলে ধরেন। ১৯১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মডার্ন রিডিউ-এ রবীন্দ্রনাথের ১৭টি প্রবন্ধ ও একাধিক কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করে প্রকাশ করেন যদুনাথ সরকার। তিনি প্রথম প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগারে মীর্জা নাথান রচিত বাহরিস্তান-ই-গায়বী এর পান্ডুলিপি খুঁজে পান। পরবর্তী সময়ে তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন জার্নালে বাংলা এবং ইংরেজিতে প্রবন্ধ রচনা করেন।

যদুনাথ সরকারের মোট গ্রন্থ সংখ্যা ২৫টি। এছাড়াও ১২টি গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করেছেন। ১৯০১ সালে পাঁচটি খণ্ডে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অব ঔরঙ্গজেব’। তার রচিত অন্যান্য গ্রন্থ হলো- ১. দ্য ফল অব দ্য মুঘল এম্পায়ার; ২. শিবাজী (বাংলা); ৩. মিলিটারি হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া; ৪. দ্য রানী অব ঝাঁসী; ৫. ফেমাস ব্যাটেল্স্ অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি; ৬. শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইম; ৭. ক্রোনোলজি অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি। তার সংগৃহীত গ্রন্থ ও পান্ডুলিপি ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে।

যদুনাথ সরকার তার প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে বিরল সম্মান অর্জন করেছিলেন। ভারতবর্ষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইতিহাস রচনা ও গবেষণায় যদুনাথ সরকার পথিকৃৎ বা পথপ্রদর্শক ছিলেন।

আচার্য যদুনাথ সরকার ৮৮ বছর বয়সে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মে কলকাতায় পরলোকগমন করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *