বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী সাহিত্যিক স্বর্ণ কুমারি দেবীর- আজ জন্মদিন

Swarnakumari_Deviস্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য নারী সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই যুগের তিনি ছিলেন শিক্ষিত বাঙালী নারীসমাজের প্রথম যুগের অন্যতম প্রতিনিধি।স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫ সালের ২৮ আগস্ট কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার পরিবেশ ছিল। সঙ্গীত, নাটক ও সাহিত্যে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের সৃষ্টিশীলতা স্বর্ণকুমারী দেবীকেও স্পর্শ করেছিল। এই সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তিন ক্ষেত্রে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। তাকে সাহায্য করছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী, স্বর্ণকুমারী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ।একথা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন-স্মৃতি থেকে জানা যায়।

১৮৭৬ সালে স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথরিন মুলেনস ‘ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত’ প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম ঔপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। সেই অর্থে স্বর্ণকুমারী ছিলেন প্রথম বাঙালী নারী ঔপন্যাসিক। ‘দীপনির্বাণ’ ছিল জাতীয়তাবাদী উপন্যাস। এর পর তিনি একাধিক উপন্যাস, নাটক, কবিতা, গান ও বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করেন। ১৮৭৯ সালে স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাংলা গীতিনাট্য (অপেরা) ‘বসন্ত উৎসব’ রচনা করেন। পরবর্তীকালে এ ধারা অনুসরণ করেন রবীন্দ্রনাথ।

১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পারিবারিক পত্রিকা ‘ভারতী’ চালু করেন। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর পর ১১ বছর ওই পত্রিকা সম্পাদনা করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি এই পত্রিকার স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে কঠোর পরিশ্রম করেন। সমালোচকরা এই পত্রিকার উচ্চ প্রশংসা করেন।

স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি নিজেও সামাজিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৯ ও ১৮৯০ সালে পণ্ডিতা রামাবাই, রামাবাই রানাডে ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেন। তিনিই ছিলেন প্রথম নারী যিনি জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনাথ ও বিধবাদের সাহায্যার্থে ১৮৯৬ সালে ঠাকুরবাড়ির অন্য সদস্যদের নিয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী ‘সখীসমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠন পরিচালনা কেবলমাত্র সদস্যদের চাঁদায় সম্ভব নয় অনুভব করে বেথুন কলেজে একটি বার্ষিক মেলার আয়োজন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের দেশজ পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। ওই মেলা কলকাতার সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখনির মধ্যে রয়েছে— উপন্যাস : দীপনির্বাণ (১৮৭৬), মিবার-রাজ (১৮৭৭), ছিন্নমুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৭৯), হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৮৭), বিদ্রোহ (১৮৯০), স্নেহলতা (১৮৯২), কাহাকে (১৮৯৮), ফুলের মালা (১৮৯৫), বিচিত্রা (১৯২০), স্বপ্নবাণী (১৯২১), মিলনরাতি (১৯২৫) ও সাব্বিরের দিন রাত (১৯১২)। নাটক : বিবাহ-উৎসব (১৮৯২), রাজকন্যা ও দিব্যকমল। কাব্যগ্রন্থ : গাথা, বসন্ত উৎসব ও গীতিগুচ্ছ। বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ : পৃথিবী।

১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবীকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *