প্রচারবিমুখ বিজ্ঞান সাধক-সত্যেন বসু

og5qvজন্মঃ ১ জানুয়ারি ১৮৯৪
মৃত্যুঃ ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪

আলোর মৌলিক কণা ফোটন, হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বা আলফা পার্টিক্যল ইত্যাদি ‘বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন তত্ত্ব’ (Bose-Einstein Statistics) মেনে চলে। এ ধরণের কণাগুলো সত্যেন বসুর নামানুসারে ‘বোসন’ (Boson) নামে পরিচিত।

বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা করার ইচ্ছে সত্যেন বসুর ছোটবেলা থেকেই ছিল। এম-এস-সি’তে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পাবার পর প্রফেসর ডি এন মল্লিকের প্রসংশা পেয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ভাবলেন এবার হয়তো বিদেশ যাবার সুযোগ হবে। কিন্তু সে বছর পদার্থবিদ্যা বা গণিতের জন্য কোন বৃত্তি দেয়া হলো না। সবগুলো বৃত্তি পেলো রসায়নের শিক্ষার্থীরা।তাই আর বিদেশে যাওয়া হোল না।

কি করবেন ভেবে না পেয়ে চাকরির আবেদন করতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু এত ভালো রেজাল্ট করা ছাত্রকে কেউ সাধারণ চাকরি দিতে চান না।অগত্যা তাঁর বাবা রেলওয়ের বড় অফিসারদের ধরে চাকরির ব্যবস্থা করলেন কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ রাজী হলেন না।  গৌরীপুরের জমিদারের ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে আসামে চলে গেলেন।সেদিনের ছাত্র পরবর্তি কালে সিনেমা জগতের দিকপাল কুমার প্রমথেশ বড়ুয়া।

পাটনা কলেজে একটা দরখাস্ত পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেখানেও চাকরি হয় নি। তাঁরা জানালেন তাঁদের দরকার একজন সেকেন্ড ক্লাস এম-এস-সি। নানা স্থানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে একসময় সত্যেন্দ্রনাথ ভাবতেন ফার্স্ট ক্লাস না পেয়ে সেকেন্ড ক্লাস পেলেই বুঝি ভালো ছিল।

একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি  সত্যেন বসু , মেঘনাদ সাহা ও শৈলেন ঘোষকে ডেকে পাঠালেন। দুরুদুরু বক্ষে তিনজনেই পৌঁছলেন স্যার আশুতোষের খাস কামরায়। স্যার আশুতোষ লোকমুখে শুনেছিলেন যে এই নবীন ছাত্ররা চাইছে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয় পড়ানো হোক। তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা পড়াতে পারবি?” সত্যেন বসু উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে, যা বলবেন তা-ই যথাসাধ্য চেষ্টা করবো”। স্যার আশুতোষ সস্নেহে হেসেছিলেন।

তখন পদার্থবিজ্ঞানে নানারকম নতুন নতুন আবিষ্কার শুরু হয়েছে। বেশির ভাগই জার্মানিতে। ম্যাক্স প্ল্যাংক, আলবার্ট আইনস্টাইন, নিল্‌স বোর – এঁদের নামই শুধু শুনেছেন সত্যেন বসু। জানতে গেলে পড়তে হবে জার্মান ভাষায় লেখা বই, গবেষণাপত্র এবং আরো সব বিজ্ঞান পত্রিকা।এদের পড়াশোনার সুবিধার্থে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মাসিক ১২৫ টাকা ধার্য করলো। মেঘনাদ সাহার উপর ভার পড়লো কোয়ান্টাম থিওরি নিয়ে পড়াশোনার আর সত্যেন বসুকে পড়তে হবে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি। কিন্তু বই পাবেন কোথায়? রিলেটিভিটির কিছু ইংরেজি বই পাওয়া গেলো। শিবপুর কলেজের ইংরেজ অধ্যাপক ডঃ ব্রাউলের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে পাওয়া গেল ম্যাক্স প্ল্যাংক, লুডবিগ বোল্‌টজম্যান (Ludwig Boltzman) ও উইলহেল্‌ম বিন (Wilhelm Wien) – এর জার্মান বই। মেঘনাদ সাহা জার্মান শিখলেন এবং বইগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। কিছু প্রয়োজনীয় বই পাওয়া গেল ফরাসী ভাষায়। সত্যেন বসু ফরাসী ভাষা শিখলেন বইগুলো পড়ার জন্য।

১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সায়েন্স কলেজেই কাটলো। ১৯২০ সালে সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহা যৌথভাবে আইনস্টাইনের “থিওরি অব রিলেটিভিটি” বাংলায় অনুবাদ করেন। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বলতেন, “যারা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয়তো বিজ্ঞান জানেন না”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকেও তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের বই লিখিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে সত্যেন বসুর উৎসাহেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক বই ‘বিশ্ব পরিচয়’ লেখেন। রবীন্দ্রনাথ বইটি সত্যেন বসুকেই উৎসর্গ করেছিলেন।  এ প্রসঙ্গে সত্যেন বসু বলেন, “নোবেল পুরষ্কার লাভ করলেও আমি এতটা কৃতার্থ বোধ করতাম না”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ অপরিসর ঘরে বসে সত্যেন বসু লিখলেন “প্ল্যাঙ্কের সূত্র ও আলোক কোয়ান্টাম তত্ত্ব”। চার পৃষ্ঠার প্রবন্ধটি পাঠালেন ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান সাময়িকী ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। কিন্তু সেখানে লেখাটি প্রকাশের যোগ্য বিবেচিত হলো না। বিন্দুমাত্র না দমে গিয়ে তিনি লেখাটি পাঠিয়ে দিলেন জার্মানিতে খোদ আইনস্টাইনের কাছে। সত্যেন বসু আইনস্টাইনকে লিখলেন, “Respected Sir, I have ventured to send you the accompanying article for your perusal and opinion”।

বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সত্যেন বসুর প্রতিভাকে চিনতে ভুল করলেন না। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ‘সাইটশ্রিফ্‌ট ফ্যুর ফিজিক’ (Zeits Fur Physik) জার্নালে নিজের মন্তব্য সহ প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। সত্যেন বসুর প্রবন্ধ সম্পর্কে আইনস্টাইন লিখলেন, “আমার মতে বোস কর্তৃক প্ল্যাঙ্কের সূত্র নির্ধারণ পদ্ধতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ”।

১৯২৪ সালে সত্যেন বসু গেলেন ইউরোপে। জার্মানিতে গিয়ে দেখা করলেন আইনস্টাইনের সাথে। খোলামেলা বৈজ্ঞানিক আলোচনা হোল আইনস্টাইন ও সত্যেন বসুর মধ্যে। জার্মানি থেকে প্যারিসে গিয়ে দেখা করলেন মাদাম কুরির সাথে। মাদাম কুরির ল্যাবোরেটরিতে কিছু কাজ করারও সুযোগ পেলেন সত্যেন বসু। দ্য ব্রগলির ল্যাবেও কাজ করেছিলেন কিছুদিন। ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎ সত্যেন বসুর গবেষণা ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

সত্যেন বসু ১৯২৯ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পদার্থবিদ্যা ও গণিত শাখার সভাপতি এবং ১৯৪৪ সালে বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রধান সভাপতি মনোনীত হন।১৯৪৫ সালে সত্যেন বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ঐ পদে কাজ করেন। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্ম বিভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৫২ সালে সত্যেন বসু রাজ্যসভার সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে অধ্যাপক’ পদ থেকে অবসর নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর দুই বছরের জন্য তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সত্যেন বসুকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদে মনোনীত করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সত্যেন বসু এই পদ অলংকৃত করে গেছেন।

সত্যেন বসুকে কেন নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হোল না সেটা আজও  নোবেল কমিটির অনেক সদস্যের কাছে এখনো বিস্ময়। আর হবে নাই বা কেন? কারন সত্যেন বসুর আবিষ্কারের উপর গবেষণা করে পরবর্তী কালে কমপক্ষে তিনজন পদার্থবিজ্ঞানী নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

আজ আমরা আলবার্ট আইনস্টাইনকে যতটা মনে রেখেছি ঠিক সেইভাবে কতটা মনে রেখেছি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে! অথচ তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কিছু বিষয়ে সত্যেন বসুর অবদান আইনস্টাইনের অবদানের চেয়ে বেশি। ‘বোস-আইনস্টাইন’ তত্ত্বের আলোচনায় সত্যেন বসুর নামের ঠিক পরেই আইনস্টাইনের নাম উচ্চারিত হয়।কিন্তু কথা হোল- ঐ, ‘গেঁয়ো যোগী ভিক পায়না’।

জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাজের মধ্যে অতিবাহিত করে গেছেন বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসু। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি প্রাইম নাম্বার নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ভোর ছ’টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সত্যেন বসু। আশি বছরের একটা কর্মময় জীবন কাটিয়ে গেলেন এই পৃথিবীতে। পেছনে রেখে গেলেন তাঁর অমর কীর্তি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *