পলাশীর যুদ্ধ ও অযৌক্তিক আবেগ।

battle-of-plassey-painting-04_wmপলাশীর যুদ্ধকে নিয়ে বাঙালির আবেগতাড়িত হওয়ার কোন কারন দেখিনা।সম্পূর্ণ যুদ্ধটি ছিল দুই বিদেশী শাসকের মধ্যে শক্তির দ্বারা শাসন ক্ষমতা দখলের লড়াই। তাহলে বাঙালি কেন এই যুদ্ধকে নিয়ে  আবেগ আক্রান্ত হবে?পলাশী যুদ্ধের ২৬০ বছর পরেও কেন বলা হবে,নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার পরাজয় আর বাংলা তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত!

১৭৫৭ সালে ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন অবশ্যই।সুবে বাংলার নবাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে যুদ্ধটি হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্গত মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী পলাশী নামক এক আমবাগানে।তখন ‘সুবে বাংলা’ বলতে বোঝাতে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রদেশ।পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিজয়ী হয়।পলাশীতে সেদিন কী হয়েছিল এবং এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্কের যোগসূত্র কোথায় তার অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। অনুসন্ধান করলে জানা যাবে যে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা ছিলেন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার বিশ্বাসঘাতক প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বংশধর। নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা, নবাব আলীবর্দী খানের দৌহিত্র হিসেবেই নবাবী লাভ করেন। এই আলীবর্দী খানের পিতা ছিলেন একজন আরব আর তার মাতা ছিলেন একজন তুর্ক। নবাব সিরাজের মাতা ছিলেন আলীবর্দী খানের কন্যা, আর তার পিতা ছিলেন আলীবর্দীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পুত্র। সুতরাং বংশগতির ধারা বিবেচনা করলে বলা যায়, সিরাজ-উদ্-দৌলা ছিলেন তুর্ক-আরব বংশোদ্ভূত। সিরাজ-উদ্-দৌলা বিহারের পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফারসি ভাষায় কথা বলতেন। সুতরাং পিতা-মাতা বা জন্মসূত্রে কিংবা মাতৃভাষা প্রভৃতি হিসেব করলে দেখা যায় তিনি কোনো বিবেচনাতেই একজন বাঙালি ছিলেন না। অতএব বিদেশি, বিজাতি এবং ভিন্ন ভাষী শাসক নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার পতনের মধ্যে বাঙালিদের আবেগতাড়িত হওয়ার কোনও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।

সিরাজের কমান্ডার-ইন-চিফ মীর জাফর আলী খান ছিলেন একজন উজবেক। যুবক বয়সে জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি উজবেকিস্তানে একটি খচ্চরের টানা গাড়ি চালাতেন। ভাগ্যান্বেষণে তিনি বাংলায় আসেন কারন তখন বাংলা ছিল একটি ধনী ও সমৃদ্ধশালী প্রদেশ।ঠিক যে কারনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি লাভের আশায় বাংলায় এসেছিল। অতএব মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বাঙালিরা কেন লজ্জিত হবেন!

দুজন সেনাপতি মোহনলাল এবং মীর মদন পলাশীর যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। এই দুজনের কেউই বাঙালি ছিলেন না। এদের মধ্যে মোহনলাল ছিলেন কাশ্মিরী আর মীর মদন ছিলেন একজন তুর্ক। তাহলে যুদ্ধকালে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে কি কোনো বাঙালি ছিলেন না? একজন মাত্র বাঙালি পলাশীর যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। তিনি হলেন রাজা মানিক চাঁদ।রাজা মানিক চাঁদ ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের লোক।রাজা মানিক চাঁদের ভুমিকা পলাশীর যুদ্ধে বেশ লজ্জাজনক। পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে, বন্দুক থেকে প্রথম ছোঁড়া গুলির শব্দ শুনেই কালবিলম্ব না করে সেখান থেকে সটকে পড়েছিলেন। আর অমুখো হননি।

পলাশীর যুদ্ধে যে ২২০০ জন সাধারণ সৈনিক অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সিপাহি নামে পরিচিত এবং সকলেই ভারতীয় নেটিভ।বর্তমানে তামিলনাড়ু থেকে আসা। অবশিষ্ট ভারতীয় নেটিভ সিপাহি ‘বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি’র অন্তর্ভুক্ত ছিল।তারা লালপল্টন নামে পরিচিত ছিল।লালপল্টনের সিপাহিরা পাঠান, রোহিলা আফগান, জাঠ এবং রাজপুত বংশোদ্ভূত ছিল।যারা বেশির ভাগই ধর্মবিশ্বাসে ছিল মুসলিম।সুতরাং বলা যায় ব্রিটিশরা ভারত জয় করতে সক্ষম হয়েছিল ভারতীয়দের সহযোগিতার কারণেই।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ দমনেও ‘বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি’ সৈন্যদের ব্যবহার করা হয়েছিল।একাজে তারা পাঞ্জাবী এবং পাঠান সিপাহিদের সহযোগিতা পেয়েছিল।পলাশীর যুদ্ধের নবাবের বেতনভুক বা ভাড়াটিয়া সৈন্য সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার।স্বাভাবিকভাবেই নবাবের প্রত্যাশা ছিল এই ৫০ হাজার সৈন্যই নবাবের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তারা তা করেনি। এর একটাই কারণ প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতা।শুধু নবাব কেন ইংরেজ পক্ষের সৈন্যরাও ভাড়াটিয়া ছিল। রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে ইংল্যান্ড থেকে আসা ইংরেজ সৈন্য বাদে বাকি সব সৈন্যই ছিল ভাড়াটিয়া এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা।

নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার বেতনভুক মোট ৫০ হাজার সৈন্যের মধ্যে ১২ হাজার মাত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, আর বাকি ৩৮ হাজার সৈন্য যারা মীর জাফর আলী খানের অধীনে ছিল এবং তারা যুদ্ধ না করে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল।যে ১২ হাজার সৈন্য নবাবের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তারা মোহনলাল এবং মীর মদনের অধীনে ছিল।এই ১২ হাজার সৈন্যের মধ্যে ৫ হাজার সৈন্য ছিল মুঘল ক্যাভালরি এবং ৭ হাজার ছিল পাঠান ও রাজপুত পদাতিক সেনা।অন্যদিকে যে ৩৮ হাজার সৈন্য মীর জাফরের অধীনে থেকে পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে ছিল মুঘল, তুর্কি, আফগান এবং রাজপুত। যুদ্ধের মাঠে নবাবের পক্ষে ৪৫ জন ফরাসি আর্টিলারি সেনা ছিল তারা ফরাসি কমান্ডার সিনফ্রে’র অধীনে ছিল।
অতএব জোরের সঙ্গে বলা যায় যে  পলাশীর যুদ্ধে একদল ভাড়াটিয়া সৈন্য আর একদল ভাড়াটিয়া সৈন্যদলকে পরাস্ত করেছিল। নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার সৈন্যরা বাঁধা ছিল নির্দিষ্ট বেতনের অঙ্কে।একজন তুর্ক-আরব নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার প্রতি তাদের না ছিল কোনো ব্যক্তিগত আকর্ষণ,আনুগত্য ও সহানুভুতি।কারণ নবাব ছিলেন তাদের দৃষ্টিতে একজন বিদেশি শাসক, যার অধীনে তারা ভাড়া খাটতে এসেছিল।তাই পরাজিত ও কপর্দকহীন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলাতক নবাব নিজের নিরাপত্তার জন্য কাউকেই সঙ্গে পায়নি।

এমনকি নবাবের পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে যে ১২ হাজার ভাড়াটিয়া সৈন্য তার পক্ষে যুদ্ধ করছিল তারাও হাওয়া হয়ে গিয়েছিল।এটাই শেষ নয়,নবাব যখন ছদ্মবেশ ধারণ করে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন সেই সময় মাঠে কর্মরত একজন কৃষক তাকে চিনে ফেলেন এবং নবাবকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।সম্ভবত এই কৃষক সিরাজ-উদ-দৌলা’কে বিদেশী মনে করতেন তাই অন্য বিদেশী ইংরেজদের হাতে নবাবকে তুলে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করেন।তার ধারনায় তিনি অন্যায় কিছু করছেন না।

এখন পলাশীর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের এবং কমান্ডারদের জাতিগত পরিচিতি অনুসন্ধান শেষে একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু  যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্য এবং সেনাপতিদের কেউই বাংলার ভূমিপুত্র ছিলেন না।

অনেক বাংলা ঐতিহাসিক নাটকে ‘সিরাজ-উদ্-দৌলা’কে বলা হয়েছে-নবাব ছিলেন একজন স্বাধীন শাসনকর্তা।এটা সত্য ঘটনা নয়। সেসময় সুবে বাংলা ছিল ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের অধিনত একটি প্রদেশ। সে সময়ে প্রচলিত আইনানুযায়ী কোন প্রদেশের একজন নবাবের মৃত্যু হলে দিল্লিতে অধিষ্ঠিত মুঘল সম্রাট নতুন আর একজন নবাবকে নিয়োগ করতেন।এবং বাকি নবাবদের ন্যায়  বাংলার নবাবকেও বার্ষিক হারে দিল্লির সম্রাটের দরবারে উপঢৌকন পাঠাতে হতো।পরে, ইংরেজরাও নিয়োগ এবং বার্ষিক উপঢৌকন আইন বলবত রেখেছিল।তাহলে, সিরাজ কি এই আইনের বাইরে ছিল? আসল ঘটনা হোল-আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ কন্যার পুত্র এবং সিরাজ-উদ্-দৌলার এক খালাতো ভাই শওকত জংকে দিল্লির সম্রাট বাংলার নবাব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সুতরাং সেই হিসেবে সিরাজ-উদ্-দৌলা নয় শওকত জং ছিল বাংলার বৈধ নবাব।তাই পলাশীর যুদ্ধের জন্য বাঙালিদের আবেগতাড়িত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারন এই যুদ্ধটি ছিল দুই বিদেশী শক্তির মধ্যে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখলের লড়াই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *