“পঞ্চাননের শেষ ইচ্ছা”– লেখক, শুভদীপ রায়

cloth-ghosts-phobias-1011mld107647_sq
হাত কচলে খৈনীটা মাড়ির ধারে লাগিয়ে পঞ্চা ফিক্ করে হেসে উঠল৷ ‘এত বড় ছেলে ভূতে ভয় পায়?’ পাশে বসা তার ছোট ভাইটা একটু জোর দিয়ে বলে, ‘আমি পড়েছি, মানুষ মরে গেলে ভূত হয়ে যায়৷’ পঞ্চা পাশবালিশটা কোলে তুলে বলে, ‘বইতে অমন অনেক কিছু লেখা থাকে; পাগল!  ভূত, ভূত…আরে ভূত থাকলে কতবার মরতাম জানিস!’
ছোট ছেলেটা একটু অবাক হয়ে অথবা হয়তো কোন গল্পের আশায় দাদাকে বলে, ‘কিভাবে?’
পঞ্চানন একটু ঘাবড়ে গিয়ে ধমকের সুরে বললো, ‘পড়তে বোস! গল্প পরে হবে৷’
ছেলেটা দাদার পাশ থেকে উঠে ঘরে চলে যায়৷ পঞ্চানন ভাইয়ের উত্তর খুঁজতে  চেষ্টা করে নিকশ কালো অাকাশে জেগে থাকা  চাঁদটির মধ্যে ৷ তার এই আবিষ্টতার মাঝে হঠাৎই একটা মেঘ এসে এলোমেলো করে দেয় সব ভাবনা৷
নতুন আদা বাজারে এসে গেছে, তাই বিক্রি কিছুটা কমেছে৷ তাতে কি হয়েছে!  খালের পাশে তার মশলা গুদামে কিছু নতুন মাল ঢুকেছে, তাই একটু ভরসা৷ পঞ্চা দিনের বেলায় বাজারে আদা নিয়ে বসে আর রাতে তার গুদামে রমরমিয়ে চলে অন্য ব্যবসা – বোমা মশলা’৷ ভোটের বাজার এসে গেলে পঞ্চাননের দাম খুব বাড়ে, তখন দুহাত ভরে টাকা রোজগারও হয়৷ বাবা-মা না জানলেও এলাকার কারও জানতে বাকি নেই, আসলে পঞ্চা হলো পার্টির পোষা গুন্ডা৷ ওকে ছাড়া নেতাদের চলে না৷
কিন্তু ক’দিন ধরে পঞ্চার হাবভাব কেমন ঠেকছে৷ গ্রামের পার্টি অফিসেও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে৷ ‘আজকাল পঞ্চা তেমন ইনভলভড নয়৷ মিছিলেও নিয়মিত আসে না’, চক্রবর্তী কথাটা তোলে৷ পঞ্চায়েত প্রধান হুসেন আনসারী আজ বিশেষ বৈঠকে এই গ্রামে এসেছেন৷ প্রধানও বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ কথাটা আমার কানেও গেছে৷ কোন কারণ জানতে পারলে নাকি?’
‘আজ্ঞে না, তবে আমার মনে হয় বিরোধীরা হয়তো টানার চেষ্টা করছে৷’ চক্রবর্তীর সাথে সুর মিলিয়ে মহান্তীও বলে, ‘হ্যাঁ আমারও মনে হয় বেশি কিছু দেবে হয়তো৷’
বেশ গম্ভীরভাবে কিছুটা ভেবে প্রধান বলে, ‘চক্রবর্তী বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখো তো, অমন একটা পার্টি ওয়ার্কার হাতছাড়া হলে…কি হবে বুঝলে তো! ডিলটা দরকার হলে নতুন করে করো৷’
মিটিং শেষ হলে চক্রবর্তী পঞ্চার সাথে দেখা করার  উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো৷ খালের পাশে পুরানো পাঁচিলটার ফাঁক দিয়ে আলো দেখে এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে নিয়ে টুক করে ভিতরে ঢুকে পড়লো৷ ভিতরে পঞ্চা তখন তার কজন সাকরেদের সাথে কথা বলছে ৷
‘কি রে কি করছিস?’ চক্রবর্তী হাত তুলে পঞ্চাকে ডাকে৷ পঞ্চা এগিয়ে এসে বলে, ‘শনিবার মিটিং আছে, তাই ওদের  ওদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম৷’
‘তুই যাবি নে?’, চক্রবর্তী কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্নটা তোলে৷ যদিও এর জন্য সে প্রস্তুত ছিলো৷
‘না গো দাদা, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না৷ আমি ওদের সব বুঝিয়ে দিয়েছি, ওরা সব সামলে নেবে৷’
চক্রবর্তী পঞ্চাননের পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলে, ‘হ্যাঁরে পঞ্চা তোর কি হয়েছে বল তো? পার্টির কাজে তোকে আগের মতো দেখি না’৷ এবার একটু জোর করে হেসে বলে, ‘অন্য পার্টিতে ঢুকলি নাকি!’
পঞ্চানন একটু গুটিয়ে যায়, কিন্তু দৃঢ়ভাবে জবাব দেয়, ‘ভাবো কি করে? মরলে আমার ভূতটাও তোমাদের ছেড়ে যাবেনা’৷
পঞ্চানন ঘরের ভিতরে যাবার জন্য পা বাড়ায়, চক্রবর্তীও পাঁচিলটা টপকে বেরিয়ে আসে৷ হঠাৎ পঞ্চা পেছন থেকে ডাকে, ‘দাদা, তোমার তো অনেক পড়াশুনো, আচ্ছা মানুষ মরলে সে কি আবার জন্মায়!’
‘কি?’ পঞ্চার মুখে এধরনের কথা শুনে চক্রবর্তী অবাক হয়ে যায় ৷
‘আরে বলো না মানুষ কি আবার জন্মায়?’
”হ্যাঁ ৷ আরে শরীরটা মরে গেলে কি হবে আত্মা তো আছে, সে কোথায় যাবে? তাকে তো আবার নতুন শরীরে আসতেই হয়৷’
‘আচ্ছা, বাঁচালে দাদা! খুব ভয় লাগছিলো৷ দাদা, আমার একটা কথা রাখবে? কাল সকাল পৌনে ছ’টা নাগাদ একবার আমার বাড়ি এসো তো’
‘সে না’হয় আসবো’খন, কিন্তু কি হয়েছে বল্ তো?’
‘কাল বলবো৷’ পঞ্চানন আর দাঁড়ায় না, চলে যায়৷
রাতে বাড়ি ফিরে ভাইকে ডেকে বলে, ‘শোন, মরলে মানুষের শরীরটা আমরা জ্বালিয়ে দিই, আত্মাটা আবার ঘুরে ফিরে অন্য মানুষ হয়ে আসে৷ বুঝলি বুদ্ধু!’
মা মুড়ির বাটি নিয়ে আসে৷ পঞ্চানন মায়ের হাত থেকে বাটিটা রেখে মাকে জড়িয়ে ধরে৷ ‘মা আমি আবার তোমার ছেলে হয়ে আসবো তো!’
‘পাগল ছেলে!’ মা রান্নাঘরে চলে যায়৷
পরদিন পৌনে ছটায় চক্রবর্তী আসে৷ পঞ্চানন তার হাতে একটা কাগজ দিয়ে পাশের গোয়ালঘরে যায়৷ তারপর একটা গুলির শব্দ৷
দুপুরের মধ্যে সব প্রেসের লোক এসে যায়… বিরোধী দলের হাতে এক পার্টি কর্মীর খুনকে ঘিরে বুদ্ধিজীবী মহলের তোলপাড় করা চ্যানেল  শো….
ঘটনায় বিহ্বল সদ্য প্রাথমিক উত্তীর্ণ পঞ্চাননের ছোটভাই দাদার খাটের পাশে ছড়িয়ে থাকা টুকরো কাগজগুলো তুলে নিয়ে পাশাপাশি সাজায়৷ দেখে তাতে দাদার হাতে লেখা, ‘এবার ভালো মানুষ হয়ে জন্মাবো’৷
শুভদীপ রায়

শুভদীপ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *