‘নাহি যেতে দিব ঊমারে’– সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

997d9bb5584971daa0232a6a15d53041--maa‘নাহি যেতে দিব ঊমারে মোর
বাঁধিয়া রাখিয়ে দিব প্রেম বাহু ডোর’।

মা মেনকার মন খারাপ, গিরী নন্দীনি গীরিপুরী আঁধার করে যাবে কৈলাশে ফিরে। আবার বছর ভর প্রতীক্ষা। বিজয়া দশমী মানে হর্ষ বিষাদের পর্ব। যার গৃহে বিবাহিত কন্যা আছেন তিনি বোঝেন সেটা। বাপের বাড়ি থেকে ফেরার আগে মা যেমন পরিপাটি করে চুল বেঁধে দেন, আলতা সিঁন্দুর পরিয়ে দেন মুখে গুঁজে দেন মিষ্টি, তেমনি দেবী দূর্গাকে বিদায়ের পূর্বে আমরা বরণ করি, সিঁন্দুর  খেলায় মেতে উঠি।

‘যে মহা শক্তির হয় না বিসর্জন
অন্তে বাহিরে প্রকাশ যারা অনুক্ষণ
মন্দিরে দূর্গে রহে না যে বন্দী
সে দূর্গারে প্রাণ চায়’।

আসলে আমাদের কাছে  আবাহন মানে আমাদের অন্তের অবস্থিত ঐশ্বরিক শক্তিকে আমরা আহ্বান করি, তাই আবাহন। তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করি এবং অর্চণা করি তাই পূজা সমাপন্তে আবার তাকে অন্তরে নিমগ্ন করি তাই বিসর্জন।

শোভাবাজার রাজবাড়ির রীতি অনুযায়ী দশমীর দিন সকালেই বিজয়া হয়। বিষাদের সুর বেজে ওঠে সানাইয়ে। বিকেলে শোভাযাত্রা করে গঙ্গায় প্রতিমা নিরঞ্জন। এই রাজবাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জনের দৃশ্যটি অভূতপূর্ব। দুটি নৌকার মাঝে প্রতিমা রাখা হয়। মাঝনদীতে পৌঁছে নৌকা দু’টি ধীরে ধীরে সরে গেলে মাতৃমূর্তি ভেসে যায় বিজয়ায়। নীলকণ্ঠ পাখি ছাড়ার সেই রেওয়াজ বন্ধ হলেও রীতি অনুযায়ী প্রতিমা নৌকায় ওঠার সঙ্গেই সঙ্গেই মাটির তৈরি নীলকণ্ঠ পাখি নদীতে এখনও ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

‘অপেক্ষার প্রহর গোনে ভোলা মহেশ্বর
পার্বতী আর কতদিন থাকবে বাপের ঘর’

রায়চৌধুরী বাড়ির বিজয়া পর্বটি আর পাঁচটা বাড়ির থেকে কিছুটা আলাদা। দশমীর দিন সকালে ঘট বিসর্জন দেওয়ার পরে চরণ দেখা ইত্যাদি সমাপ্ত হলে আরম্ভ হয় বিজয়া পর্ব। বিকেলে হয় প্রতিমা বিসর্জন।

কোন ‘বিজয়’কে চিহ্নিত করে বিজয়া দশমী? কী এর ধর্মীয় তাৎপর্য?
‘দশমী’ কথাটির প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য সহজবোধ্য। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে দেবী কৈলাস পাড়ি দেন। সেই কারণেই ‘বিজয়া দশমী’ নাম। কিন্তু এই দশমীকে ‘বিজয়া’ বলা হয় কেন, তার পৌরাণিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে একাধিক কাহিনি সামনে আসে।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই দিনেই পিতৃ-আবাস ছেড়ে দেবী পাড়ি দেন স্বামীগৃহ কৈলাসের দিকে। এই দিনেই তাই দেবীর প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। ভারত ও নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দিনটি নানাভাবে পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দিনটিকে ‘বিজয়া দশমী’ বলা হয় কেন? কোন ‘বিজয়’-কেই বা চিহ্নিত করে দিনটি?

পুরাণে মহিষাসুর-বধ সংক্রান্ত কাহিনিতে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পরে দশম দিনে তার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন দেবী। শ্রীশ্রীচণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে দেবী আবির্ভূতা হন, এবং শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর-বধ করেন। বিজয়া দশমী সেই বিজয়কেই চিহ্নিত করে।

বাল্মীকি রামায়ণে কথিত আছে যে, আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই রাবণ-বধ করেছিলেন রাম। কালিদাসের রঘুবংশ, তুলসীদাসের রামচরিতমানস, কিংবা কেশবদাসের রামচন্দ্রিকা-য় এই সূত্রের সঙ্গে সংযোগ রেখেই বলা হয়েছে, রাবণ-বধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ। রাবণ-বধ ও রামচন্দ্রের এই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষেই যথাক্রমে দশেরা ও দীপাবলি পালন করা হয়ে থাকে। আবার মহাভারতে কথিত হয়েছে, দ্বাদশ বৎসর অজ্ঞাতবাসের শেষে আশ্বিন মাসের শু‌ক্লা দশমীতেই পাণ্ডবরা শমীবৃক্ষে লুক্কায়িত তাঁদের অস্ত্র পুনরুদ্ধার করেন এবং ছদ্মবেশ-মুক্ত হয়ে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় ঘোষণা করেন। এই উল্লেখও বিজয়া দশমীর তাৎপর্য বৃদ্ধি করে।

মা থাকবে কতক্ষণ, মা যাবে বিসর্জন। পুজো, পুজো, পুজো। পুজো শেষ। এবার বিদায়ের পালা। বাপের ঘর অন্ধকার করে ছেলে মেয়ে নিয়ে উমা ফিরবেন পতিগৃহে। তারপর বছরভরের অপেক্ষা। বাঙালি ফিরবে নিজের জীবনে। আর পাঁচটা আম দিনের মত সুখে দুঃখে কাটবে সময়। তার আগে অবশ্য বিজয়ার বিদায় বেলায় অন্য এক খুশির আনন্দে মেতে ওঠে বাঙালি। ঘাটে ঘাটে চলে ভাসান। নাচের তালে হৈহৈ করে সবাই চেঁচিয়ে ওঠেন ‘আসছে বছর… আবার হবে।’

দত্ত বাড়ীর নিয়মে বিজয়া দশমীর সকালে সুতোকাটা, আর সিঁদুর খেলার পরই শুরু বিসর্জনের তোড়জোড়। বাড়ির ঠাকুর আগেই জলে পড়ে। দুপুর দুপুর। পরিবারের লোকজনই ছোট টেম্পোয় অথবা মাটাডোরে করে একচালার ঠাকুর নিয়ে হাজির গঙ্গার ঘাটে। দুপুরের দিক হলে ফাঁকা পাওয়া যায়। অনেক পরিবারেরই নিজস্ব কিছু রীতি আছে। সেই রীতি মেনে তবেই বিসর্জন দেওয়া যায়। ফলে গঙ্গার ঘাটেও তাদের বেশ কিছুটা সময় কাটে। আগে হাটখোলার জমিদার বাড়িতে কলকাতার এক বনেদি বাড়ির পুজোর রীতি ছিল নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো। সে পাখি আকাশে উড়ত ঠিকই কিন্তু সামান্য ওড়ার পরই তার ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে যেত। তখন কাকেরা ঠুকরে মারত তাদের। ওই পরিবারের রীতি ছিল বিসর্জনের আগে নীলকণ্ঠ উড়িয়ে কৈলাসে আগাম জানান দেওয়া, উমা ফিরছেন। কিন্তু কালক্রমে সে রীতি আর নেই। সেই জায়গায় প্রতীকী একটি কাঠের নীলকণ্ঠ পাখি গঙ্গার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাবেকরীতির মর্যাদা রক্ষা করেন নতুন প্রজন্ম।

বিকেল যত গড়াতে থাকে ততই শহরের বিভিন্ন ঘাটে জমতে থাকে বারোয়ারির ভিড়। এক এক করে লরি ভিড় জমাতে থাকে ঘাটে। কখনও পাড়ার ছেলেরা নিজেরা, তো কখনও ভাড়া করা লোক দিয়ে শুরু হয় একের পর এক ভাসান। কোনও সময় নষ্ট নয়। কোনও বেয়াদবি নয়। সুশৃঙ্খলভাবে চলে বিসর্জন।

বিজয়ার অন্যতম আকর্ষণ মিষ্টিমুখ। আগে বাড়িবাড়ি গিয়ে বড়োদের প্রণাম করে চলতো মিষ্টি মুখ করার পালা। মা মাসিমা জ্যেঠিমারা বানাতেন নাড়ু ঘুগনী মিহিদানা কুচোনিমকি। এখন অবশ্য ডিজিটিল জামানায় ফোনেই হ্যাপি বিজয়া আর মিষ্টির হাঁড়ির ছবি পাঠালেই বিজয়া সারা হয়ে যায়। আগে অনেক বাড়ির মা কাকিমা কাকা বাবা জ্যাঠারা বিজয়া উপলক্ষ্যে বাড়িতে সিদাধি বানিয়ে বড়োরা খেতেন। গৃহবন্দী মা জ্যেঠিমাদের সেদিনটা ছিল মুক্ত বাতাসের স্বাদ পাওয়া। ছোটেদের প্রবেশ সে আসরে নিষিদ্ধ। এখন ক্লাশ এইটের ছেলে মেয়েদের অনুষ্ঠান বিয়ার ছাড়া হয় না। তারা ভাবতেই পারবেনা বুঝতেও পারবেনা সেই রঙীন উৎসব মুখর বিজয়া দশমী।

‘উদিলে নির্দয় রবী উদিয়া অচলে
নয়নের মণি মোর নয়নে হারাবে’।

আবার এসো মা।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *