নবজাগরনের অগ্রদুত রামমোহন রায়(শেষ )লিখেছেন, দেবাশীষ পাইন

downloadআগের  পর্বে  রামমোহন রায়ের জীবনের একটা দিক সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম এই পর্বে মানুষ রামমোহন কেমন ছিলেন,তার ইংরাজি শিক্ষা ও আত্মসম্মানবোধ নিয়ে আলোচনা করব।রামমোহন রায়ের শরীর, বিদ্যাবুদ্ধি, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকভাব এ সবই ছিল অসাধারণ। উনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। উচ্চতায় ছয় ফুট, ভাল চেহারার অধিকারী ছিলেন। তার অতুল শারীরিক বল প্রসঙ্গে অনেক গল্প প্রছলিত আছে। রামমোহন মনে করতেন প্রাচীন ভারতবর্ষে আর্যরা শারীরিক গঠন, মানসিক ও আধ্যাত্মিক মহত্বের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।রামমোহন ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রামমোহন রায়ের মাথা, সাধারণ ব্যক্তিদের মাথা থেকে অনেক বড় ছিল।উনি যে পাগড়িটি পরতেন তা এত বড় যে, যাঁদের মাথা বড়, তাঁদেরও মাথাতে ঐ পাগড়ি বড় হতো। রামমোহন মুসলমানদের সাজ সজ্জা পছন্দ করতেন। সম্ভবত দীর্ঘদিন মৌলবীদের সংস্পর্শে থাকার প্রভাবে মুসলমানদের দৃষ্ট আচার ব্যবহারের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর মনের যে ভাব অর্থাৎ, পরমেশ্বর মানুষের রাজা ও প্রভু তাই পরমেশ্বরের স্থানে যাওয়ার সময় তিনি উপযুক্ত পোষাক পরে যেতেন। এই ভাবটিও তাঁর মুসলমানদের থেকে নেওয়া। আগেই বলেছি রামমোহনের বিদ্যাবুদ্ধি ছিল অসাধারণ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগর তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ বইতে বলেছেন যে “—রামমোহন রায় সংস্কৃত, আরবী, পারসী, উর্দ্দু, বাংলা, ইংরাজী, গ্রীক, ল্যাটিন, ফ্রেঞ্চ, হিব্রু এই দশ ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর বেদান্ত জ্ঞান ও ব্যাখ্যা ছিল অদ্বিতীয়। সেই হিসাবে তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক।

রামমোহন রায় ষাট বছরের কাছাকাছি বেঁচে ছিলেন। তার মধ্যে জীবনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ঘরের বাইরে থেকেছেন। আমরা এখানে দেখার চেষ্টা করব কলকাতায় আসার আগে তিনি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারে কিভাবে সক্রিয় ছিলেন। তাই কলকাতা বাসের পূর্বের জীবনের কথা জানবো।আগেই দেখেছি রামমোহন পাটনায় গিয়েছিলেন পারসী ও আরবী ভাষা শিক্ষার জন্যে। সেখানে তিনি মুসলমান ধর্মশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখার ধর্মগ্রন্থ, তাঁদের ব্যবহারশাস্ত্র প্রভৃতি সম্পর্কে শিক্ষা নেন। এর মধ্যে সুফী মতবাদী গ্রন্থসামগ্রীও ছিল। সুফী মতবাদের উপর তাঁর অত্যন্ত আসক্তি ছিল। পরবর্ত্তীকালে তাঁর প্রিয় সুফি কবিরা যেমন হাফেজ, মৌলানা রুমি, শামী তাব্রিজ এদের কবিতা থেকে ঊনি ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে কবিতা আবৃত্তি করতেন।

এর পরে কাশীতে গিয়ে সংস্কৃত গ্রন্থের চর্চ্চা এবং বেদান্ত প্রভৃতি হিন্দু শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন। কোরাণ ও মুসলমান ধর্মগ্রন্থাদি পাঠ করে রামমোহনের মনে একেশ্বরবাদের ধারণা আসে তেমনি বেদান্ত পাঠের সাহায্যে পৌত্তলিকতার অসারতা বুঝতে পারেন। প্রথম গৃহত্যাগের পর ভারতবর্ষের নানা প্রদেশ ও তিব্বত ঘোরার সময় জৈন ও বৌদ্ধধর্মের গ্রন্থগুলির সঙ্গে কবীরপন্থী, নানকপন্থী, দাদুপন্থী রামায়ত সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থগুলি পড়ে তাঁর পনেরশো, ষোলোশো এবং সতেরশো শতকের ভারতীয় ধর্ম আন্দোলন কি ভাবে হয়েছিল সেই সম্পর্কে বিস্তৃত ভাবে জেনেছিলেন। বাড়িতে ফিরে নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে হিন্দু সংস্কৃতশাস্ত্র বিশেষত গীতা, উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র প্রভৃতিও পাঠ করেন। তাই পূর্বে তাঁর মনে যে একেশ্বরবাদের ধারণা তৈরী হয়েছিল তা বহুশাস্ত্র পাঠে আরও সুসংযত ও সুদৃঢ় হয়েছিল। এই মানসিক প্রস্তুতি তাঁকে ভবিষ্যতে ধর্মসংস্কারক, সমাজসংস্কারক বিশেষত হিন্দু পৌত্তলিকতা বিরোধী, সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে প্রভূত সাহায্য করেছিল।নিজ মতবাদের ওপর বিস্বাসের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ১৮০৪ সালে মুর্শিদাবাদে ‘তুহফল-উল-মুওয়াহিন্দিন’ (একেশ্বরবাদীদের প্রতি উপহার) বইটির প্রকাশের মধ্যে দিয়ে।

রামমোহন যখন রংপুরে চাকরি করতেন তখনই তিনি ধীরে ধীরে সংস্কারের কাজ আরম্ভ করেছিলেন। এখানেই উনি শাস্ত্রীয় বিচার আরম্ভ করেছিলেন। ব্রহ্মজ্ঞান সম্বন্ধে ছোট ছোট বই পারসী ভাষায় লিখতেন (পারসী ভাষায় চর্চ্চা তখন চল ছিল)। রংপুর মুসলমান প্রধান জায়গা হওয়াতে রামমোহন তাদের সঙ্গে মুসলমানশাস্ত্র বিচার করতেন। তাই মৌলবীরা তাঁকে ‘জবরদস্ত’ মৌলবী বলতেন। আবার তিনি সেখানে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গেও শাস্ত্রীয় বিচার করতেন। সেজন্য বেদান্তের কোনো কোনো অংশ বাংলা গদ্যে অনুবাদ করেন। এগুলি সবই ছিল রামমোহনের একেশ্বরবাদের প্রচারের একটি দিক।

রামমোহনের ইংরেজি শিক্ষার বিষয়ে একটু আলোচনা প্রাসঙ্গিক।কারণ পরবর্ত্তীকালে ভারতীয় হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলির অনুবাদ এবং ব্যখ্যা তিনি বাংলা ভাষাতে যেমন করেছিলেন, সেই সঙ্গে ইংরাজী ভাষাতেও। ইংরেজিতে প্রকাশ করায় উদ্দেশ্য ছিল, যাতে করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এবং ইউরোপের নানা বিদ্বজ্জনের কাছে পৌছয়।এবং এই প্রচেষ্টা বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল।

আমরা যে সময়ের কথা বলছি তখন ইংরেজি ভাষা আমাদের দেশে নতুন। আমাদের ঘরোয়া ভাষা ছিল বাংলা আর শিক্ষিতদের কাছে সংস্কৃত বা ফার্সী। এই প্রসঙ্গে আমরা দেখি, রামমোহন অনেক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন কিন্তু ইংরাজী ভাষাতে ওনার পারদর্শিতা তেমন ছিলনা। উনি বাইশ বছর বয়সে ইংরাজী ভাষা শিক্ষা আরম্ভ করেন। ১৮০৫ সালে ডিগ্বী সাহেবের কাছে কাজে যোগ দেবার সময় রামমোহন ইংরেজি ভাষায় কোনভাবে কথা বলতে পারতেন কিন্তু নির্ভুল লিখতে পারতেন না। চাকরীতে যোগ দেবার কিছুদিনের মধ্যে সাহেব এবং রামমোহনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে । তাঁরা বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় পরষ্পর পরষ্পরকে সাহায্য করতে লাগলেন। অর্থাৎ রামমোহন ডিগ্বী সাহেবকে বাংলা ভাষা এবং সাহেব রামমোহনকে ইংরেজি শেখাতে লাগলেন। অনেক পরে রামমোহন তাঁর লেখা বেদান্তসুত্রের ভাষ্য ও কেনোপনিষদের সারাংশ ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ডিগ্বী সাহেবের সম্পাদকীয়তায় তা প্রকাশ হয়। এই বইয়ের ভূমিকায় সাহেব রামমোহনের সম্বন্ধে যা বলেছিলেন “ বাইশ বৎসর বয়সে তিনি প্রথমে ইংরেজি শিক্ষা আরম্ভ করেন কিন্তু মনোযোগ পূর্ব্বক শিক্ষা না করাতে, পাঁচ বছর পরে যখন আমার সহিত তাঁহার পরিচয় হইল, তখন সামান্য সামান্য বিষয়ে ইংরেজিতে কথা বলিলে বোধগম্য হইত মাত্র, কিন্তু উক্ত ভাষা কিছুমাত্র শুদ্ধরূপে লিখিতে পারিতেন না। যে জিলায় আমি ঈষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিবিল সার্ভিসে পাঁচ বছর কালেক্টর ছিলাম, তথায় তিনি, পরিশেষে দেওয়ান, অর্থাৎ করসংগ্রহ বিষয়ে প্রধান দেশীয় কর্মচারীরূপে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। আমার চিঠি-পত্র সকল মনোযোগ পূর্ব্বক পাঠ করিয়া এবং ইউরোপীয় ভদ্রলোকদিগের সহিত পত্রাদি লিখিয়া ও আলাপ করিয়া তিনি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন যে, বিলক্ষণ শুদ্ধরূপে ইংরেজি বলিতে লিখিতে পারিতেন।“

এছাড়াও রামমোহনের ইংরেজি ভাষা জ্ঞান সম্বন্ধে আরও তথ্য দেওয়া যেতে পারে। ১৮১৮ সালের জুন মাসে তখনকার ‘ক্যালকাটা জার্নাল’ পত্রিকায় সম্পাদক মিঃ জেমস্ সিল্ক বাকিংহাম রামমোহনের সঙ্গে আলাপ করে তার ইংরেজি ভাষার পাণ্ডিত্যের প্রশংসা করে লিখেছিলেন “ —তাঁহার ভাষায় অনুপম বিশুদ্ধতায় আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম, এশিয়া মহাদেশে যাহাদের জন্ম এমন কোন ব্যক্তির মুখে আমি এইরূপ উত্তম ইংরেজি শুনি নাই; তাঁহার শব্দ-নির্বাচন এমন চমৎকার যে উহা ইংরেজরাও অনুকরণ করিতে পারেন। আমার পরিচিত অধিকাংশ ব্যক্তি অপেক্ষা তিনি ইংরেজি ভাষায় জটিল বিষয়ে অধিকতর নিপুণভাবে যুক্তিবত্তার সহিত আলাপ ও তর্ক করিতে পারেন।“

রামমোহনের আত্মসম্মান বোধ নিয়ে অনেক গল্প আছে, বিশেষ করে ইংরেজদের ব্যবহারের পরিপ্রক্ষিতে। এ প্রসঙ্গে বিষদে আসার আগে সেই সময়কার সামাজিক অবস্থানের কথা মনে রাখতে হবে। তখন সবে মুসলমান রাজত্বের প্রভাব আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে আর ইংরেজ রাজত্বের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলমান রাজত্বের একটি গুণ লক্ষ্য করার মতন ছিল, রাজ্যের সর্ব্বোচ্চ পদে হিন্দুদের মুসলমানদের মতই সমান অধিকার ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়  একজন হিন্দু ছিলেন প্রধান সেনাপতি কিন্তু ইংরেজরা ভারতীয়দের প্রতি সেই সৌজন্য দেখানোর ধার ধারত না। বিশেষত রামমোহনের সময়ে অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তখন সর্ব্বোচ্চ দেওয়ানি পদ ভারতীয়দের প্রাপ্য। এই সিবিলিয়ানরা ভারতীয় দেওয়ানদের যথাযোগ্য সন্মান দেওয়া তো দূরের কথা, প্রায়ই দুর্বব্যবহার করত। রামমোহনের এই ধরণের ঘটনাগুলি জানা ছিল। তাই তিনি যখন সিবিলিয়ন্ জন ডিগ্বীর অধিনে কেরাণীর চাকরী নেবেন ঠিক করেছিলেন তখন তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। তিনি সাহেবকে একটি প্রস্তাব দিলেন যে তিনি যখন কাজের জন্য সাহেবের কাছে আসবেন, তখন সাহেব তাঁকে বসবার জন্য জায়গা দেবেন এবং সামান্য আমলাদের যে ভাবে হুকুম জারি হয়, তাঁর প্রতি সে ভাবে কোনো ব্যবহার করা চলবে না। এটি কেবল মুখের কথা না হয়ে রামমোহন ডিগ্বীকে এ ব্যাপারে একটি দলিল লিখে তাতে স্বাক্ষর দেবার জন্য অনুরোধ করলে সাহেব তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে দেন।এমনই ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাজা রামমোহন রায়।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *