নবজাগরনের অগ্রদুত,বিদ্যাসাগর। সোনালী সাহা নন্দী

1_FpxhENPlaWtrbPSoBn5cSQবাংলা সাহিত্যের পুরোধা তথা গদ্য সাহিত্যের জনক এবং বাংলা নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এর নাম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায়। তিনি সামাজিক তথা বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় তার মেধার যেভাবে পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই অনস্বীকার্য এবং আজও তা অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে। শুধুমাত্র সামাজিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় তার কৃতিত্ব থেমে ছিল না সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার এবং বাংলা সাহিত্যে ভিত স্থাপনে অশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন।

পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভবতারিণী দেবীর সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২০ সালে ২৬শে জুলাই পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পান্ডিত্যের জন্য তাদের পরিবারের খ্যাতি ছিল অনেক আগে থেকেই । মা ভবতারিণী দেবী ছিলেন সে যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজেও আধুনিক চিন্তার অধিকারীনী। প্রচুর দারিদ্রতার মধ্য দিয়েও তিনি প্রবল মেধার পরিচয় দেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন বিরল গুণের অধিকারী। ওনার মেধার পরিচয় পাই মাইল্ডস্টোন গল্পে। একবার মেদিনীপুর থেকে কলকাতা যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বাবার সাথে রওনা দেন এবং পথে মাইল্ডস্টনে ইংরেজি সংখ্যায় লেখা দেখে তিনি ইংরেজিতে অংক শিখে নেন। পড়াশোনা সম্পর্কিত কাহিনী আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। অপরিসীম অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং বৃত্তীও লাভ করেন। তেলের অভাবে আলো জ্বালাতে না পেরে পথের পাশে জালানো গ্যাসের আলোয় পড়াশোনা সম্পন্ন করেন । তিনি সংস্কৃত কলেজে ১২ বছর অধ্যায়ন করে একের পর এক ব্যাকরণ, কাব্য অলংকার, বেদান্ত, ন্যায় এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। ১৮৩৮ সালে হিন্দু ল কলেজে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিদ্যাসাগর উপাধিটি তার নামের আগে প্রশংসাপত্রে পান । এই উপাধিটি তার জন্য সুযোগ্য এবং যথার্থ ছিল।

বিদ্যাসাগরের অসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য খুব কম সময়ের মধ্যে মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৮৪১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে হেড পণ্ডিতের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন ।এবং পাঁচ বছর সেখানে শিক্ষকতা করার পর ১৮৪৭ সালে সংস্কৃত কলেজে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।‌ নিজের ভাইকে সাথে রেখে তাকেও একই ভাবে দেবার চেষ্টা করতেন শুধু নিজের সম্পর্কে পরিচিত নন সঙ্গে অন্যান্য অনেক অনেক ছাত্র তাঁর বাসগৃহে থেকে লেখাপড়া করতো। বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির গল্প এদেশে কিংবদন্তির মত প্রচারিত।

১৮৫২ সালের সংস্কৃত কলেজে তিনি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করেন এবং সাথে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক তার আমল থেকেই চালু করা হয়। কর্ম জীবনে প্রবেশের পর থেকেই সাহিত্য রচনা একের পর এক তিনি শুরু করেন এবং সাহিত্যের অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন । সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করার পর তিনি বাংলা সাহিত্যের উন্নত মানের পাঠ্যপুস্তক এর অভাব বোধ করেন এবং তাঁর হাতে ধরে বাংলা গদ্য সাহিত্য আপন পথ খুঁজে পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বাংলা গদ্যের জনক বলে আখ্যায়িত করেন। বিদ্যাসাগরের কৃতিত্বে বাংলায় প্রথম লিপি সংস্কার হয় এবং তিনি তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন । সংস্কৃত থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে সংস্কৃতে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে সীতার বনবাস,‌ ভ্রান্তিবিলাস, বেতাল পঞ্চবিংশতি, কথামালা ইত্যাদি‌ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বর্ণপরিচয়,আখ্যানমঞ্জুরী আজও বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র কবি কালিদাসের লেখা শকুন্তলা অবলম্বনে শকুন্তলা কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যে শেক্সপিয়ার কমেডি অফ এরস্ নাটকের অবলম্বনে ভ্রান্তিবিলাস এবং রামায়ণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন সীতার বনবাস।

ওই যুগে থেকেও সমাজে নারীর প্রতি যে রুচিহীন দৃষ্টিভঙ্গি তা অনুভব করেন এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নারীশিক্ষা বিস্তার ও তার ভিত স্থাপন করা যে অত্যন্ত প্রয়োজন এই দৃষ্টান্তকে মাথায় রেখে তিনি ৩০ টি মডেল স্কুল এবং ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এবং পরবর্তীকালে শিবমোহিনীর রচিত একটি পুস্তকের বিদ্যাসাগরের অসাধারণ দয়ার পরিচয় পাওয়া যায় । শিবমোহিনী ছিলেন বিদ্যাসাগরের বাড়িতে আশ্রিত একজন বিধবা যাকে বিদ্যাসাগর মেয়ে রূপে গ্রহণ করে পরে নিজে হাতে সবকিছু শিখিয়ে পড়িয়ে একজন সু পাত্রের হাতে নিজের সাধ্যমত সবকিছু দিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন । শুধু তাই নয় কতজনকে তিনি নতুন জীবন দান করেন তা অগনিত। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে দেশের ধনী ব্যক্তিদের, অশিক্ষিত ব্যক্তিদের সহায়তায় ছোটলাটের সাহায্যে মেদিনীপুর বর্ধমান জেলায় কতগুলো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যাসাগর মাতৃস্নেহ ছিল অটুট। তার মাকে সম্মান ও সন্তুষ্ট করতে তিনি মায়ের আদেশানুসারে গ্রামে কতগুলো দাতব্য চিকিৎসালয় এবং বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৪৯ সালে তারা অগাধ পরিশ্রমে ক্যালকাটা স্কুল স্থাপন হয়, ১৮৪৯ সালের নাম রাখা হিন্দু মেট্রোপলিটন। এবং পরে বিদ্যাসাগর নামকরণ হয় । পরবর্তীকালে এখানকার সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হন। এরপর এটি কে প্রথম শ্রেণীর, দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজে পরিণত করা হয়। বর্তমান নাম বিদ্যাসাগর কলেজ। সাঁওতালদের করুণ অবস্থার কথা মাথায় রেখে তাদের জন্য একটি স্কুল নির্মাণ করেন।

এতেই তার প্রতিভা খান্ত ছিল না কারণ তিনি শুধু বিদ্যার সাগরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জ্ঞানের সাগর, দয়ার সাগর, মানবতার সাগর, করুনার সাগর, প্রগতিশীলতার সাগর, বিবেকের সাগর। এই সকল বিশেষণই তার জন্য ছিল যথার্থ ও সুপ্রযোজ্য। বিদ্যাসাগর থেকে দয়ার সাগর হবার গল্প ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছিলেন। অজস্র অগণিত মানুষের পড়াশোনার ভার বহন করে তাদের ন্যায়নীতির আদর্শে চালিত করেছিলেন এই‌ দয়ার সাগর। অন্যদের দুর্দিনে নানান রকম ভাবে সাহায্য করে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর সাহায্যে আপন পর কোন ভেদাভেদ ছিল না। এবং সাধারন মানুষের যেকোনো ধরনের অভাব তার মনকে কাঁদাতো। তিনি শিখিয়েছিলেন কোন কাজই পৃথিবীতে ছোট নয়। কারণ তিনি নিজের কাজ নিজেই করতেন তাই তিনি বলেছিলেন নিজের কাজের জন্য অন্যের উপর ভরসা করা কখনই ঠিক নয়। সকলের প্রতি তার দয়ার ‌অন্ত ছিল না এই জন্য সকলে তোকে দয়ার সাগর বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে মাইকেল মধুসূদন কে অনেক অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসাধারণ সমাজ সংস্কার আজও ইতিহাস সাক্ষ্য রাখে তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে ১৮৫৪ সালে জানুয়ারি মাসে বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানান এবং এর জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন পত্র উপস্থাপন করেন। প্রাণপণ যুদ্ধের পর, ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইনে পরিণত হয়। তিনি চিরকাল কুসংস্কার, গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আপষহীন লড়াই করে গেছেন। অন্যদিকে বিধবা বিবাহের সাথে সাথে স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের মতন সমাজের অভিশাপ প্রথম তিনিই দূর করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন তিনি শুধু হিন্দু ছিলেন না, ব্রাহ্মণ ছিলেন না, ছিলেন সত্যি কারের মানুষ। এর মন্তব্য তাৎপর্য মর্মস্পর্শী কারণ যথার্থ মানুষ হওয়া এত সহজ কথা নয়। সুকুমার সেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেন যে তার আগে গদ্য সাহিত্যে চল থাকলে চাল ছিল না এবং মহাত্মা গান্ধী বলেন যে” আমি যে দরিদ্র বাঙালি ব্রাহ্মণ কে শ্রদ্ধা করি তিনি আর কেউ নন তিনি হলেন বিদ্যাসাগর।”

সময়টা স্বাধীনতার প্রাক্কালে,‌ দেশ তখন পরাধীনতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন, গভীর শোষণের শিকার। সাধারণ মানুষেরা নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া ছাড়া অন্য কিছুর ভাবনায় তেমন জো নেই। কিন্ত এই সকল পরিস্থিতিতে বাস করেও তার দূরদর্শী সমাজের প্রতি মনোভাব সত্যিই ভাবনার অবকাশ রাখে না। কি অসম্ভব বুদ্ধি সম্পন্ন? এবং নবজাগরণের অগ্রগতির জন্য যেসকল মানসিকতার পরিচয় রেখে গিয়েছিলেন তা সত্যিই আশ্চর্যৈর বিষয়। ঐ রকম অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে বসবাস করেও যে উন্নত থেকে উন্নততর এবং অসীম মেধার পরিচয় রেখেছেন তা আজও গর্বের এবং প্রশংসার।

এত প্রশংসার উন্মোচন সত্বেও তিনি আজ প্রায় মানুষের মন থেকে বিলীন হতে বসেছেন…….. যার জন্য বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ রূপ পেল তার কৃতিত্ব আজ আমাদের কাছে তুচ্ছ হওয়ার মুখে। এই অগ্রগতিশীল প্রযুক্তিবিদ্যার সমাজব্যবস্থায় আমরা বাস করছি , এরকম উন্নত হয়ে আমাদের লাভ কি? যেখানে বিদ্যাসাগরের মত ব্যক্তিত্ব কে প্রাধান্য দেওয়া হয় না… মানব জাতির এই ধরনের অগ্রগতি অপেক্ষা আদিম যুগে বসবাস করা শ্রেয়। বিদ্যাসাগর আমাদের জন্য সমাজের যে সকল সংস্কার করে গেছেন তার জন্য চির ঋণী থাকলেও বিদ্যাসাগর কৃতিত্বের কাছে কম পড়বে । উনি না থাকলে বাংলা সাহিত্য ধুলিস্যাতের পথে হাঁটত। আজ যতটুকু যা কিছু সাহিত্যের অগ্রগতি এই সবকিছুই ওনার হাত ধরে।

যে রাজ্যে বাংলা ভাষাকে কোন ভাষাই নয় বলে কটুক্তি করা হয় , যে রাজ্যে মহান পুরুষ অপেক্ষা রঙিন পর্দার জগতের মানুষদের ব্যক্তিত্বকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় সে রাজ্যে এগুলি ঘটবে এটা আর নতুন কি ? আসলে বই পড়ে সকলেই শিক্ষা অর্জন করে কিন্তু সঠিক আদর্শে শিক্ষিত হওয়া সকলে হয় না। যিনি আমাদের পথ দেখালেন, সময়ের গাড়িতে চলতে চলতে আমরা তাকেই ভুলতে বসেছি! এই ভাবাবেগ সত্যিই মানুষের জন্য লজ্জাজনক, অপমানের। ধিক্কার তাদেরকে! যারা সবকিছু সংস্কারমূলক কাজের দোহাই দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম বিলীন করার মুখে ধাবিত হচ্ছে। মানুষের বিচার বিবেচনার বিষয়টিকেও পরিবর্তন করা দরকার এই মহান পুরুষের উপর আলোকপাত করা উচিত। উনি আমাদের জন্য এত বড় বড় সংস্কার করে গেছে তাই আমাদের উচিত ওনার মতন ব্যক্তিত্বকে প্রাপ্য সন্মান জানিয়ে উনার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা। কারণ বাঙালি জাতি প্রথমবার বড় হবার ,যোগ্য হবার ,মানবিক হওয়ার ,আধুনিক ও প্রগতিশীল এবং বিশ্বজনীন হওয়ার দৃষ্টান্ত পেয়েছিলেন প্রথম বিদ্যাসাগর এর মধ্য থেকে।

সোনালী সাহা নন্দী

সোনালী সাহা নন্দী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *