নবজাগরণের অগ্রদূত রামমোহন রায় (১ম পর্ব) , দেবাশীষ পাইন

download-1উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরনের ক্ষেত্রে সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।কতিপয় বাঙালি ইউরোপীয় সাহিত্য,দর্শন ও বিজ্ঞানের পঠন পাঠনের পর তাদের চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে।ঐ পরিবর্তিত চিন্তাধারাকে পুঁজি করে তারা বাংলার সার্বিক বিকাস সাধনের জন্য এগিয়ে আসে।এই গোষ্ঠী ইউরোপীয় ভাবধারায় প্রভাবিত ছিল ঠিক কিন্তু তারা সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের অতীত স্বর্ণযুগকে পুনরুদ্ধার করে আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কাজে সমান সচেষ্ট ছিল।প্রাচীন ভারতের সাহিত্য,শিল্পকলা,দর্শন ও বিজ্ঞানের গভীরতা ও বিস্তার নিয়ে ওনারা গর্ববোধ করতেন।বাকিদেরও একই ভাবনায় অনুপ্রানিত করতেন।এটাকেই বাংলা তথা ভারতবর্ষের নবজাগরন বলা হয়।আর ঐ গোষ্ঠীর নেতা ও প্রানপুরুষ ছিলেন রামমোহন রায়।তাই ওনাকে ভারতের নবজাগরনের পিতা সম্বোধন করা হয়।

রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে যখন বাংলা তথা ভারতের সার্বিক সামাজিক সংস্কারের আন্দোলন চলছে ঠিক তখনকার ভারতবর্ষের চিত্রটা একটু দেখে নেওয়া দরকার।ভারতবর্ষ তখন গভীর অন্ধকারে ডুবে।ভারতের চিরাচরিত আধ্যাত্মিক সম্পদকে কালকুঠুরিতে বন্ধী করে কুসংস্কারে ঢেকে রেখেছে।বাল্যবিবাহ,বহুবিবাহ,সতীদাহ প্রথা ইত্যাদি আরও কত শত কুসংস্কারের বোঝা প্রতিদিন সাধারন মানুষকে বইতে ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সইতে বাধ্য করান হতো।সমাজের ঠেকাদারদের হুকুম না মানলে ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দেওয়া হতো। ততক্ষণে ইংরেজ এসেছে কিন্তু তার শাসন তখনও পোক্ত হয়নি।ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো বাংলা তথা ভারতবাসীর মনে দাগ কাটতে পারেনি।এই অন্ধকার অবস্থার মধ্যে রামমোহন জন্মেছিলেন। এবং দুর্দন্ড প্রতাপশালী সামাজপতিদের সঙ্গে লড়াই করে ভারতকে অন্ধকারমুক্ত করেছিলেন।

এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতার কিছু উক্তি খুব প্রাসঙ্গিক।নিবেদিতার লেখা বইয়ে লিখছেন, স্বামীজি সকল ভক্তের কাছে বার বার রামমোহনের কথা উল্লেখ করতেন। স্বামীজি বলতেন,রামমোহনের বেদান্তের দৃষ্টিভঙ্গি,হিন্দু-মুসলমানদের প্রতি সমমনোভাব, ভারতীয় দর্শনের মূল্যবোধের প্রতি প্রেম ও প্রচার, এই তিনটি বিষয়ের জন্য স্বামীজি  রামমোহনকে আচার্যের স্থানে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। রামমোহনের উদারতা ও দূরদর্শিতার পদাঙ্ক অনুসরন করেছিলেন স্বামীজি।

রামমোহন রায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে প্রচুর গল্প শুনতেন। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণায়, “রামমোহন রায় তখনকার বঙ্গভুমির সমস্ত ক্ষুদ্রতা,সমস্ত তুচ্ছতা হইতে বহুদূরে পশ্চিমদিক প্রান্তভাগে স্বর্ণপ্রভামণ্ডিত দিতেছিল, তখন তিনি সেই মানস বঙ্গলোক হইতে দূরাগত সংগীতাঞ্জলির প্রতি কান পাতিয়াছিলেন; সমাজ যখন তাহাকে তিরস্কৃত করিবার উদ্দেশে আপন গৃহদ্বার অবরুদ্ধ করিতেছিল তখন তিনি প্রসারিত বাহু বিশ্ববন্ধুর ন্যায় সেই মানস বঙ্গসমাজের নিত্য উন্মুক্ত উদার জ্যোতির্ময় সিংহদ্বারের প্রতি আপন উৎসুক দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়াছিলেন। সে সংগীত, সে দৃশ্য, ভবিষ্যতের সেই স্বর্গীয় আশারাজ্য যাহাদের সম্মুখে বর্তমান ছিল না, সাহিত্য ছিলনা, জাতিকে তাহারা বর্ণ বলিয়া জানিত, দেশ বলিতে তাহারা নিজের পল্লিকে বুঝিত; বিশ্ব তাহাদের গৃহকোনকল্পিত মিথ্যা বিশ্ব, সত্য তাহাদের অন্ধ সংস্কার; ধর্ম তাহাদের লোকাচার প্রচলিত  ক্রিয়াকর্ম, মনুষ্যত্ব কেবলমাত্র অনুগত প্রতিপালন এবং পৌরুষ রাজদ্বারে সৎ ও অসৎ উপায়ে উচ্চ বেতন লাভ, রামমোহন রায় যদি কেবল ইহাদের মধ্যে আপনার দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখিতেন, যদি সেই  সংকীর্ণ বর্তমানকালের মধ্যে আপনার সমস্ত আশাকে প্রতিহত হইতে দিতেন,তাহা হইলে কদাচ কাজ করিতে পারিতেন না—তাহা হইলে তাঁহার মাতৃভুমিকে আপন আদর্শ লোকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য ও অসম্ভব বলিয়া বোধ হইত”।

পলাশী যুদ্ধের(১৭৫৭) মাত্র পনেরো বছর পরে ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দের বর্ধমান জেলার অন্তর্গত রাধানগর গ্রামে এক বনেদি পরিবারে রামমোহন রায়ের জন্ম। রামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে চাকরি করার সুবাদে রায় উপাধি পান। তখন থেকেই পরিবারের সবাই রায় পদবি ব্যবহার করতে শুরু করেন। ছোটবেলায় আর পাঁচটা সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলের মতো রামমোহন বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় পাঠ শুরু করে। তখনকার দিনে আরবি ফারসি জানা না থাকলে চাকরি পাওয়া মুশকিল হতো তাই রামমোহনকে পাটনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আরবি ফারসি শেখার জন্য। তিনি ভাষা শিক্ষার সঙ্গে ইসলামী সাহিত্য, ইসলামী দর্শন, সুফি সাহিত্যের চর্চা ও কোরাণের পাঠ গ্রহণ করেন। এসবের জন্যই ওনার জ্ঞান ও বুদ্ধি অতি মার্জিত ও সূক্ষ্ম হয়েছিল আর ধিরে ধিরে ওনার ভেতর একেশ্বরবাদের মতবাদ পোক্ত হয়েছিল। সমানভাবে বারানসীতে গিয়ে রামমোহন ভারতীয় সংস্কৃতি ও শাস্ত্রের অধ্যয়ন করেছিলেন। ঘরে ফিরে আসার পর  তিনি সবসময়েই ধর্ম বিষয়ক চিন্তাতেই বিভোর থাকতেন এবং ক্রমশই ধর্মবিষয়ে রামমোহনের নিজস্ব মতবাদ দৃঢ়ভাবে তৈরী হয়। তিনি বুঝেছিলেন যে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মূলতত্ত্ব একই।রামমোহনের ধর্মবিশ্বাস আর প্রাচীনপন্থী বাবার ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাড়িতে নিত্য পিতা পুত্রের সংঘাত হতে থাকত। ঐ সময় মাত্র ষোল বছর বয়সে “হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্মপ্রনালি” নামে একটি হাতে লেখা বই প্রকাশ করেন। বইটির মূলবিষয় ছিল পৌত্তলিকতার প্রতিবাদ  ও একেশ্বরবাদের সমর্থন। বইটি পিতা রমাকান্তের হাতে আসার পর পিতা পুত্রের বিরোধ চরম সীমায় পৌঁছয় এবং রামমোহন গৃহত্যাগ করেন।

গৃহত্যাগ করার পর রামমোহন ভারতবর্ষের নানা প্রদেশ ঘুরে বেড়াতে থাকেন।যেখানেই গেছেন সেখানকার প্রচলিত ভাষাকে রপ্ত করে ধর্মগ্রন্থগুলি পড়েছিলেন।বৌদ্ধদর্শনকে জানার অদম্য কৌতূহল নিয়ে তিনি তিব্বত যাত্রা করেন। বেদ, পুরাণ ইত্যাদি পড়াশোনার সঙ্গে ব্যস, শঙ্কারচার্য্য প্রভৃতি সাধকদের বই চর্চ্চা করতে থাকলেন। ধীরে ধীরে তিনি ব্রাহ্মধর্মের সুস্পষ্ট রূপ বুঝতে পারলেন। মায়ের কাতর অনুরোধে রামমোহন বাড়ি ফিরেছিলেন কিন্ত পুনরায় পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য বাবার সঙ্গে বিবাদ তৈরি হয় এবং পিতা রমাকান্ত পুত্রকে বাড়ি থেকে তারিয়ে দেন। পৌত্তলিকতা বিরোধী প্রসঙ্গে রামমোহন নিজ জবানীতে যা বলেছিলেন, “আমার তর্ক-বিতর্কে আমি কখনও হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করি নাই উক্তনামে যে বিকৃত ধর্ম প্রচলিত আছে, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল”। ১৮০৩ সালে রামকান্ত রায় মারা যাওয়ার পর রামমোহন আবার বাড়ি ফিরে আসেন।রমাকান্ত তার মৃত্যুর দুবছর আগে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিন ছেলের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন,তথাপি রামমোহন ঐ সম্পত্তি বাবার মৃত্যর বহুদিন পর পর্যন্ত দখল নেননি। রামমোহনের মা তারিণী দেবীও ছেলের পৌত্তলিকতা বিরোধী কাজকর্মে ভীষণ বিরক্ত ছিলেন তাই বিধর্মী ছেলেকে পিতার উত্তরাধিকার থেকে ছেঁটে দেবার জন্য সুপ্রীম কোর্টে মামলা করেন। সেই মামলাতে রামমোহনের জয় হয়েছিল।মায়ের সঙ্গে  বনিবনা না হওয়াতে তিনি কাছাকাছি একটি বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। রামমোহন ঐ বাড়ীর সামনে একটি একটি বেদি তৈরি করে তার চতুর্দিকে “ওঁ তৎসৎ” এবং “একমেবাদ্বিতয়ম” এই কথা দুটি খোদাই করিয়েছিলেন। এখান থেকেই তিনি ব্রহ্মপসোনা করতেন। কোথাও যেতে হলে সর্বপ্রথমে শ্রদ্ধাসহকারে মঞ্চটিকে প্রদক্ষিণ করে যেতেন।

১৮০৪ সালে রামমোহন কিছুদিনের জন্য মুর্শিদাবাদের রেজিস্টার ঊডফোর্ডের মুন্সি পদে চাকরি করেন। ঐ সময় তিনি একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম “তুহফত – উল- মুওয়াহিন্দির” (একেশ্বরবাদীদের প্রতি উপহার)। ১৮০৫ সালে রামমোহন সিভিলিয়ান ‘জন ডিগবি’ সাহেবের কাছে কেরাণীর চাকরী গ্রহণ করেন। রামমোহনের বিদ্যাবুদ্ধি ও কর্মদক্ষতা ও কর্ত্তব্যপরায়ণতায় সন্তুষ্ট হয়ে সাহেব কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে দেওয়ানি পদে নিযুক্ত করেন। রামগড়, ভাগলপুর এবং রংপুর এই তিন জায়গায় ১৮১৪ সাল পর্য্যন্ত উনি এই পদে কাজ করেছিলেন।ডিগবি সাহেব অবসর নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে গেলে রামমোহনও চাকরী ছেড়ে ৪২ বৎসর বয়সে কলকাতায় এসে পাকাপাকি ভাবে বাস করতে থাকেন। ১৮৩০ সালে সালের ১৯শে নভেম্বর রামমোহন কলকাতা থেকে বিলেতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এর আগে দিল্লীর সম্রাটের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি পান। রামমোহনের শেষ জীবন ইংল্যান্ডে কাটে। মাঝখানে কিছুদিনের জন্য, ১৮৩২ সালে প্যারিসে যান। ফিরে এসে ব্রিস্টল শহরে ১৮৩৩ এর ২৮ শে সেপ্টেম্বর রাত ২ টার সময়  তাঁর নশ্বর জীবনের শেষ হয়।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *