ধারাবাহিক “ধারাপাত “–(পর্ব -৬)লেখক, সামসুল হক

দেবাদিত্য দেবাংশী

দেবাদিত্য দেবাংশী

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে খুব খারাপ ভাবে আহত হল সূর্য্য। কে কাকে খুন করতে চায় ?  যাদের সাথে প্রতিদিন দেখা হয়,  কথা হয়।এক জায়গায় বসে আড্ডা হয় ।এক পুকুরের-বিলের জলে চাষ হয় পাশাপাশি জমিতে।উৎসব-অনুষ্ঠানে একে-অপরের বাড়িতে উপস্থিত থাকে।তারা পরস্পরকে খুন করতে চায় ? — কেন ? মস্তিষ্কের অনেক রস ক্ষরণের পর বুঝতে বাধ্য হল যে, মনুষ্য সমাজে এমন হয় কিছু নোংরা মানুষের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে ।
ময়ূরেশ্বরে কুস্তোড়-কামারহাটি তে সকাল-বিকেল ই•এফ•আর ও রাপিড অ্যাকশন পুলিশের টহলদারি চলছে। ছোট-ছোট দলে ভাগ  হয়ে যে কোন রাস্তায় ঢুকে পড়ছে সেনা।দুজনের বেশী এক জায়গায় জটলা করলেই অ্যাকশন।ময়ূরেশ্বরে হাটবাজার বন্ধ, স্কুল বন্ধ ।সূর্য্যর পড়াশুনা বন্ধ — তার পড়তে মন লাগে না যে। বাজারহাট স্বাভাবিক হতে প্রায় দু’সপ্তাহ লেগে যায়।আরও প্রায় এক সপ্তাহ পর স্কুল শুরু হল।তখনও ময়ূরেশ্বর হাই স্কুলে প্রায় পঞ্চাশ জন ই•এফ•আর জোয়ান থেকে গেছে।ক্যানেল অফিস মোড়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একটা ক্যাম্প হয়েছে।এই ক্যাম্পটি প্রায় দু’বছর ছিল।ই•এফ•আর জোয়ানরা আরও প্রায় দু’সপ্তাহ থাকার পর চলে যায়।এলাকার সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সম্পর্কটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও উভয় পক্ষের কিছু প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের মধ্যে সম্পর্কটা তখনও অটুট ছিল।কিন্তু সেই মানুষদের তাদের সম্প্রদায় থেকে,এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তাদের পরিবার থেকেও লাঞ্ছনা- গঞ্জনা সহ্য করতে হয় সেই সময়ে ।
বৃটিশ জাতি যে উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষের বীজ ভারতবর্ষের মাটিতে পুঁতে গেছে তাতে তারা সফল।কিছু নোংরা ও বিকৃত মনের মানুষ এবং কিছু স্বর্থান্নেষী মানুষ সেই বীজকে উপযুক্ত পরিবেশ দিয়ে অঙ্কুরিত করে।ক্রমে চারাগাছ তৈরী ক’রে ফেলে সেই বিষবৃক্ষের।আর সেই সময়ের মধ্যে অনেক- অনেক মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাদের যোগ্য অনুগামী তৈরী ক’রে ফেলে তারা।সেই অনুগামীরা চারাগাছকে যথেষ্ট সার-মাটি-সেচ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষের আবাদ করেছে ভারতবর্ষের মাটিতে।  ভারতবর্ষের ইতিহাস- ঐতিহ্য-সংস্কৃতি অস্বীকার ক’রে জন্ম দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার অপসংস্কৃতি । আজও লক্ষ-লক্ষ মানুষকে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য- সংস্কৃতি সম্পর্কে অপব্যাখ্যা বারবার শুনিয়ে মগজ ধোলাই করার মাধ্যমে বিপথগামী করা হচ্ছে।সারা বিশ্বের মধ্যে  ভারতবর্ষ এখন অপবিজ্ঞান আর অপসংস্কৃতি চর্চার প্রধান কেন্দ্র।কালো মানুষের দেশ,  সাঁওতাল- কোল- ভিল- মুন্ডার দেশ এই ভারতবর্ষে কালের প্রবাহে আর্য্য- শক-হুন-পাঠান- মোগল এসেছে বিভিন্ন রূপ নিয়ে।ভারতমাতা সকলকে দু-বাহু বাড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে আপন ক’রে নিয়েছেন।মা-সন্তানের পবিত্র সম্পর্কে উভয়ে একাত্ম হয়েছে — ধন্য হয়েছে।তাদের সকলের মা ভারতবর্ষ — সকলেই ভারত-মাতার সন্তান।ভৌগোলিক- প্রাদেশিক-সামাজিক-ভাষা-ধর্ম সকাল প্রকার বিভিন্নতা থাকার পরও একমাত্র দেশ ভারতবর্ষ মানবের মহামিলন ক্ষেত্র ।এদেশ প্রেম-সেবা-সহিষ্ঞুতা ও সংযমের দেশ । অতীতের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।ইহায় ভারতবর্ষের মহামিলনের পবিত্র সংস্কৃতি।কোন কাব্য বা মহাকাব্য ভারতবর্ষের ইতিহাস নয়।এমন মানবের মহামিলন ক্ষেত্রে জন্মে নিজেকে গর্বিত ও ধন্য মনে করে সূর্য্য।
দাঙ্গা বিধ্বস্ত এই তিন সপ্তাহে বই নিয়ে বসলেও পড়াশুনায় একেবারেই মন লাগাতে পারেনি সূর্য্য।নিজের চোখে দেখা সেই বিশৃঙ্খল ঘটনা তাড়া করে তাকে।এই কয়েকদিন সময়ের মধ্যে দু’এক জনের প্ররোচনায় ধূমপানের বদনেশায় অভ্যস্ত হয়ে যায় সে।কিছুদিনের মধ্যে দাঙ্গার  মানসিক আঘাত কাটিয়ে আবার তার লেখাপড়া নিয়ে ডুবে যায় সূর্য্য।সামনে তার বিরাট পরীক্ষা।সে জানে না এই পরীক্ষায় সঠিক কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়।সে নিজেই তার নিজের পরিচালক- প্রযোজক ও সম্পাদক।প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর পড়াশুনা শেষ ক’রে এই প্রথম সরকারী সেকেন্ডারি স্কুল বোর্ডের পরীক্ষায় বসবে সূর্য্য।প্রাইমারী স্কুল বোর্ডের যে পরীক্ষা চতুর্থ শ্রেণীর পর নেওয়া হতো আগে, বামফ্রন্ট সরকার সেই পরীক্ষা বন্ধ ক’রে দেয়।মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে ছাত্র- ছাত্রী অপেক্ষা তাদের মা-বাবাদের মাথা ব্যথা সেকালেও ছিল, এখনও আছে।সেই রীতি এতটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছায়নি তখন।তবে সচেতন অভিভাবকরা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। মানুষ তার নিজের ভবিষ্যত জীবনের কারিগর নিজেই — এই কথাটা যে খুবই সত্যি তা বলা ঠিক নয়। আবার কথাটা একেবারে ভুলও নয়।উপযুক্ত পরিবেশ,  সঠিক পরামর্শ ও পথ নির্দেশ একটা মানুষের জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে।
 সূর্য্য প্রকৃত পক্ষেই তার নিজের জীবনের কারিগর সম্পূর্ণ নিজেই।একটিমাত্র বিষয় ছাড়া তার জীবনে সে যাকিছু করেছে তা ভুল বা ঠিক যাই হোক না কেন, সম্পূর্ণ নিজের চিন্তা-ভাবনায়।আজও পর্যন্ত সে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ একাই।মাধ্যমিক পরীক্ষা খুব কাছে।স্কুলে চারটি বিষয়ের সিলেবাস পড়িয়ে শেষ করতেই পারেনি।তারপর ঐচ্ছিক পদার্থবিদ্যার সপ্তাহে দু’দিন ক্লাস ছিল — অর্ধেক সিলেবাস পড়ানো হয়েছে। তার তো কোন গৃহ শিক্ষক ছিল না সাহায্য করার।এক হাজার নাম্বারের মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে হবে তাকে সম্পূর্ণ একার শক্তি-ক্ষমতা-যোগ্যতায়।স্নায়বিক চাপ বেড়েই চলেছে।নিজের মতো ক’রে প্রস্তুতি ও কঠোর পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল সে।স্নায়ুর চাপ কিছুটা কমল তাতে ।
উত্তেজনা-অপেক্ষার শেষ।মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হল সূর্য্যর।সাঁইথিয়ার গার্লস হাই স্কুলে সেন্টার।প্রথম দিন বেশ কিছুটা সময় হাতে রেখেই গেল।গ্রামের আরও দু’জন ছিল তার ব্যাচে।তাদের সাথে আগেই কথা বলা ছিল যে, এক সাথে লাইনের বাসে যাতায়াত করবে।পরীক্ষা শুরু হল যেভাবে, শেষও হল ভালো ভাবেই।পরীক্ষা হলের বাইরে অনেকের মতো তার জন্য কেউ অপেক্ষা করবে না সেটা তার জানাই ছিল।বরং তার জন্য বাইরে কেউ অপেক্ষা করলে তার অস্বস্তি বোধ হতো ।  প্রথম পরীক্ষা এবং ইংরেজী ও গণিত পরীক্ষার দিন খোঁজ নেয় সূর্য্যর বাবা ।  তার মা-তো বাড়ি ফিরলেই খোঁজ নিত প্রতিদিন ।  মাধ্যমিক পরীক্ষার পর রেজাল্ট আউট ও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের একটা অবকাশ থাকতো তখন ।  এই সময়টা অনেকে সুন্দর পরিকল্পনা ক’রে কাটাতো, ভালো কাজে লাগাতো ।  এই সময়টা সূর্য্য পরিকল্পনাহীন ভাবে আড্ডা মেরে আর তাস খেলেই কাটিয়ে দেয় ।  তবে সপ্তাহে দু-তিন দিন তাদের বলদের সারা দিনের খাবার খড়ও কেটে দিত ।
সেই সময় তাদের গ্রামে যুবকদের আড্ডা মারার একটা খুব ভালো জায়গা ছিল ।  প্রায় সারা গ্রামের যুবকদের সেখানে কম-বেশী যাতায়াত ছিল ।  সূর্য্যর এক জ্যেঠুর গোয়াল বাড়ীর দুটো কোঠাঘর ছিল সেই জায়গা ।  এখানে ভালো মানুষের ভালো আড্ডা যেমন বসতো, তেমনই তাসেরও আড্ডা বসতো ।  সারাদিন সেখানে দু-চার জন থাকতোই । কেউ- কেউ আবার রাতেও ঘুমিয়ে থাকতো ।
সামসুল হক

সামসুল হক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *