ধারাবাহিক “ধারাপাত “(পঞ্চম পর্ব) লিখেছেন, সামসুল হক

দেবাদিত্য দেবাংশী

দেবাদিত্য দেবাংশী

সামনে এক বছর পর খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রথম বোর্ড পরীক্ষা সূর্য্যের।পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষৎ-এর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে হবে তাকে দশম শ্রেণীর শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার পরেই।একটু হলেও তার মধ্যে ভীতি তৈরী হয়।নিজের ক্ষমতার সবটুকু দিতে থাকে লেখাপড়ায়। ক্লাসে সব সময় সব বিষয়বস্তু পরিস্কার হয় না।না বোঝা বিষয়গুলো নিজেই বিভিন্ন বই থেকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করে।কোথায় যেন একটা ঘাটতি অনুভব করে ভিতরে।তার চাপা স্বভাবের জন্য কাউকে বলতে পারে নি প্রকাশ করে । দশম শ্রেণীতে এসে সূর্য্য ক্লাসে পিছিয়ে পড়েছিল বলাটা ঠিক হবে না । আসলে সে তার দিক থেকে একই অবস্থানে ছিল । যে চার জন তার আগে ছিল,  প্রকৃতপক্ষে তারাই এগিয়ে গেছে । ওদের যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়েছিল আর উপযুক্ত গাইড করা হচ্ছিল । তখন নবম ও দশম দুই শ্রেণীর সিলেবাস নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা হ’ত । তাই সচেতন অভিভাবকরা নবম শ্রেণী থেকে তাঁদের ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার বিশেষ যত্ন নিতেন । অবশ্য সূর্য্যের ক্ষেত্রে সাধারণ যত্নেরও কোন ব্যবস্থা ছিল না । ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে শোনা আর বই পড়া, এই ছিল তার ভরসা । তাকে খুব কাছে থেকে দেখে বুঝেছি যে,  লেখাপড়া বা যে কোন বিষয়েই ধারের থেকে সে তার ভাবেই বেশি কাজ করে । গণিত আর ইতিহাস এই দুটি বিষয় বরাবরই তার ভালো লাগতো না, যদিও চার জন বিভিন্ন লেখকের চারটি ইতিহাস বই ছিল তার নবম-দশম শ্রেণীর । আর গণিতে — বছরে দু-দিস্তা খাতায় তার চলে গেছে নবম শ্রেণী পর্যন্ত । গণিত বিষয়ের বাড়ির কাজ মাসে দু-চার দিন ক’রে আনতো সে । ক্লাসে যে বছর যে মনিটরই থাক না কেন অঙ্কের খাতা না দেওয়ার জন্য সূর্য্যের নাম লিস্টে লিখে অঙ্কের স্যারের হাতে জমা দিত না । তাই ছাড়া ক্লাসের বাকী ছাত্র-ছাত্রীরা এবং স্যারও বুঝতে পারতেন না । তবে বাংলা এবং ইংরেজী হাতের লেখা সে প্রতিদিন ক্লাসে লিখে নিয়ে আসতো । দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সূর্য্যের গণিত চর্চার ধরণটা একটু অন্যরকম ছিল । বারো ক্লাস সে বেশিরভাগ অঙ্কের সমাধান পাথরের স্লেটে করতো । তাতে লিখতো খড়ি মাটির তৈরী পেন্সিল দিয়ে । প্রশ্নমালার সহজ-সাধারণ সমস্যা গুলো শুধু পড়ে আর মানসিক ক্যালকুলেশন ক’রৈই ছেড়ে দিত । হার্ডার প্রবলেম গুলো স্লেটে সংক্ষিপ্ত ক্যালকুলেশন ক’রে উত্তর মিলিয়ে দেখে নিতো । যদি এক চান্সে সমাধান ঠিক হয়ে যেত তাহলে সেই সমস্যার সমাধান অঙ্কের খাতায় উঠতো না । যে সমস্যা গুলোর সমাধান এক চান্সে স্লেটে করতে পারতো না বা নিজে করতে পারতো না কেবলমাত্র সেগুলোই অঙ্কের খাতায় উঠতো । যে সমস্যা গুলো সে নিজে সমাধান করতে পারতো না সেগুলো অঙ্কের ক্লাস টিচারকে বলতো । গণিত চর্চার এই পদ্ধতি যে ঠিক নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না । গণিতের প্রত্যেক সমস্যার সমাধান ছাত্র-ছাত্রীদের একাধিক বার করা উচিত এবং প্রত্যেক বার খাতাতেই করা উচিত । সমস্যা এবং তার সমাধান পদ্ধতি চোখ-মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে সেট করা দরকার বারবার চর্চার মধ্য দিয়ে । তাহলে পরীক্ষার হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব । নবম শ্রেণীর বাৎসরিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকে সূর্য্যের বাবা প্রায়ই মন্তব্য করতেন যে, মাধ্যমিক পরীক্ষায় হয়তো তার ফার্স্ট ডিভিশন থাকবে না । কিন্ত ছেলের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবতেন না । একটু কষ্ট ক’রে যা করেছিলেন তা হল, সকাল-বিকেল-সন্ধ্যায় কিছু সময় দিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে এ•বি•টি•এ প্রকাশিত টেস্ট পেপারের গণিত ও ইংরেজী বিষয়ের প্রায় সব পেজের উত্তর গুলো খাতায় করিয়ে দিয়েছিলেন ।
 কে কি শিখবে, কিভাবে, যদিও তা ব্যক্তি বিশেষে বিভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের যে গতানুগতিক শিক্ষা-শিক্ষণ পদ্ধতি তা নির্দিষ্ট নিয়ম মতো পঠন-পাঠন ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই শিখতে হয় । পাঠ্য বই এর প্রত্যেক পাতা বারবার পড়া আর ক্লাসে শিক্ষক মহাশয়দের পাঠদান ও আলোচনা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনা — এই ছিল সূর্য্যের লেখাপড়া শেখার পদ্ধতি । বিষয় ভিত্তিক নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নোত্তর পড়া ও তৈরী করা তার অভ্যাস ছিল না । এই ব্যাপারে তাকে সাহায্য করার কেউ বা কোন সহায়ক বইও ছিল না । বাংলা-ইংরেজী নোটবই অবশ্য পাঠ্য বইয়ের সাথেই কিনে দিতেন তার বাবা । বাংলা নোটবই থেকে পাঠ্যাংশের উৎস নির্দেশ, সংক্ষিপ্তসার আর ভাবার্থ ছাড়া অন্যকিছু পড়তো না সে । আর তাদের সময়ে ইংরেজী ভাষা স্কুলে প্রথম পড়ানো হতো ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে । মাধ্যমিক পর্যন্ত সরকারী যে পাঠ্যবই ছিল ইংরেজী ভাষার তা থেকে ভাষাটা ঠিক ভাবে শেখার কোন সুযোগ ছিল না । ইংরেজী নোটবই থেকে নতুন-নতুন শব্দের শব্দার্থ ও প্রতিশব্দ দেখতো শুধু । তার ভরসার জায়গা ছিল ক্লাসে শিক্ষক মহাশয়দের পড়ানো । মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত কোন পরীক্ষায় বিষয় ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প’ড়ে বা মুখস্থ ক’রে সূর্য্য পরীক্ষার হলে যায় নি । তার নিজের পাঠ্যবই পড়া আর ক্লাসের শিক্ষক মহাশয়দের পড়ানো ও বিষয় ভিত্তিক আলোচনা শোনা — এই দুই জানাকে সঠিক ভাবে সংযুক্ত ক’রে সকল ক্লাসের পরীক্ষা খুব ভালো ভাবেই উতরে গেছে সে । শুধু অসফল হয়েছিল অষ্টম শ্রেণী ও দশম শ্রেণীর জাতীয় স্কলারশিপ পরীক্ষাতে ।
 সূর্য্য তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র । পারিপার্শ্বিক এক ঘটনা তার মন-ভাবনাকে বিষাদময় ক’রে দেয় । এখনও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে খুব মন খারাপ করে তার । ১৭-ই এপ্রিল ১৯৯১ সাল । সেদিন ঈদ-উল-ফিতর । ঈদের নামাজ শেষ হয়েছে মাত্র । যারা ঈদগাহ্ থেকে সরাসরি নিজের বাড়ী গেছে তাদের টিফিন করা হয়েছে । আর যারা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়ী ঘুরে ঈদের শুভেচ্ছা ও সালাম জানাতে গেছে তারা তখনও বাড়ী ফেরে নি । পাশের লাগোয়া গ্রাম,  মাঝে কেবল ১০ নং শাখা ক্যানেল,  ময়ূরেশ্বর থেকে ছোট-ছোট দল বেঁধে বেশ কয়েকটা মানুষের দল কুস্তোড় গ্রামের দিকে ছুটছে । ময়ূরেশ্বরের আকাশে স্থানে-স্থানে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠছে । জানা গেল ময়ূরেশ্বরে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছে । কুস্তোড় গ্রামের বেশ কিছু লোক দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ল সেই দাঙ্গায় যোগ দিতে । ময়ূরেশ্বরের অধিকাংশ মানুষ তাদের সাথে আবার গ্রামে ফিরে গেল । কিছু মানুষ এবং অধিকাংশ মেয়েরা থেকে গেল । সূর্য্য খবর পেয়ে এক দৌড়ে ময়ূরেশ্বরে চলে যায় । তিন জায়গায় প্রকাশ্য অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা চলছে তখন । মুসলিম পাড়ার ভিতরে ঢুকে জিজ্ঞাসাবাদ ক’রে খুব সাবধানে একটা দাঙ্গাক্ষেত্রে পৌঁছে গেল সে । অবাক হয়ে দেখে — দুপক্ষ পরস্পরের দিকে তীর-ইঁট-ব্যালেস-বোমা ছুড়ছে । কোন পক্ষ এগিয়ে যাচ্ছে — বিপক্ষ আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দিলে আবার তারা পিছু হটছে । যে পক্ষ বেশী পিছিয়ে যাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ীতে বিপক্ষরা আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে,  লুটপাট করছে । সে ছিল অত্যধিক বেদনা দায়ক ঘটনা । সূর্য্যর হঠাত ইচ্ছে হল অন্য এক লড়াই ক্ষেত্রে যাবে । এখান থেকে সে জানতে পেরেছে আর কোন কোন জায়গায় লড়াই চলছে । যেতে গিয়ে পাড়ার ভিতর দেখে দাঙ্গায় এক জনের পা কেটে দেওয়া হয়েছে । তাদের বাড়িতেই সূর্য্য আটকে গেল । রটনা-গুজব শুনতে-শুনতে বেলা ১ টা বেজে গেল । খুব ক্ষিদে পেয়েছিল তার । তাই সেখান থেকে সোজা বাড়ী ফিরে এল । এই দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে ছিল ময়ূরেশ্বর, কুস্তোড়, ব্রাহ্মণবহরা ও কামারহাটি এই চারটি গ্রাম । দফায় দফায় বেলা ৩ টে পর্যন্ত দাঙ্গা চলে । ইতিমধ্যে রিজার্ভ পুলিশ এসে যায় । স্থানীয় থানার নিষ্ক্রয়তার জন্য দাঙ্গাটা বিরাট রূপ ধারণ করে । থানার পুলিশ শুধু মজা দেখেছিল সেদিন । রাতে শ-দুয়েক ই•এফ•আর জোয়ান আসে । তাদের ময়ূরেশ্বর হাই স্কুলে থাকার ব্যবস্থা করা হয় । দাঙ্গার রাতেই ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড় চলে । পরের রাত থেকে উভয় সম্প্রদায় রাতে মাঠে ঘুমাতো । এই ভাবে আট কি দশ দিন চলে । এর মধ্যে অবশ্য পুলিশ আর কোন ধরপাকড় করেনি । সূর্য্য ও এক রাত লঙ্কার জমির ভিতর ঘুমিয়ে ছিল । তার পর গ্রামের ঠিক মাঝখানের একটা পাকা বাড়ীতে ঘুমাতে যেত, বাড়িতে বলে যেত মাঠে যাচ্ছে । ঐ বাড়ীতে শুধু মা-ছেলে থাকতো । প্রতি রাতে ২-টো পর্যন্ত তাস খেলা চলতো । তার পর পাঁচ জন মিলে গ্রামটা পুরো ঘুরতো । ভোর রাতে এসে ঘুমাতো ওরা । এই দশ রাতের কাহিনী নিয়ে একটা সিনেমা হতে পারে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *