ধারাবাহিক উপন্যাস “ধারাপাত”(১৪ পর্ব) লেখক, সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_nসুচেতনা ছাত্রাবাসটি ছিল বীরভূম পুলিশ লাইনের দক্ষিণ দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোডের ধারেই ঈদগাহ্ মাঠের পূর্বে অবস্থিত, জায়গাটা ছিল ওয়াকাফ-এর থেকে লিজ নেওয়া।সিউড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে পুরন্দরপুর-বোলপুর রোডের পূর্ব-পশ্চিম দু’ধারে ওয়াকাফ বোর্ডের বিশাল সম্পত্তি আছে । পূর্ব দিকের উত্তর অর্ধাংশ পশ্চিমবঙ্গ সরকার লিজ নিয়ে বীরভূম পুলিশ লাইন ও পুলিশ আবাসন করেছে।এর পরেই পুলিশ লাইনের সীমানা লাগোয়া দক্ষিণ দিকে ঈদগাহ্, তার পাশেই পূর্ব দিকে ওয়াকাফের মুসলিম গার্লস হোস্টেল আর পশ্চিমে নব নির্মিত বয়েজ হোস্টেল। তারপর বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা।এই মাঠে বিকেলে লোকজন বেড়াতে আসে, একদল ছেলে ক্রিকেট খেলে, অন্য দল ফুটবল। আর দক্ষিণের শেষ প্রান্তে কবরস্থান।প্রায় চৌদ্দশো-পনেরশো ফুট লম্বা এই ওয়াকাফ সম্পত্তির পূর্ব দিকের সীমানা বরাবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোড চলে গেছে। এই রাস্তার ধারেই সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ অবস্থিত । পুরন্দরপুর-বোলপুর রোডের পশ্চিম অংশের ওয়াকাফ  সম্পত্তির উত্তর অর্ধাংশ পশ্চিমবঙ্গ সরকার লিজ নিয়ে পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ড( বর্তমান নাম চাঁদমারি মাঠ ) ও পুলিশ আবাসন করেছে । এই অংশের মধ্যে একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ও আছে। পশ্চিমের অংশটা পূর্বের অংশের তুলনায় চওড়ায় একটু বেশি। এর দক্ষিণের বাকী অর্ধাংশে একটা বড়ো ফাঁকা মাঠ যা সকল- বিকেল জনসাধারণের বেড়ানোর মাঠ ও ছেলেদের খেলার মাঠ হিসাবে ব্যবহার হয় । দক্ষিণের শেষ প্রান্তে কবরস্থান । সরকারের লিজ নেওয়ার সময় এবং তারপরেও বেশ কিছু প্রভাবশালী ও স্বার্থান্নেষী মানুষ রাস্তার ধারে ওয়াকাফের বেশ কিছু সম্পত্তি নয় শত নিরানব্বই বছরের জন্য খুব কম পয়সায় ব্যক্তিগত লিজ নিয়ে নেয় । সেই সম্পত্তিগুলো এখন হাত পরিবর্তন হয়ে বাড়ী-ঘর ক’রে লোকজন বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য করছে । এই রকম একটা বাড়িতেই সুচেতনা ছাত্রাবাস। নীচের তলায় রাস্তার ধারে তিনটে ঘর আর ভিতরের দিকে দুটো ঘর । উপরের তলায় চারটে রুমে বাড়ীর মালিকরা দুভাই বসবাস করেন । বড়ো ভাই ডব্লিউ-বি-সি-এস অফিসার আর ছোট ভাই হাই স্কুল শিক্ষক।   ছোট ভাইয়ের অংশে সূর্য্য একটা বেড ভাড়া নিয়েছিল রাস্তার ধারের রুমে। এই রুমে চারজন থাকতো।   সূর্য্য একা প্রথম বর্ষের, বাকীরা কলা বিভাগের কেউ দ্বিতীয় বর্ষের, কেউ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল।রাস্তার ধারে হওয়ায় এই রুমে বাইরের ছাত্ররা উঠাবসা করতো। সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পড়াশুনার থেকে আড্ডা বেশি চলত।সূর্য্য কাউকে কিছু বলতে পারে না কিন্তু ভিতরে-ভিতরে খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকে।   ছোটবেলা থেকে তার নৈশব্দ, নির্জনতা ও একা-একা থাকা অভ্যেস । কথা বলার থেকে অনুভব করে বেশী । এই পরিবেশে সে একেবারেই পড়াশুনায় মন দিতে পারছে না। তার উপর সপ্তাহে পাঁচ দিন সাম্মানিক বিষয়ের টিউশন চলছে।এর আগে এই রকম পরিবেশে বসবাসের কোন রকম ধারণা বা কল্পনা ছিল না তার ।     অকল্পনীয় এই পরিবেশে তার নতুন-বিচিত্র অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা হতে থাকে। যে কাজের জন্য আসা সেই আসল কাজে বেশ ফাঁকি থেকে যাচ্ছে। সবকিছু অনুভব ক’রে ও দেখে সূর্য্যর কাছে পুরো বিষয়টা এক গজ-মচ্ছব ব্যাপার মনে হয় । সূর্য্যর মতো শান্ত-মুখচোরা ও গাঁইয়া ছাত্রের শহরের ছাত্রাবাস বা কলেজ হোস্টেলে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগেই ।

যাই হোক, মাসখানেকের মধ্যেই সূর্য্যর রুমের একজন ছাত্র অন্যত্র চলে যায় এবং কয়েকদিন পর সেখানে প্রথম বর্ষের একজন নতুন ছাত্র আসে। ছেলেটি বেশ মিশুকে ছিল । দু-চার দিনে সূর্য্যর সাথে ভালই ভাব জমে যায় । ইতিমধ্যেই পেছনের দু-বেডের একটা রুম খালি হয়ে গেল ।  সূর্য্য প্রথম বর্ষের ছাত্রটিকে সঙ্গে নিয়ে পেছনের দু-বেডের রুমে চলে যায়। এখানে এসে পরিবেশ খুব শান্ত পেয়ে স্বস্তি পেল সে । ধীরে-ধীরে ছাত্রাবাস জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে সূর্য্য ।তখনও ওয়াকাফের বয়েজ হোস্টেল তৈরী হয়নি ।

শহরের জীবনে থিতু হয়ে নিজের পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সূর্য্য । প্রথম-প্রথম মাসে দু’বার বাড়ী আসতো । পরে মাসের শেষে একবারই বাড়ী আসতো মাসিক খরচ নিতে । নতুন পরিবেশে আর পড়াশুনার চাপে সে তার গ্রাম্য প্রেমিকার কথা প্রায় ভুলেই গেল । মনে সেই অনুভূতি আর কিছুটা টান থেকে গেলেও প্রকট হয়ে মনে-ভাবনায় আসে। আসলে দুজনের দেখা সাক্ষাত সম্পূর্ণ বন্ধ অনেকদিন থেকেই । ইংরেজীতে একটা কথা আছে,— আউট অফ সাইট ইজ টার্ন্ড আউট অফ মাইন্ড, সূর্য্যর ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটল।     কলেজ- ক্লাস- টিউশন সবকিছুর মধ্যে পুরান প্রেমকথা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। সূর্য্যদের ব্যাচে সেবার ষোল জন্ ক্লাস করতো রসায়ন সাম্মানিকে। এই ব্যাচের একটা খুব খারাপ স্বভাব দেখা দিল এক মাস ক্লাস হওয়ার পর থেকেই । এরা সবাই গণিত আর পদার্থবিদ্যার পাশ কোর্সের ক্লাস সম্পূর্ণ বয়কট করল। সূর্য্যর খারাপ লাগলেও সবার সাথেই একমত হতে হয় । তাছাড়া অনেক কথা ও টিটকারিতে পড়তে হতো তাকে। এই ব্যাচের রসায়ন সাম্মানিকের ছাত্র-ছাত্রীরা আর কখনোই পাশ কোর্সের কোন ক্লাসই করেনি । সুতরাং গণিতের  আরও একটা টিউশন বাড়লো সূর্য্যর । এভাবেই প্রথম বর্ষ শেষ হল । দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হল। বেশ ভালোই কাটছিল দিন । শরীর-স্বাস্থ্য বেশ সুন্দর হয়ে উঠল। সাম্মানিকের পড়াশুনার চাপে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন একেবারেই ফিকে হয়ে গেল।তাছাড়া এই স্বপ্নের স্রষ্টাও এই বিষয়ে আর কোন কথা বলেন না ।     প্রথম বর্ষের ভর্তি শেষ । এবারও প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হতে সেপ্টেম্বর হয়ে যায়।

কলেজের রসায়ন বিভাগের পাশেই পনের-বিশ বছর বয়সের এক বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল । হয়তো আজও আছে সেই গাছটা । গাছের চারদিকে গোল ক’রে বাঁধানো বেদী ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জন্য । একদিন সাম্মানিকের প্রথম ক্লাসের পর বাইরে বেরিয়ে সূর্য্য দুজন ছাত্রীকে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচের বেদীতে বসে থাকতে দেখে।অসতর্ক ভাবে তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে সূর্য্য । একজন বেশ স্বাস্থ্যবতী আর অন্যজন খুব পাতলা যেন হাড়ের খাঁচাটা চামড়ায় ছাওয়ানো মাত্র।এই দৃষ্টি যে তার জীবনের অনেক হিসাব বদলে দেবে তা জানতো না সূর্য্য। পাট-কাঠির মতো পাতলা মেয়েটার মুখে সূর্য্যর দৃষ্টি আটকে গেল। এক অচীনলোকের তীব্র আকর্ষণ আর হাতছানি ছিল ঐ মুখে । তার শরীরে কোথাও কোন নারীত্বের চিহ্ন ছিল না তখন।     মুখে-গালে মাংস ছিল না তাই দাঁতগুলো আর চোখের নীচের হাড় দুটো উঁচু দেখাচ্ছিল। চুল ববছাঁট করা বক্ষ সৌন্দর্যহীনা ও যৌবনহীনা এক বালিকার মতো দেখিতেছিল সে । এই পর্যন্ত দেখে নিজেকে ফিরে পাই সূর্য্য,নিজের প্রয়োজনে চলে যায় সে ।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *