ধারাবাহিক উপন্যাস ” ধারাপাত” ( পর্ব -১১) লিখেছেন- সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_n

সময়, সে যে কোন মাত্রায় বাঁধা কার সাথে কেমন ভাবে কে জানে।কাকে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় — কেউ কি জানে হায় !  কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও সময়কে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা কি যায় ?  কেউ-কেউ অল্প শ্রমেই পুরস্কৃত হয়।আবার অনেক বেশী পরিশ্রম কোরেও পরাজিত হয় সময়ের কাছে অনেকেই।তার যাকে ভাল লাগে আদরে রাখে, মন তার না পেলে কোন গাছে ফল কি ফলে ?  আরো একটু বেশী যত্ন নেওয়াই যেত সূর্য্যর।সময়ের স্রোতের সাথে সবার মতোই এগিয়ে চলেছে সে।না চাইলেও এগিয়ে যেতেই হয়।কেউ জাহাজে, কেউ ভাঙ্গা নৌকায়, কেউ অন্য কোন ভেসে থাকা অবলম্বনে আবার কেউ হাবুডুবু খেয়ে। গতিই শেষ কথা, থেমে থাকার কোন নিয়ম নেই সৃষ্টিতে।থেমে যাওয়ার অর্থ ধ্বংস নিশ্চিত ।

শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে সময়ের স্রোতে ভেসে অন্য এক জগতে সূর্য্য।শরীর-মন-মগজ সেই নতুন জগতের বিকিরণ শোষণ কোরে এক অপূর্ব-অজানা অনুভূতিতে উদ্ভাসিত।নতুন এক সৌন্দর্য জগতে শুভাগমন। সময়ের এক নব দ্বরোদঘাটন।বুকে বল, মনে নির্ভীকত, নব-নব ভাবনার আনাগোনা।সে যেন সব পারে, সব পারবে।প্রকৃতির নব-নব রঙে রঞ্জিত হয় মন-ভাবনাগুলো।সে এক অনির্বচনীয়-অপূর্ব অনুভুতি মনে-শরীরে — সুদূর যেন অতি নিকটে।স্বপ্নগুলো যেন অচিরেই ধরা দেবে এসে।এ কোন্ জগতে সূর্য্য ?  বাতাসে এ কোন্ সঙ্গীত বাজে ? — তালে-তালে নূপুরের সুমধুর ধ্বনি।কোন দেবতা কি ছুঁয়ে গেল তাকে ?  এ কোন্ সন্ধিক্ষণ ? — হাজারো প্রশ্ন মনে।যাই হোক, ভালতো লাগে — সবই সুন্দর ।  সবারই বুঝি এমন হয় ? এমনি ভাবেই রঙ লাগে তনু-মনে ?  প্রকৃতি-সময়ের এ-হল সবচেয়ে বড়ো দান মানুষের জীবনে।যে অবস্থায় এই দান দেওয়া হয় তখন কেউ তার সঠিক মূল্য বোঝে না।যাদের বোঝানোর মানুষ থাকে তাদের মধ্যেও কম জনই বোঝে এর মূল্য আর শক্তি কতখানি।অধিকাংশ মানুষই আমৃত্যু বোঝে না আর বোঝার চেষ্টাও করে না এই অমূল্য দান কি-কেমন-কেন।এ-শক্তির অনুভবে মত্ততা লাগে।মনে-শরীরে যেমন উন্মাদনা আসে তেমনি অদ্ভুত এক ভাল লাগাও আছে।বেশিরভাগ মানুষ এর দাসত্ব করে।আর জ্ঞানীরা এর রূপ-রস-সুগন্ধ-সৌন্দর্য আস্বাদন কোরে খুঁজে নেয় জীবনের মানে।এই নবাগত যৌবন শক্তি সূর্য্যকে চঞ্চল করে।মন-শরীরে উন্মাদনার দোলা দেয়।অজানা এই শক্তির উপরে না পারে সে জয়ী হতে, না পারে দাসত্ব করতে।অজ্ঞাত এক অবস্থায় ভেসে থাকে মাঝামাঝি ।

আমাদের সূর্য্য কথা কম বলে।কথার থেকে তার অনুভুতি ভাবনা বেশী অনেকগুণ।নতুন জগতের অদ্ভুত-অজানা সেই শক্তি শরীরে-মনে গভীর ভাবে অনুভব করে সে।যেদিকে তাকাই সব সুন্দর।যেন সারা প্রকৃতি তার জয়ের দিকে চেয়ে।এমন আকুতি যেন সে জিতলেই সব তার হয়ে যাবে।কিন্তু কি সেই যুদ্ধ ?  কেমন কোরে জেতা যায় ?  — কিছুই জানে না সূর্য্য।সমবয়সী মেয়েদের আগের থেকে অনেক বেশী সুন্দরী-আকর্ষণীয় ও লাবণ্যময়ী লাগে।মনে পড়ে যায় তার বাবার কথা।সূর্য্যর দাদা কুস্তোড় জুনিয়র হাই মাদ্রাসা থেকে ক্লাস এইট পাশ কোরে কুসুমি হাই স্কুলে ক্লাস নাইন-এ ভর্তি হল।সেইদিন সন্ধ্যায় সূর্য্যর বাবা তাঁর বড়ো ছেলেকে ডেকে বললেন — ” ক্লাস নাইন-এ পড়তে যাবি।দেখবি ক্লাসের শাড়িপরা মেয়েগুলোকে দেখতে খুব ভাল লাগবে তোর।বারবার দেখতে ইচ্ছে কোরবে।কিন্তু বাবা, এই ভাললাগাকে খুব বেশী গুরুত্ব দিলে অনেক ক্ষতি হবে।কথাটা যেন মাথায় থাকে।”যদিও সূর্য্যকে এমন কথা বলেন নি কোনদিন তবুও কথাটা খুব মনে পড়ে তার ।

সূর্য্য তখন দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ।সতের পেরিয়ে আঠারতে পড়েছে।ভিনগ্রামের এক মেয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্রী।সূর্য্যকে নিয়ে তার মনে রঙিন নক্সা আঁকে।মেয়েটার সেটা হয়তো ছিল বয়সের উন্মাদনা — হয়তো বা সত্য অনুরাগ।জানা হয়নি আজও।সূর্য্যর অজান্তেই এমনটা ঘটেছিল।মাঝে-মাঝে দেখা হতো, কথা হতো ছুটিতে পিসির বাড়ী বেড়াতে এলে।সূর্য্যদের পাড়ায় তার পিসির বাড়ী।সেই মেয়েটি হয়তো ইঙ্গিতে জানিয়েছিল তার ভালোলাগার, কাছে যেতে চাওয়ার কথা।কিন্তু এ-বান্দা কি বোঝে সেসব ?  সূর্য্য তো এক আত্মভোলা ছেলে। নিজের মাঝেই ডুবে থাকে, বড়ো হয়েও চাই না হতে বড়ো।বাধ্য হয়ে মেয়েটি অন্য এক জন মেয়ের সাহায্য নেয় গোপনে।তার মাধ্যমেই সে প্রস্তাব পাঠায় লিখিত ও মৌখিক। সেই মেয়েটি এমন নাছোড়-বান্দা ছিল যে, সূর্য্যর সেই প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়ার শক্তি ছিল না।এই সম্পর্কটা তখন সঠিক ভাবে বুঝতোই না সূর্য্য।মেয়েটি পিসির বাড়ী এলে গল্প করা, একসাথে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরা হতো — বেশ ভালই লাগতো সূর্য্যর।কিন্তু এই সম্পর্কের পরিণতি ও ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতো না সে।এই সম্পর্কটাতে তার ভালোলাগা ছিল, আকর্ষণও ছিল। তবে কোন রকম উন্মাদনা ছিল না।প্রকৃতপক্ষে তার লেখাপড়া নিয়ে খুব চাপে ছিল সে।তাছাড়া পারিবারিক দিক থেকে একটা ভীতিও কাজ করতো তার মনে।জানাজানি হলে তাকে যে খুব খারাপ অবস্থায় পড়তে হবে।

সামনে বড়ো এক যুদ্ধ ।উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সূর্য্যর।যুদ্ধই বটে, এতো বড়ো সিলেবাস — তার মাঝেই অনেক অস্বচ্ছতা আছে।মাধ্যমিকের সময় যেমন ভীতিহীন হলকা মেজাজে পরীক্ষা দিতে গেছিল এখন তার উল্টো।ভীতি আছে তবু হেরে যাওয়া চলবে না।পরীক্ষা শুরু হল।ভাষা বিভাগের পরীক্ষা দুটো ভাল ভাবেই পার হল।বিজ্ঞানের কোন বিষয়ের পরীক্ষাতে সে তৃপ্তি পায়নি।প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় শিক্ষক মহাশয়ের নির্দেশ মত লিখে খাতা জমা করতে হল।স্কুলে ল্যাবরেটরিতে কোনদিন হাতে-কলমে কিছু শেখানো না হলেও প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিয়ে বরং তৃপ্তি পেল সূর্য্য।পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিশেষ কোন পরিকল্পনা ছিল না তার।পড়াশুনা চালিয়ে যায় সামনের বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্য।মন চঞ্চল হচ্ছে বেশী, পড়াশুনা কম।নিজে-নিজে কিভাবে প্রস্তুতি নেবে সেটাও জানা ছিল না।তার বাবাও এই ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি।ধীরে-ধীরে পড়াশুনা কম আড্ডা মারা বেশী হতে লাগল।উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের পরই ভাবা যাবে কি করা যায়, এই অপেক্ষা করতে লাগল সূর্য্য।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

Click here to Reply or Forward

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *