ধারাবাহিক উপন্যাস “ধারাপাত” (পর্ব -১০), লিখেছেন- সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_nসূর্য্যর মতে, পার্থিব জীবনে মানুষকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে গেলে কৈশোর ও যৌবনে তিন রকম সংগ্রাম একইসাথে চালিয়ে যেতে হয়।প্রথমত–ভবিষ্যত জীবনে চলার সুগম ও আলোকোজ্জ্বল পথ নির্মাণের সংগ্রাম।যে পথ হওয়া উচিত সত্য-ন্যায় সমৃদ্ধ এবং জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো স্বচ্ছলভাবে পূরণ হবে সে পথে।দ্বিতীয়ত–সময়ের সাথে সংগ্রাম।কোন মানুষের জীবনে কখন কীভাবে খারাপ সময় আসে কেউ জানে না।ভালো এবং খারাপ উভয় সময়ে আত্মবিশ্বাস রেখে ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঠিক পথ নির্বাচন করতে হয়।তৃতীয়ত–নিজের সাথেই সংগ্রাম।কৈশোর এবং যৌবনে মানুষের মনে বিভিন্ন এবং বিচিত্র ভাবনা-অনুভূতির জন্ম নেয়।সে সবের কিছু হয় পার্থিব ও বস্তু জগতের এবং কিছু হয় কল্পনা জগতের।এই সময় আত্মসংযম, পারিবারিক অনুশাসন ও শিক্ষা এবং সহানুভূতিশীল ব্যবহার–এই সবের সঠিক ও উপযুক্ত প্রয়োগের মধ্য দিয়েই মানুষের সুন্দর চরিত্র গড়ে ওঠে।জীবনের এই ত্রিবিধ সংগ্রামে কারও-কারো সেনাপতি বা পথপ্রদর্শক থাকে, যে সামনে থেকে সংগ্রামটা পরিচালনা ক’রে দেন।যার জন্য সংগ্রাম সে দুঃখ-কষ্ট থেকে অনেকাংশেই মুক্ত থাকে।আবার কেউ কেউ তার জীবন সংগ্রাম নিজেই লড়ে।সে নিজেই তার নিজের পরিচালক- পথপ্রদর্শক-সৈনিক।নিজের মত করেই তার জীবন সংগ্রাম পরিচালনা করে এবং এগিয়ে যাই।কৈশোর এবং যৌবনের সময়টাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান সময় সঠিক মানুষ হয়ে ওঠার।অথচ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রশক্তির এই মূল্যবান বিষয়টিতে আজও যত্নের অভাব।সূর্য্য ছিল তার জীবন সংগ্রামের একক যোদ্ধা।না ছিল কোন পথপ্রদর্শক,  না ছিল কেউ পরিচালক।ব্যক্তিগত জীবনে সে ছিল খুব একা।জগত, সমাজ  ও সময় সম্বন্ধে ছিল নিতান্তই অনভিজ্ঞ এক গাঁইয়া ছেলে।

দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হল।গতানুগতিক এবং একই রকম, নতুনত্ব বা ইতিবাচক কিছু ছিল না।পদার্থবিদ্যা-রসায়ন-জীববিদ্যা-গণিত সবকিছুর এক খিচুড়ি খাচ্ছিল সূর্য্য।সুস্বাদ ও তৃপ্তি না পেলেও ক্ষিদের টানে খাচ্ছিল।সেই সময় মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ট্রান্সে এখনকার মত এম•সি•কিউ প্রশ্ন করা হতো না।রীতিমত উত্তরপত্রে লিখে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হতো।সফল হতে গেলে পাঠ্যসূচীর প্রতিটি বিষয়ে স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা দরকার ছিল।বেশিরভাগ প্রশ্ন থাকতো বোধমূলক, প্রয়োগমূলক এবং গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা।সূর্য্য যে পরিবেশের মধ্যে থেকে এত বড়ো একটা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তা ছিল সবদিক থেকেই অনুপযুক্ত।সময় এগিয়ে চলে।সূর্য্য তার সংগ্রাম নিজের শক্তিতে নিজের মতো ক’রে চালিয়ে যায়।লেখাপড়াতে সে যে পিছিয়ে পড়ছে তা উপলব্ধি করে।বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর অনেক তত্ত্ব-সূত্র ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে।ক্লাসে বা ক্লাসের বাইরে কোথাও সেগুলোতে আলোকপাতের ব্যবস্থা হয় না।অথবা সে নিজে উপযুক্ত পরিবেশটা তৈরী করতে পারেনি বিবিধ কারণে।এছাড়াও আরো একটা অসুবিধা উল্লেখ্য।কোন-কোন শিক্ষক মহাশয় কোন-কোন দিন বিজ্ঞানের পুরো ক্লাস ইংরেজীতে লেকচার দিয়ে সারতেন।ক্লাস সিক্সথ থেকে ইংরেজী প’ড়ে সবেমাত্র মাধ্যমিক পাশ করেছে।সেই লেকচারের বিষয়বস্তু একেবারেই বোধগম্য হতো না।বাড়ীতে বই প’ড়ে যতদূর পারতো বোঝার চেষ্টা করতো সূর্য্য।মাধ্যমিক পর্যন্ত সূর্য্যদের ব্যাচের একজন ছাত্রই মোটামুটি ঠিকঠাক ইংরেজী সেনটেন্স তৈরী করতে পারতো।সে এখন কলা বিভাগের ছাত্র।সেই ছেলেটা সিউড়ির একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে এসে সূর্য্যর সাথেই অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল।আর তার  সেই যোগ্যতার জন্যই অ্যাডমিশন টেস্টে সূর্য্যর থেকে মোটের উপর এক নাম্বার বেশী পেয়ে প্রথম হয়েছিল।ইংরেজী মাধ্যমে বিজ্ঞানের ক্লাস নেওয়াতে কোন রকম আপত্তি ছিল না কারও।সূর্য্যর মনে একটাই প্রশ্ন ওঠে-যে দান দাতা দেওয়ার সত্ত্বেও কেউ তা গ্রহণ করতে পারে না সেই দানের কি কোন অর্থ হয়? ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়ার পর সে যদি তা গলাধঃকরণ না করতেই পারে তাতে কি পূণ্য হয়?

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা আর মাত্র চার মাস পর।বোঝা যাচ্ছিল দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর কোনটারই পূর্ণ সিলেবাস ক্লাসে পড়িয়ে শেষ হবে না।   প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসও একটাও হয় না।তখনও পর্যন্ত এই স্কুলের এটাই নিয়ম ছিল-পরীক্ষার দিন দু-এক ঘন্টা আগে আসতে হতো আর সেদিনই ছাত্র-ছাত্রীদের ল্যাবরেটরিতে প্রথম এবং শেষবার ঢোকানো হতো।তবে প্র্যাকটিক্যাল কিছু না শিখলেও নাম্বার ঠিকই পাওয়া যেত।গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ স্কুলেই উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের একই অবস্থা ছিল তখন।পরবর্তী সময়ের খবর সূর্য্য রাখে নি।সূর্য্যর বাবা হয়তো স্কুলের পড়াশুনার ব্যাপারে খবর নিয়েছিলেন কারও কাছে।তাই একদিন সূর্য্যকে ডেকে বললেন যে, গণিত, রসায়ন ও ইংরেজী বিষয়ের জন্য তিন জন স্পেশালিস্ট শিক্ষকে বলে দিয়েছেন, সে যেন তিনাদের কাছে গিয়ে দুর্বলতাগুলো যতদূর সম্ভব দূর ক’রে নেয়।যদিও পদার্থবিদ্যাতেও বেশ কিছু দূর্বলতা ছিল।ইংরেজী ও গণিতের শিক্ষক দুজন স্থানীয় মানুষ এবং সূর্য্যর চেনা।   ইংরেজী শিক্ষকের বাড়ী ময়ূরেশ্বর।তিনি সূর্য্যর বাবার ছাত্র।বর্তমানে তিনি রামপুরহাট হাই মাদ্রাসার ইংরেজী ভাষার শিক্ষক।ময়ূরেশ্বরে নিজের বাড়ীতে এবং কোটাসুরে ব্যাচ ক’রে বেশ জমিয়ে ইংরেজী ভাষার টিউশন পড়াতেন।গণিতের শিক্ষক ছিলেন সূর্য্যর বাবার সহকর্মী।ময়ূরেশ্বরের অনতিদূরে কুসুমি গ্রামে বাস করেন।ভদ্রলোক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু রেগুলার কোর্সে গণিতের এম•এস•সি।তিনি টিউশন করেন না।সূর্য্যর বাবার খাতিরে পড়াবেন।রসায়ন শিক্ষক ছিলেন সূর্য্যর বাবার ক্লাসমেট।বর্তমানে সাঁইথিয়ার অভেদানন্দ কলেজের রসায়ন বিভাগের স্থায়ী সময়ের অধ্যাপক।শিউড়ী শহরে বাস করেন।অধ্যাপনা করার পর বাকী সময়ে তিনি সাঁইথিয়াতে চার ব্যাচ এবং শিউড়ীতে চার ব্যাচ উচ্চ মাধ্যমিক ও বি•এস•সি পাশ কোর্স রসায়ন টিউশন পড়াতেন।সারা বীরভূমে তাঁর টিউশনের নামডাক ছিল।ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে খুব জনপ্রিয় অধ্যাপক ছিলেন।ছোট-বড়ো সমস্ত ছাত্রকূলের কাছে তিনি ‘গিয়াসদা’ নামে পরিচিত ছিলেন।

হাতে সময় খুব কম ছিল সূর্য্যর।আর জানা-বোঝার বাকী ছিল অনেক।গণিত টিউশন  সপ্তাহে দু’দিন কি তিন দিন যেতে হতো।সময় ছিল বিকেল,  তবে নির্দিষ্ট কোন বার ছিল না।সূর্য্য মাত্র দু’মাস গণিত টিউশন গেছিল।ইংরেজী তিন দিন সকাল, ময়ূরেশ্বরের ব্যাচে।তিন মাস ইংরেজী টিউশন পড়েছিল সূর্য্য।এর মধ্যেই ঐ শিক্ষক মহাশয়ের বিষয় ভিত্তিক সব নোটস্ গুলো পেয়ে যায়।উচ্চ মাধ্যমিক কোর্সের এই দু-বছরেই সূর্য্য নিজের চেষ্টায় ইংরেজী ভাষাটা মোটামুটি শিখেছিল।   মনের ভাব সাদামাটা ইংরেজীতে হলেও লিখে প্রকাশ করতে পারে।যাই হোক, ভাষা বিভাগে খুব অসুবিধা ছিল না।রসায়ন টিউশন সপ্তাহে একদিন শনিবার যেতে হতো সাঁইথিয়াতে।এই টিউশন সাড়ে তিন মাস চলে পরীক্ষার আগে পর্যন্ত।প্রায় সমস্ত নোটস্ গুলো প্রত্যেক রবিবার গিয়ে জোগাড় ক’রে নেয় সূর্য্য।সামনের কয়েকটা দিন পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তার।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *