ধারাবাহিক উপন্যাস ” ধারাপাত” (১৯ পর্ব) লেখক, সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_n

জানা নেই কতক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিল সূর্য্য। তার মনের অনুভূতি-অভিব্যক্তি একমাত্র সেই জানে।পৃথিবীর কোন ভাষা দিয়ে তার মনের সেই অবস্থার বর্ণনা করা সম্ভব নয়, শুধু হৃদয় দিয়ে কিছুটা অনুভব করা যাই মাত্র। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নিজের শরীর ভারহীন আর মাথা মগজ শূন্য লাগছিল তার। নিজেকে তার সেই পাখিটার মতো লাগছিল, যে খড়কুটো খুঁটে-খুঁটে এনে মনের আনন্দে বাসা গড়েছিল কিন্তু একদিন সেখানে ফিরে দেখল কেউ তার সংসারের সম্বল বাসাটা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ ক’রে দিয়ে গেছে।     আনমনে একটা সিগারেট জ্বালাল সে।সিগারেটে খুব জোর একটা টান দিয়ে বাস্তবে ফিরে এল। মানসিক বা শারীরিক কোন ইচ্ছাই ছিল না সাইকেলে চড়ার। ডান হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধ’রে সিগারেটে টান দিতে-দিতে কলেজের দিকে হাঁটতে থাকে সে। নিজের রুমে না গিয়ে কলেজের পূর্ব দিকের গেটে ঢুকে পশ্চিমের মেন গেটে বেরিয়েই গেট লাগোয়া শর্মাজির চায়ের দোকানের পাশে সাইকেল স্ট্যান্ড করিয়ে বাইরের বেঞ্চে ধপাস ক’রে বসে পড়ে সূর্য্য।

রামপ্রসাদ শর্মা নেপালের লোক। সতের-আঠারো বছর বয়সে কাজের খোঁজে ভারতে এসেছিল। তারপর কোলকাতা, বর্ধমান হয়ে সিউড়ি আসে।সিউড়ির এক নেপালী পরিবারের মেয়েকে বিয়ে ক’রে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে।রেশন কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড হয়ে গেছে। সুতরাং নথি অনুসারে এখন সে ভারতের নাগরিক। বিদ্যাসাগর কলেজের মেন গেটে বেরিয়ে কাছেপিঠে টিফিন করার দোকান বলতে তখন একটাই, শর্মাজির দোকান। স্বামী-স্ত্রী দুজনে দোকানটা চালাই। হাতে গড়া রুটি, পাঁউরুটি, ঘুগনি, আলুর দম, বাটার টোস্ট, এগ টোস্ট, চা, বিস্কুট, বিড়ি, সিগারেট, গুটখা সবই পাওয়া যায়।বেশ ভালোই ব্যবসা চলে।কলেজ খোলা থাকলে সারাদিন সমান খদ্দের থাকে। ছুটির দিনগুলো সকাল-বিকেল খদ্দেরের চাপ।     শর্মাজির দোকানের বেঞ্চে বসে ওয়াকাফের গার্লস হোস্টেলের দোতলা ও ছাদের সব ঘটনাই ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাই। সেই কারণেই আশেপাশের মেশের ছাত্রদের ভিড় হয় বিকেলে। তাদের অনেকের মান্থলি খাতা আছে। খাওয়ার পর নিজেরাই খাতায় হিসেব লিখে দেয়।খুবই সাদাসিধে মানুষ শর্মাজি। বাইরের ছাত্রদের সাথে খুব হৃদ্যতা। কত ব্যাচের কত ছাত্রের নাম যে মনে রেখেছে সে ! এই দোকান চালানো ছাড়াও এক মাড়োয়ারির কাপড়ের দোকান ও গুদামে রাতে পাহারাদারের কাজ করে শর্মাজি। পাহারাদার বলতে, সদর দরজা তালা মেরে জনহীন দোকান ও গুদামের মাঝের বারান্দায় রাতে ঘুমানো। তার দোকান থেকে তিনটে বাড়ীর পরেই নাইট ডিউটির স্থান। শর্মাজির সারল্য আর মুখমণ্ডলের গোবেচারা হাবভাবের জন্য তাকে সূর্য্যর খুব ভাল লাগত। সেও এক সময়ে শর্মাজির মান্থলি খদ্দের ছিল। নেপালী ভাষাটা শেখার চেষ্টাও করেছিল তার থেকে। যেহেতু শর্মাজি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশি পড়াশুনা করেনি তাই তার থেকে নেপালী ভাষা শেখা সম্ভব হয়নি । ঐভাবে উদাস ও নিস্তেজ হয়ে সূর্য্যকে বসে থাকতে দেখে শর্মাজি জিজ্ঞেস করল  — ‘ কি হইছে ?’ সূর্য্য চুপ থাকে । শর্মাজি বলে — ‘চায়ে দিবো ?’ —- ‘হ্যাঁ  ।’ —- ‘আউর কুছু   ?’  —- ‘না ।’ সূর্য্য আবার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে চা-সিগারেট একসাথে খেতে থাকল। শুধুমাত্র মনকে ভোলানো, কিছু সময় কাটানো। এই সময় সূর্য্যর জিভ কোন খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে অপারগ । তার উদাসী মন আর গ্যাসীয় দৃষ্টি কোন্ শূন্যে, কত দূরে হারিয়ে গেছে, তা শর্মাজির মতো একজন সরল ও সাদাসিধে মানুষের বোঝা সম্ভব ছিল না ।

পরের দিন ক্লাস শুরুর অনেক আগে কলেজে চলে আসে সূর্য্য। বিভাগীয় শ্রেণীকক্ষে না গিয়ে কলেজের মেন গেটের পাশে আনিশার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে । তার হাতে একটা কাপড়ের দোকানের নাম-ঠিকানা লেখা প্লাস্টিক প্যাকেট।গতকালের বেদনা দায়ক ঘটনার ছাপ তার মন-শরীরে , ভিতরে-বাহিরে একই রকম রয়েছে। ক্লাস শুরুর পাঁচ-ছয় মিনিট আগে আনিশা কলেজে ঢোকে। সূর্য্য তার সাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে ইশারায় থামতে বলে ।   আনিশা সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালে সূর্য্য তার হাতের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দেয়। আনিশা প্রশ্ন করে —- ‘কি আছে ?’ —- ‘তোমার দেওয়া উপহার গুলো।’ —- ‘তোমার কাছে থাকলেই হতো। ফেরত না দিলেই কি চলত না ?’ —- ‘তোমার ভাল হলে বা চলে গেলও আমার খারাপ হবে ।’ —- ‘কি রকম ?’—- ‘এই অবস্থায় তোমার উপহার গুলো যত বেশি আমার চোখে পড়বে ততই মন খারাপ করবে আর তত বেশি কষ্ট হবে।’ দুজনে নীচু আওয়াজে কথা বলছিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কেউ তা শুনতে বা বুঝতে পারবে না। আনিশা আর কথা না বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিয়ে ঝটপট তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে সাইকেলে উঠে ক্লাসের দিকে চলে যাই।সূর্য্যও ধীরে-ধীরে হাঁটা দিল রসায়ন বিভাগের দিকে।

সূর্য্য ও আনিশার সম্পর্কের বিচ্ছেদের বিষয়টা আনিশা অন্য কাউকেই বলেনি। যেহেতু তারা দুজনে কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে  দৃষ্টি আকর্ষণীয় বা দৃষ্টিকটু কোন রকম আচরণ করতো না সম্পর্ক থাকা অবস্থাতে তাই সম্পর্ক বিছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও কেউই বুঝতে পারেনি বেশ কিছুদিন। এই ব্রেক আপের তিন-চার দিন পর সূর্য্য তার খুব কাছের দুজন বন্ধুকে জানিয়েছিল বিষয়টা। তাদের থেকে কথাটা বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। সূর্য্য তার ব্রেক আপের কথাটা প্রথম বলে তার জীবনের বাইরের প্রথম বন্ধু, ছাত্রাবাস জীবনের প্রথম রুমমেট কবিরুলকে । ছেলেটা সহজ-সরল ও মিশুকে ছিল ।     তবে বোধ-বুদ্ধি তেমন তীক্ষ্ণ ছিল না।বিদ্যাসাগর কলেজে সূর্য্যর সমসাময়িক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাম্মানিকের ছাত্র ছিল সে । সুচেতনা ছাত্রাবাস ছেড়ে সূর্য্য চলে গেলেও হৃদ্যতা-সম্পর্ক আগের মতোই অটুট ছিল দুজনের ।  প্রতিদিন দেখা-সাক্ষাৎ গল্প-আড্ডা চলত দুজনের। দ্বিতীয় জন ছিল রসায়ন বিভাগের ক্লাসমেট যাকে সূর্য্য তার ব্রেক আপের কথা বলে।

কোন পুরুষের প্রথম যৌবনে যদি সূর্য্যর মতো এইভাবে প্রেম আসে এবং অতিকষ্টে সেই প্রেম বাস্তব রূপ পাই, আর সেই প্রেম ও প্রেমিকা যদি স্বরূপে তার জীবনে ধরা দেয় — মিশে যায়, তাহলে সেই পুরুষ প্রেমের এক প্রকৃত পূজারী হয়ে ওঠে।  পুরুষের প্রথম যৌবনের প্রথম প্রেম হল নিখাদ-নির্ভেজাল। যে পায় সে ভাবে ঈশ্বরের শুভেচ্ছায় স্বর্গীয়ভাবে প্রাপ্ত হয়েছে।     প্রেমের সাগরে সাঁতার কাটার যোগ্যতা তখন তার থাকে না ঠিকই কিন্তু যে নদীতে সে সাঁতার কাটে তাতেই স্বর্গসুখ লাভ করে। সেই স্বর্গীয় ধন পেয়েও আজ হারিয়ে নিঃস্ব সূর্য্য।     ব্যথাতুর হৃদয় তবুও ভেঙ্গে পড়েনি সে।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *