ধারাবাহিক উপন্যাস “ধারাপাত”(১৮ পর্ব) লেখক, সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_n
সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের পূর্ব দিকের গেটে বেরিয়েই যে রাস্তা সেটা কলেজ রোড নামে পরিচিত । কলেজের নামাঙ্কিত মেইন গেট পশ্চিম দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোডের উপর অবস্থিত ।  রক্ষাকালী তলা থেকে আরও কিছুটা উত্তরে, যেখানে বাইপাস রোডটা কলেজ রোডের সাথে মিশেছে, সেখান থেকে স্টেশন মোড় পর্যন্ত রাস্তাটার নাম প্রকৃতপক্ষে কলেজ রোড।রাস্তাটা বেশ শান্ত।    গাড়িঘোড়া লোকজন কম যাতায়াত করে।     কারণ এই রোডের উপর বাজার গড়ে ওঠেনি তখনও। এই কলেজ রোডের আনিশার সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে সূর্য্যর।এখনও স্কুলের বা অন্য কোন কাজে সদর শহরে যেতে হলে এই কলেজ রোড পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে সে । স্মৃতি সব সময় বা সম্পূর্ণ সুখের হয় না সবার কাছে। নদীর মত জীবনের স্রোতের মাঝে কখন-কখন শেওলা-আবর্জনা জমা হয়ে জীবন-স্রোতকে বদলে দেয় হঠাৎই।
২০শে আগষ্ট ১৯৯৬ সূর্য্যর প্রেম অনুমোদন পায় আনিশার থেকে। তারপর কয়েকদিন পরস্পরকে জানা-বোঝার চেষ্টা চলে । সূর্য্যর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আনিশার পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত সঠিক তথ্য জানার ছিল।    আনিশা তার বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান।তাদের পরিবারের মোট ছ’জন সদস্য-সদস্যা। মা-বাবা, আনিশারা দুই ভাই-বোন, আর তার মায়ের থেকে বয়সে বড়ো দুই অবিবাহিতা মাসি। বাবা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন এল•ডি•সি, বর্তমানে বীরভূম ট্রেজারির কর্মী । মা হাউস ওয়াইফ । অবিবাহিতা মাসিরাও তাদের সাথে একই পরিবারেই থাকেন। তবে তারা নিজেদের খরচ নিজেরাই চালিয়ে নেয় তাদের বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে। বড়ো দুই দিদি উদ্যোগ নিয়েই ছোটো বোনের বিয়ে দিয়েছিল । আনিশার মা তার বাবার থেকে বয়সে সাত-আট বছরের বড়ো। বিয়ের পর থেকেই আনিশার বাবা ঘরজামাই থাকেন । বিয়ের একটা প্রধান শর্তই ছিল ঘরজামাই থাকা । বিয়ের ছয়-সাত বছর পর ভদ্রলোক ক্লারিক্যাল জবটা পেয়েছিলেন।     এর বেশী আনিশার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইনি সূর্য্য। বাকীটা তার ভাবনা-কল্পনায় জানা আছে নিজের ‘মানস কন্যা’ সম্পর্কে । কম বয়সের প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে, মন-হৃদয়ের আবেগ তাড়িত প্রেমের ক্ষেত্রে এমনটাই হয় । সেই প্রেমিকের চোখে তার প্রেমিকা গুণবতী এবং সুন্দর ও মধুর স্বভাবের মেয়ে ।  সেই মেয়েটি তার জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত এবং তার সাথে জীবন-যাপন ও সংসার ক’রে সর্বাধিক সুখী হবে সে, এমন ধারনা ও বিশ্বাস তার মনকে সম্পূর্ণ বিমোহিত ক’রে রাখে।
প্রথম তিন-চার দিন আনিশা ও তার সেই বান্ধবী গার্লস কমন রুমে অপেক্ষা করতো সূর্য্যর ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত । তারপর সূর্য্যকে আসতে দেখে আনিশাকে রেখে সে চলে যেত । সূর্য্য কোন দিন মুখে বলেনি কিন্তু আজও কৃতজ্ঞ মলতির সেই সাহায্যের জন্য। মালতি মন-প্রাণ থেকে চাইতো সূর্য্য-আনিশা যেন সারা জীবন সুখে-শান্তিতে এক সাথে জীবন যাপন করে । কলেজ রোড ধরে আনিশা বাড়ি ফিরতো, সঙ্গে সূর্য্য । কলেজ থেকে হরিহটগঞ্জের কালিবাড়ি পর্যন্ত দুজনে এক সাথে থাকতো । তারপর সূর্য্য ফিরে আসতো । প্রথম দিনে আনিশা সূর্য্যকে জিজ্ঞেস করে, — ” তোমার জন্মদিন কবে ?”  সূর্য্য বলে,—” ২০-শে ডিসেম্বর, বাঙ্গাব্দের ৪-ঠা পৌষ ।” — ” তোমার ?” — ” ৭-ই ডিসেম্বর।” সূর্য্যর মনে অনেক কথা বলার আছে কিন্তু মুখে বলতে পারে না, কোথায় যেন আটকে যায় ।সে জানে সময়ের সাথে তারা আরো কাছে আসবে । দুই মনের ব্যবধান কমে যাবে, দুই মন অচিরেই এক হবে । দুই সত্ত্বা মিলে-মিশে এক হবে একদিন। প্রথম দিন শুধুমাত্র এই সামান্য কথোপকথনে সময় ও পথ শেষ হয়ে গেল।বেশিরভাগ সময়ই নিরবতায় কেটে গেল। এই নিরবতাও ছিল নিঃশব্দ কথোপকথন। দ্বিতীয় দিন বাড়ি ফেরার সময় মাঝ পথে আনিশা সূর্য্যকে সাইকেল থামাতে বলে। সে নিজেও দাঁড়িয়ে গেল।তারপর সে ব্যাগ থেকে এক ডজন রোটোম্যাক বল পেনের একটা প্যাকেট বের ক’রে সূর্য্যর হাতে দিল।সেই সময়ে রোটোম্যাকের বিজ্ঞাপন ছিল, — ” লিখতে লিখতে লাভ হো যায়ে।”  সূর্য্য তার সঙ্গেও একটা উপহার এনেছিল আনিশার জন্য । ঝাউ পাতা আর রাংতা দিয়ে ডেকোরেট করা লাল টকটকে একটা তাজা গোলাপ, আজ কলেজ আসার আগেই কেনা । কাগজের প্যাকিংটা খুলে আনিশার হাতে উপহারটা দিল সূর্য্য ।প্রায় শ-দুয়েক গোলাপ আনিশার নামে কিনে তার হাতে দেওয়ার আগেই শুকিয়ে গেছে।   আজ প্রথম আনিশাকে এই রক্ত গোলাপটা দিয়ে চরম মানসিক তৃপ্তি পেল সূর্য্য।এমনি ভাবে চলতে চলতে সময়ের সাথে কথাবার্তায় পরস্পর অনেকটা সহজ হল। আগের মত আর সূর্য্যর হার্ট বিট বেড়ে যায় না এবং আড়ষ্টতা আসে না আনিশার সাথে কথা বলার সময় । সে প্রায়ই আনিশাকে রক্ত গোলাপ উপহার দেয়।     আনিশা সূর্য্যকে এর মধ্যে আরও দুটো উপহার দিল।একটা খুব সুন্দর চাবির রিং আর একটা ঘুমানোর জন্য রিভলভিং লাইট সেট যার কাঁচের ঘেরার মধ্যে বৃটিশ যুবক-যুবতীর যুগল মূর্তি । হঠাৎই আনিশা কলেজ আসা বন্ধ করে দিল সূর্য্যকে কিছু না জানিয়ে ।  তার বান্ধবীর কাছে খবর নিয়ে জানা গেল টিউশন পড়াতেও যাচ্ছে না সে । আনিশাকে না দেখতে পেয়ে সূর্য্যর মন খুবই উচাটন করে । আনিশাদের বাড়িতে টেলিফোন ছিল না । আর সেই সময়ে এদেশে মোবাইল ফোন পরিষেবাও ছিল না । কাউকে যে তার বাড়িতে খবর নিতে পাঠাবে সে রকম ব্যবস্থাও সূর্য্যর ছিল না । সুতরাং ধৈর্য ধারণ ক’রে আপেক্ষা করা ছাড়া তার কোন গত্যন্তর ছিল না । আনিশাকে না দেখতে পেয়ে খুবই খারাপ লাগতো তার আর বুকের ভেতর একটা চাপা ব্যথা অনুভব করতো । কিন্তু অসম্ভব রকম জেদী ও ধৈর্যশীল ছেলে ছিল সে । কাউকে কিছু না বলে অপেক্ষা করতে লাগল আনিশার কলেজ আসা পর্যন্ত ।
দিনটা ছিল ১৪ অক্টোবর।বিশ্ব বিখ্যাত পপ্ তারকা ম্যাডোনা সেদিন মা হলেন।প্রথম সন্তানের জননী হওয়ার সে সুখ ভাগ ক’রে নেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই সেদিন অনেক বড়ো পার্টি দিয়েছিলেন । সূর্য্যর প্রেমের বয়স চুয়ান্ন দিন পেরিয়ে পঞ্চান্নতে পড়েছে সেদিন। সূর্য্য তার নিজের মত ক’রে সেলিব্রেট করতেই পারতো।সেদিন আনিশাও কলেজ এসেছে দীর্ঘ বারো দিন পর । আনিশার ক্লাস শেষ হওয়ার পর সূর্য্যও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সঙ্গ নিল। আনিশার মধ্যে কেমন একটা চঞ্চলতা লক্ষ্য করল সূর্য্য ।কলেজ রোড ধরে কিছু দূর গিয়ে হাঠাৎ সাইকেল থামাল আনিশা । সূর্য্যও থামল। আনিশা বলল, — ” আমার সাথে আজ থেকে তোমার কোনদিন আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার সাথে আমার এই রকম সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। আমার ভুল হয়ে গেছে, পারলে ক্ষমা ক’রে দিও।” তারপর সে সাইকেলে উঠে খুব দ্রুত চলে গেল । সূর্য্য পশ্চিম দিকে মুখ করে যেমন দাঁড়িয়েছিল তেমনই রইল । আনিশার যাওয়ার পথের দিকে তাকানোর মতো বুদ্ধিও তার অকেজো হয়ে গেছে ।
সামসুল হক

সামসুল হক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *